শেষ রাতে রহস্যময় ফোন নিয়ে আসকের প্রশ্ন

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩০ এএম

রংপুরে মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাদের দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় পুলিশের ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ও অসংগতি পেয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। ঘটনার দিন গণপতির স্ত্রীর ফোন থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে একটি কল কী করে তার বোনের ফোনে গেল, তা নিয়ে আরও তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

শিক্ষক পরিবারকে হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে আসকের দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট রংপুরে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান করে। তারা নিহতদের স্বজন, প্রতিবেশী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, পুলিশ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশ, থানা কর্তৃপক্ষ, মর্গ ও হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে আসক। রংপুরের এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার আসক তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।

স্বজনের বক্তব্যে উঠে আসা তথ্য : নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী আসক প্রতিনিধিদের জানান, ২০ আগস্ট রাত ১১টা ৩০ মিনিটে তার বোনের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তবে পর দিন তিনি দেখতে পান, রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে তার বোনের নম্বর থেকে তাকে একটি ফোন করা হয়েছিল। তিনি সেই ফোন ধরতে পারেননি। পূজা চক্রবর্তীর বক্তব্য অনুযায়ী, তার বোন সাধারণত এত রাতে তাকে ফোন করতেন না। ফলে রাত ২টা ৪০ মিনিটের ওই ফোনকলটি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পুলিশের বর্ণিত হত্যাকা-ের সময়ের সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখলে।

আসক বলছে পুলিশের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ভোরের দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি দেখে ফেললে তাদের সঙ্গে তার বাগ্বিত-া হয় এবং এরপরই তাকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ভাষ্যানুযায়ী, পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও একে একে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর নম্বর থেকে তার বোনের কাছে করা ফোনকলটি এই সময়রেখার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। ওই কলটি কে করেছিলেন, কলটি কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল, তখন মোবাইল ফোনটি কোন অবস্থানে ছিল এবং এরপর পরিবারের সদস্যদের ফোনগুলো কখন বন্ধ হয়, এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড, মোবাইল লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওই ফোনকলের সময় ও পুলিশের বর্ণিত হত্যাকা-ের সময়ের মধ্যে কোনো অসংগতি আছে কি না, তাও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার।

আসক বলছে, ২২ আগস্ট রাত ৮টার কিছু পর পূজা চক্রবর্তী তার বোনের নম্বরে ফোন করে সেটি বন্ধ পান। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া না পেয়ে রাত সোয়া ৯টার দিকে তিনি স্বামীকে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান। বাড়িতে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় তারা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা ভেঙে বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। পূজা চক্রবর্তীর বক্ত ব্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ ছিল ছাদে, প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ দ্বিতীয় তলা থেকে ছাদে ওঠার সিঁড়িতে এবং আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ একটি কক্ষের এক কোণে। ঘরের আসবাব, জামাকাপড়, গহনাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ আসক প্রতিনিধিদের জানান, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নিহতদের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করতে গেলে গণপতি চক্রবর্তী তাদের বাধা দেন। পুলিশের ধারণা, পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তারা একে একে পরিবারের চার সদস্যকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। হত্যার পর ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে ডাকাতির ঘটনা বলে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় বলেও পুলিশ জানায়। পুলিশের ভাষ্যানুযায়ী, হত্যাকা-ের পর অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন, খাবার খান এবং পরে পরিস্থিতি অনুকূল হলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তদন্তের সূত্র ও আলামতের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করা হয় এবং পরে আদালতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

আসকের মতে, পুলিশের এ ব্যাখ্যার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্বাধীন ও বস্তুগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে হত্যাকান্ডের পর অভিযুক্তরা যদি সত্যিই ওই বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন, খাবার খেয়ে থাকেন বা গোসল করে থাকেন, তাহলে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত ফরেনসিক আলামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। এ ক্ষেত্রে ঘরের বিভিন্ন স্থান, বাথরুম, ব্যবহৃত পানির উৎস, খাবারের পাত্র, দরজা-জানালা, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুলসহ সম্ভাব্য জৈব ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পুলিশের বর্ণিত ঘটনাক্রমের সঙ্গে এসব পরীক্ষার ফল সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তদন্তের অগ্রগতি ও ডিবির বক্তব্য

আসক প্রতিনিধিদল রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে। তিনি জানান, ঘটনার বিভিন্ন দিক ও আলামত যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকা- নিয়ে বাইরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পুলিশের ব্যাখ্যায় বাড়ির বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সম্ভাব্য সিসিটিভি ক্যামেরায় উপস্থিতি ধরা পড়ার আশঙ্কার সঙ্গে যুক্ত বলে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও ডিবির পক্ষ থেকে আসক প্রতিনিধিদের জানানো হয়। তবে বিদ্যুৎসংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, কে বা কারা তা করেছিলেন এবং এর সে ঙ্গ সিসিটিভি বা হত্যাকা-ের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না এসব বিষয়ও বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তি গত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযুক্তদের পরিবারের বক্তব্য

আসক বলছে, সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস তার ছেলের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার বিষয়ে উদ্বেগ ও প্রশ্নের কথা বলে জানান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং পুলিশে নেওয়ার সময় তার ছেলের পোশাকসহ কিছু বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসের মা সেনা রানী দাসও তার ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানান এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন। অন্যদিকে সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেপ্তার আর এক তরুণ সীমান্ত চন্দ্র দাসের বাবা-মায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত ঘটনার রাতে বাড়িতে ছিলেন এবং সে রাতে সিদ্ধার্থ দাস কিছু সময়ের জন্য তাদের বাড়িতে এসেছিলেন। তবে তিনি সেখানে রাতযাপন করেননি বলে তারা জানান। এসব বক্তব্যও তদন্তের সময় অন্যান্য তথ্য ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মর্গ ও ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত তথ্য

আসকের প্রতিনিধিদল মর্গের ইনচার্জ সাহেব আলী এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডোম যতন কুমারের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, যতন কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহগুলো পচনশীল অবস্থায় ছিল। তিনি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখেননি বলে জানান; তবে শরীরের কিছু অংশে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে তার মনে হয়েছে। নিহত দুই নারীর শরীরে যৌন নির্যাতনের কোনো আলামত তার চোখে পড়েনি বলেও তিনি জানান। তবে এ বিষয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান। আসক বলছে, এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মর্গের কর্মীর পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন, যৌন সহিংসতার কোনো আলামত ছিল কি না এবং হত্যাকা-ের পদ্ধতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক পরীক্ষা ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই অধিকতর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।

ঘটনার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আসক বলছে

১. একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত নৃশংস এবং জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, ঘটনাক্রম এবং প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত জরুরি।

 ২. পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যার সঙ্গে নিহত পরিবারের স্বজন, স্থানীয় নাগরিক ও গণমাধ্যমে উত্থাপিত কিছু প্রশ্নের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে বস্তুগত, ডিজিটাল ও ফরেনসিক আলামতের বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রয়োজন।

 ৩. প্রীতিলতা চক্রবর্তীর নম্বর থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোন পূজা চক্রবর্তীর কাছে করা ফোনকলটি বিশেষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। ওই সময় ফোনটি কে ব্যবহার করছিলেন, কলটির স্থায়িত্ব কত ছিল, ফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোন কখন বন্ধ হয় এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড, মোবাইল লোকেশন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কারণ পুলিশের বর্ণিত হত্যাকা-ের সময়রেখার সঙ্গে এই ফোনকলের সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

 ৪. পুলিশের ভাষ্যানুযায়ী, হত্যাকা-ের পর অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন, খাবার খান এবং গোসল করেন। এমন দাবি সত্য হলে ঘটনাস্থল থেকে ফরেনসিক আলামত পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকার কথা। তাই বাথরুম, খাবারের পাত্র, দরজা-জানালা, আসবাবপত্র, বিছানা, পোশাকসহ সংশ্লিষ্ট স্থান ও বস্তু থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ, চুলসহ সম্ভাব্য ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং তার ফল কী তা তদন্তে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

৫. অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিচারিক প্রক্রিয়ায় মূল্যায়িত হবে। তবে ঘটনার পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটনে কেবল স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন ও বস্তুগত আলামত, ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইলস, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

 ৬. বাড়ির বিদ্যুৎসংযোগ কখন, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল, সেটিও তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এর সে ঙ্গ সিসিটিভি, অভিযুক্ত দের চলাচল এবং হত্যাকা-ের সময়ের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা প্রযুক্তিগত আলামতের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

 ৭. মর্গসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকলে তা দূর করার জন্য ময়নাতদন্ত, রাসায়নিক ও অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ করা জরুরি।

 ৮. নিহত পরিবারের স্বজনরা পুলিশের প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ও উদ্বেগ জানিয়েছেন, সেগুলোকে অমূলক বা বিভ্রান্তিকর হিসেবে উড়িয়ে না দিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে পুলিশ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, সেটিও স্বাধীন আলামতের ভিত্তিতে যাচাই হওয়া জরুরি।

 ৯. তদন্তভার ডিবিতে হস্তান্তর হওয়ায় ঘটনাটির সব দিক নতুন করে, নিরপেক্ষভাবে এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা সম্ভাব্য ঘটনার সূত্র যেন পূর্বধারণার কারণে তদন্তের বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 ১০. তদন্তের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা বজায় রাখতে তদন্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বস্তুগত ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে পুলিশের ব্যাখ্যাগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সে বিষয়ে যথাযথ সময়ে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে তদন্তের স্বার্থ রক্ষা হবে, অন্যদিকে সন্দেহ ও বিভ্রান্তিও কমবে।

প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের বরাতে আসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর ও নৃশংস। পুলিশ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির কথা জানিয়েছে। কিন্তু ঘটনার উদ্দেশ্য, সময়রেখা, হত্যার পদ্ধতি এবং হত্যাকা-ের পর অভিযুক্তদের কথিত কর্মকা-সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে রাত ২ টা ৪০ মিনিটের অস্বাভাবিক ফোনকল এবং হত্যাকা-ের পর অভিযুক্তদের বাড়িতে অবস্থান, খাবার খাওয়া ও গোসল করার পুলিশের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ফরেনসিক ও ডিজিটাল আলামত পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

সব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস নতুন পুলিশ কমিশনারের : রংপুর প্রতিনিধি জনান, রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় ওঠা বিভিন্ন তথ্য ও বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশের নতুন কমিশনার মাহবুবুর রশিদ। গতকাল শুক্রবার নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

মাহবুবুর রশিদ বলেন, একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর। এ মামলা নিয়ে সারা দেশে নানা ধরনের আলোচনা চলছে। তাই এ মুহূর্তে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করা আগাম হয়ে যাবে। মূলত মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতেই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘মামলাসংক্রান্ত সব তথ্যই আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।’

চার খুনের ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে যেসব কথা উঠেছে, সেগুলোও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান আরপিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, সব তথ্য বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পর সঠিকভাবে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হবে, যাতে মামলায় সুবিচার নিশ্চিত করা যায়।

ঘটনাস্থলের আলামত পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুবুর রশিদ বলেন, তিনিও এমন কথা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আলামত ধুয়ে ফেলার কোনো কারণও নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা সব আলামত পুলিশের কাছে নিরাপদে সংরক্ষিত রয়েছে। তারপরও আলামত ধুয়ে ফেলার অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

মামলার তদন্ত কতদূর এগিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলাটি চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে এবং তদন্তও অব্যাহত আছে। নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রথমবারের মতো ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছেন।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আগের কমিশনার তাকে সময়ে সময়ে অবহিত করেছেন জানিয়ে মাহবুবুর রশিদ বলেন, আপাতত তিনি সে অবস্থানেই থাকতে চান। তদন্তে কোনো সূত্র বা ক্লু পাওয়া গেলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হবে।

গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২)। এই হত্যাকান্ডের পর থেকেই ঘটনার কারণ, আলামত সংরক্ষণ এবং পুলিশের তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন কমিশনারের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তদন্তে এসব বিষয়ই গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

গোপালগঞ্জে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন : এদিকে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার প্রতিবাদে গোপালগঞ্জে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। দেশ রূপান্তর প্রতিনিধি জানান, রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার প্রতিবাদ এবং দেশব্যাপী হত্যাকা-ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গোপালগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের ব্যানারে জেলা শহরের কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি প্রাঙ্গণ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

পরে প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনকারীরা হাতে হাত ধরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের গোপালগঞ্জ জেলা সভাপতি বিজন রায়, কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক চন্দন ম-ল, জেলা যুব মহাজোটের সভাপতি বিনয় মধু এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র মহাজোটের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বজিৎ পান্ডে। এ সময় বক্তারা রংপুরের স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকা-ের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে হত্যাকা-ে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত