কয়েকজন যুবকের হাতে নিষিদ্ধ একটি কবিতার বই। পুরোপুরি কবিতা নয়, তাতে গানও আছে। অবিস্মরণীয় আগ্রহে অনেকেই হাত বাড়িয়ে নিচ্ছেন বইটা। দাম এক টাকা ছয় আনা। শুধু নিষিদ্ধ বলে নয়, ওই বইয়ের কবিতাগুলোতে যেন বারুদ পোরা রয়েছে। কবিতা যে এতটা জ্বালাময়ী হতে পারে, নিষিদ্ধ করে রাজন্যরা সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন আগেই। বঙ্গীয় কংগ্রেসের সভা চলছে। তাতে উপস্থিত হয়েছেন মহাত্মা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। সেই সভাতেই এসেছেন কবি তার নিষিদ্ধ কবিতার বই নিয়ে। বইটির নাম বিষের বাঁশী আর কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আগ্রহ এই বইটিকে ঘিরেই।
বিষের বাঁশী কাজী নজরুল ইসলামের তৃতীয় প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ। প্রকাশকাল শ্রাবণ ১৩৩১, আগস্ট ১৯২৪। প্রকাশক কবি স্বয়ং। তার হুগলির ঠিকানায় গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। পরিবেশক ছিল ডি এম লাইব্রেরি। পৃষ্ঠা ৪+৬০। প্রচ্ছদশিল্পী দীনেশরঞ্জন দাশ। কবিতার আকারে বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে মিসেস এম রহমানকে।
বিষের বাঁশী প্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজরোষের শিকার হয়। এই গ্রন্থপ্রকাশ উপলক্ষে নজরুল লিখেছিলেন, ‘বিশেষ কারণে কয়েকটি কবিতা ও গান বাদ দিতে বাধ্য হলাম। কারণ “আইন” রূপ “আয়ান ঘোষ” যতক্ষণ তার বাঁশ উঁচিয়ে আছে, ততক্ষণ বাঁশীতে তথাকথিত “বিদ্রোহ”-রাধার নাম না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ওই ঘোষের পোর বাঁশ বাঁশীর চেয়ে অনেক শক্ত। বাঁশে ও বাঁশীতে বাঁশাবাঁশী লাগলে বাঁশীটির ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেন না, বাঁশী হচ্ছে সুরের, আর বাঁশ হচ্ছে অসুরের।... এ “বিষের বাঁশী”র বিষ জুগিয়েছেন আমার নিপীড়িতা দেশমাতা, আর আমার ওপর বিধাতার সব রকম আঘাতের অত্যাচার।’
বিষের বাঁশীতে কবিতা রয়েছে আটটি আর গান সতেরোটি। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ রচনার জন্য ১৯২৩ সালে রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুলের এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। পরের বছর ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট বিষের বাঁশী প্রকাশের মাত্র আড়াই মাস পর ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বিষের বাঁশী প্রকাশের আগেই তিনি জাতীয় বীরের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে দেশবাসীর কাছ থেকে উচ্ছ্বসিত সংবর্ধনা ও অভিনন্দন পাচ্ছিলেন। নজরুল তখন জেলফেরত অকুতোভয় বিপ্লবী, রবীন্দ্রনাথও যাকে বাংলা কবিতার ভুবনে বরণ করে নিয়েছেন। বিষের বাঁশীতে ঘটেছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সংগ্রাম, অসহযোগ, খেলাফত ও স্বরাজ আন্দোলনের বিক্ষুব্ধ প্রকাশ। এর অধিকাংশ কবিতা ও গান নজরুলের বন্দি ও অনশন জীবনের সৃষ্টি। পরাধীনতার গ্লানি তার কবিতাকে করেছে তীব্র, তীক্ষ্ণ , জ্বালাময়ী। অগ্নি-বীণায় যে-বিদ্রোহ ছিল পুরাণাশ্রিত, তাত্ত্বিক, তাই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছোঁয়ায় হয়ে ওঠে স্বদেশমুক্তির অনন্য ডিসকোর্স।
নিষিদ্ধের ইতিবৃত্ত
বিষের বাঁশীর পাণ্ডুলিপি তৈরির সময় নজরুল রাজরোষের শঙ্কায় তার লেখা অন্য আরও কয়েকটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেননি, এ কথা তিনি নিজেই বলে গেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই কবিতার বইটি নিষিদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।
সরকারি গোয়েন্দারা বিষের বাঁশীর মধ্যে রাজদ্রোহের উপাদান খুঁজে পেলেন। ১৯২৪ সালের ২১ আগস্ট বেঙ্গল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্ত কয়েকটি কবিতার অনুবাদসহ একটা নোট পাঠালেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। তথ্য-অনুসন্ধানের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল ঔপনিবেশিক শাসকের দ্বারা নিয়োজিত এই দত্তগুপ্তের। তিনি এই কাজের দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষা অধিকর্তাকে ইংরেজিতে একটা নোট লিখে জানালেন, তরুণচিত্তে বিপ্লবাত্মক ভাবনা জাগিয়ে তোলা বা আইন অমান্য করার উপাদান এতে রয়েছে।
সরকারি গ্রন্থাগারিকের কাজই হচ্ছে বিভিন্ন বইয়ের রাজদ্রোহমূলক ষড়যন্ত্রের উসকানির উপাদান খুঁজে বের করা এবং সে বিষয়ে প্রভুদের কাছে গোপনে প্রতিবেদন পাঠানো। তিনি নজরুলের কবিতার ভাবসম্পদকে অনুধাবন করতে না পেরে নিতান্তই অলীক (vague) বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবু মহামহিম প্রভুর সাম্রাজ্যে একজন রাজদ্রোহী জেলখাটা কয়েদির লেখায় রক্ত, সংঘাত, মৃত্যু, আগুন, নরক, দানব, বজ্র এসব মারাত্মক শব্দের বাড়াবাড়ি ঘটেছে বিধায় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন। তার চিঠি গেল শিক্ষা অধিকর্তার কাছ থেকে পুলিশ কমিশনার টেগার্টের কাছে। তিনি চাবুক, মুগুর, লাঠি, গুলি এসবের অর্থ ঠিকই বুঝলেন। টেগার্ট ১৯২৪ সালের ১৮ অক্টোবর মন্তব্যসহ চিঠি লিখলেন মুখ্য সচিব এএন মবারলিকে। মবারলি ১৯২৪ সালের ২২ অক্টোবর ১০২৭০ পি নং গেজেট নোটিফিকেশনে মাধ্যমে বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিলেন।
বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্তের গেজেট বিজ্ঞপ্তি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি ঔপনিবেশিক শাসকরা। এই বইয়ের কপির খোঁজে কবির হুগলির বাড়িসহ আর্য পাবলিশিং হাউস, ইন্ডিয়ান বুক ক্লাব, কল্লোল পাবলিশিং, ডি. এম. লাইব্রেরি, বরেন্দ্র লাইব্রেরি, বাণী প্রেস, সরস্বতী লাইব্রেরিতে তল্লাশি চালানো হয়।
বিষের বাঁশীর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আবেদন, এমনকি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় দাবি জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। ১৯৩৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় কবি ও রাজনীতিক হুমায়ুন কবীর নজরুলের নিষিদ্ধ বইগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলেন। এর জবাবে ১০ মার্চের এক আদেশে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়। ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহমের মতো কবিতা থাকা সত্ত্বেও বিষের বাঁশী এখনো বাজেয়াপ্ত রয়েছে কেন, ব্যবস্থাপক সভার আরও একজন সদস্য মৌলবি মুহম্মদ ফজলুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছিলেন।
বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী নজরুলের নিষিদ্ধ বইগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানান। মিনার পত্রিকার বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬ সংখ্যায় এই আবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল, যা ছিল এ রকম :
‘... বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের যুগবাণী, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা, চন্দ্রবিন্দু আজও আইনের বিধানে অবৈধ। নজরুল ইসলাম আধুনিক বাংলায় মুসলিম জাগরণের প্রথম হুংকার, তাই তাহার রচনাবলি পাঠের সুযোগ হইতে বঞ্চিত হওয়া দেশবাসীর পক্ষে নিতান্তই দুঃখদায়ক। এই দুঃখের প্রতিকার আমরা আজ দৃঢ়তা সহকারে দাবি করি। অন্যান্য প্রদেশের কংগ্রেসি মন্ত্রিসভা যদি অনুরূপ দাবি পূরণ করিতে সমর্থ হইয়া থাকেন, তবে বাংলার হক (এ. কে. ফজলুল হক) মন্ত্রিসভার তাহা পূরণ না করিবার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণই থাকিতে পারে না।’
কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের এই আবেদনে মুসলিম লীগ সরকার কর্ণপাত করেনি। লীগ মন্ত্রিসভায় তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমউদ্দীন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের বংশবদ মন্ত্রী নাজিমউদ্দীন ১৯৩৯ সালের মার্চে ঘোষণা করেন, দেশে গণবিদ্রোহ ও বৈপ্লবিক সংগঠনগুলোর রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ অক্ষুণ্ণ রয়েছে, ফলে বাজেয়াপ্তের অবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে।
সেই সময় মন্ত্রিসভা লিগের হলেও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইচ্ছাশক্তির বিরোধিতা করার দৃঢ়তা তারা দেখাতে পারেনি। ফলে নিষিদ্ধের প্রত্যাহারও সম্ভব হয়নি। এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় ভারত বিভাগের দুবছর আগে ১৯৪৫ সালের ২৭ এপ্রিল।
নিষেধাজ্ঞা-প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়ায় গুলিস্তাঁ নামের একটি সাময়িকীর নজরুল সংখ্যায় (১৩৫২) সজনীকান্ত দাস উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্তব্য করেছিলেন :
‘কাজী নজরুল ইসলামের বিষের বাঁশী সম্প্রতি রাজরোষমুক্ত হইয়াছে। ...বাংলা দেশের মতো অনড় ও জড় দেশকে জাগাইবার জন্য যে আবেগময় উচ্ছ্বসিত প্রাণবন্যার প্রয়োজন ছিল কবি নজরুলের মধ্যে তাহার প্রকাশ ঘটিয়াছিল।... ইহার আঘাত সরকার সহ্য করিতে পারেন নাই বলিয়াই দীর্ঘকাল ইহার প্রচার রদ করা হইয়াছিল। সম্প্রতি আইন-শাসনমুক্ত এই বিষের বাঁশীর কথা আমরা প্রচার করিবার সুযোগ পাইতেছি।’
এর আগেই অবশ্য ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই কলিকাতা বেতারে কবিতা পাঠ করতে করতে নজরুল অকস্মাৎ বাকরুদ্ধ হয়ে যান। তার গ্রন্থের অবমুক্তির কথাটি তিনি সুস্থ অবস্থায় জানতে পারেননি।
ধূমকেতুতে প্রকাশিত আনন্দময়ীর আগমনে কবিতাটির জন্য রাজদ্রোহের বিচার করে নজরুলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু অন্য বইগুলোর জন্য তাকে কারাগারে যেতে হয়নি, শুধু নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নজরুলই হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল কবি, যার পাঁচ-পাঁচটি বই রাজদ্রোহের অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়েছিল। কোনো একক বাঙালি লেখকের এই হচ্ছে সর্বোচ্চ সংখ্যক বই নিষিদ্ধের ইতিহাস। সেই ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে নজরুলকে ঘিরে।
নিষিদ্ধ শব্দবাণ
বিষের বাঁশী
‘নিষিদ্ধ শব্দবাণ’ বিশ্বসাহিত্যের সেইসব বইয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, যেগুলো কোনো না কোনো সময়ে রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শিক গোষ্ঠী কিংবা সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে নিষিদ্ধ, বিতর্কিত বা দমনের শিকার হয়েছিল। প্রতিটি পর্বে তুলে ধরা হবে একটি বইয়ের প্রকাশ-ইতিহাস, নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং সময়ের সঙ্গে তার সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক গুরুত্বের পুনর্মূল্যায়নের গল্প
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-১
জিভাগোর ইতিকথা
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-২
লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৩
লোলিতা
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৪
দ্য ম্যানিফেস্টো অব দ্য কমিউনিস্ট পার্টি
মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম
নন্দনকানন, চট্টগ্রাম, জুলাই ১৯২৬। আলোকচিত্র : হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। গ্রাফিক্স : দেশ রূপান্তর
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
×
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০