বিএনপিতে বাড়ছে বিভক্তি উদ্বেগ

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩০ এএম

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির ভেতরে বাড়ছে বিভাজন ও উদ্বেগ। একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে না পারলে দলের ভরাডুবির শঙ্কা রয়েছে, যার ফায়দা নিতে পারে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ অবস্থায় দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে ও ভোট বিভাজন এড়াতে তৎপর হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রেখেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। চলতি সপ্তাহে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে, জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। 

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে স্থানীয় নেতাকর্মীরা। নির্বাচনকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট এমপি এবং তার বিরোধী শিবির নিজ নিজ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কারণ নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে না পারলে সারা দেশে বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবি হবে। লাভবান হবে সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ আদালতে নিষিদ্ধ হলেও তার নেতাকর্মীরা এ নির্বাচনে অংশ নেবে। কারণ এ নির্বাচন দলীয়ভাবে হচ্ছে না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ৩০০ আসনের মধ্যে ৭২টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করে বিএনপি। এখন পর্যন্ত তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সারা দেশে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার দলীয় এমপি ও নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন। দলীয় এমপিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় দলীয় নেতা ও কিছু সংসদ সদস্যের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।’ তাদের এ ব্যবধান কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারেক রহমান। পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমাতে এবং দলীয় ভোট বিভাজন রোধে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য দলীয় আইনপ্রণেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপি জোটগতভাবে নয়, এককভাবে করবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী কারা হবেন, তা স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হবে। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজন প্রার্থী দেওয়া হবে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছাড় দেওয়া হবে না।’

নাটোর-১ আসনের বিএনপি দলীয় এমপি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল। ওই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন তাইফুল ইসলাম টিপু। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পুতুল চাইছেন তার সমর্থিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে। অন্যদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী টিপু চাইছেন তার সমর্থিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে। সমঝোতা না হলে দুজনই প্রার্থী দেবে। ফলে সেখানে ভরাডুবির শঙ্কা করছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। তাইফুল ইসলাম টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল এমপিনির্ভর হলে ভরাডুবির মধ্যে পড়বে। আর যদি সবাইকে নিয়ে বসে প্রার্থী চূড়ান্ত করে তাহলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীরা বিজয়ী হবে।’

ময়মনসিংহ-১১ আসনে বিএনপির এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। ওই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দুজনই নিজ নিজ প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রার্থীদের ভরাডুবির শঙ্কা করছেন স্থানীয় বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।  

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জেলা নেতাদের সঙ্গে প্রতি শনিবার গুলশানে চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করছেন। বৈঠকে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় থানার নেতারা বসে প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন। তাদের সহযোগিতা করবেন জেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় এমপিরা। এভাবেই প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। কাউকে দলের পদ, কাউকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ দিয়ে স্থানীয়ভাবে সমঝোতা করে প্রার্থী ঠিক করা হবে।’

সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের আগে সংসদ ভবনে সরকার দলীয় সংসদীয় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসন্ন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলসমর্থিত প্রার্থীকে জয়ী করতে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদে দলসমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে এবং ‘সৎ ও যোগ্য’ প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেন তিনি। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো ধরনের দূরত্ব বা বিরোধ তৈরি করা যাবে না বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগের দিন ১৯ আগস্ট জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কমাতে এবং দলীয় ভোট বিভাজন রোধে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য দলীয় আইনপ্রণেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন।

নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় দলীয় নেতা ও কিছু সংসদ সদস্যের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে জানিয়ে তিনি তাদের এ ব্যবধান কমিয়ে আনার আহ্বান জানান।

অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বেশ কয়েকটি আসন হারিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীরা আবারও সমর্থকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে বিএনপির কর্মকা-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দল সৎ, যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের সমর্থন করবে এবং প্রত্যেককে তাদের জন্য কাজ করতে হবে। কারণ এই নির্বাচনে ফলাফল খারাপ হলে তার প্রভাব উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনেও পড়বে।’

এর আগে গত ৯ আগস্ট রাতে নগরীর রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্য ও ত্যাগীদেরই সুযোগ দেওয়া হবে। দুর্বল বা অযোগ্য কাউকে মনোনয়ন দিলে অন্যরা সুযোগ নেবে। তাই দলের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে।’

চলতি সপ্তাহে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ : গত মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার সাক্ষাৎ করেন। পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ সম্পর্কে সাংবাদিকদের মীর শাহে আলম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে আগামী সপ্তাহে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনার জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করা হবে। নির্বাচনের তফসিল, তারিখ নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করবে। ইসির সঙ্গে আলোচনার পর মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্রিফিং করবে।’

তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মধ্যেই  পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনের জন্য বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা ইসির : গত বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনসহ তিন কমিশনার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব হবে। আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছি, জাতীয় নির্বাচনের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সমান পেশাদারত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আমাদের জানান তিনি দেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান এবং প্রধানমন্ত্রীও একই বিষয়ে আগ্রহী।’

নির্বাচন প্রসঙ্গে ইসির সার্বিক প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে সিইসি বলেন, ‘আমাদের  দিক থেকে প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি নেই। আচরণ বিধিমালা সংক্রান্ত নথি আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং শেষে ফেরত এসেছে, এখন শুধু সংশ্লিষ্ট ম্যানুয়াল তৈরির কাজ বাকি। আমরা সচিবালয়কে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন রাখতে বলেছি। সবুজ সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচনী কাজে নেমে পড়বে কমিশন।’

তফসিল ও ভোটের সময়সূচি নিয়ে সিইসি বলেন, ‘আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে এ বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনও ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুটি নির্বাচনের সময় যাতে পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করেই এগোতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সিইসি বলেন, আশা করছি সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তফসিল দিতে সক্ষম হব। তবে নির্বাচন শেষ হতে আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।’

রাষ্ট্রপতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে সিইসি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি কমিশনের ওপর কিছু চাপিয়ে দেননি। তিনি শুধু প্রস্তুতি কেমন চলছে তা জানতে চেয়েছেন এবং কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে, পেশাদারভাবে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে, সেজন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত