গানে গানে বেঁচে থাকার নাম আইয়ুব বাচ্চু

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৮ এএম

আইয়ুব বাচ্চু। সুরের মূর্ছনায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন কয়েক প্রজন্মকে। বাংলা রকের ক্যানভাসে ইলেকট্রিক গিটারের তারে তারে বুনেছিলেন এক নতুন দিগন্ত। আজ সুরের জাদুকর, গিটারজাদুকরকে হারানোর দিন। ২০১৮ সালের এই দিনে অগণিত ভক্তকে কাঁদিয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। সময়ের স্রোতে ভেসেই চলেছে দিন, মাস, বছর; অথচ তার গিটারের সেই চেনা মূর্ছনা এক বিন্দুও বিবর্ণ হয়নি। রুপালি গিটার স্তব্ধ হলেও, শ্রোতার হৃদস্পন্দনে তিনি জীবন্ত। গানে গানে বেঁচে থাকার নাম আইয়ুব বাচ্চু।

স্বাধীনতা-উত্তর চট্টগ্রামে তার পথচলা শুরু। বাবা ইশহাক চৌধুরীর কেনা জুবিলী রোডের বাড়িতেই কেটেছে এই রক লিজেন্ডের শৈশব ও কৈশোর। একুশ শতকের তরুণদের কাছে যিনি সংগীতের অনুপ্রেরণা, তার সেই যাত্রার সূচনা ১১তম জন্মদিনে বাবার দেওয়া এক উপহারী গিটারে। কৈশোরেই লেড জেপলিন, ডিপ পার্পল কিংবা দ্য জিমি হেনড্রিক্স এক্সপেরিয়েন্সের গান শুনে রকের প্রেমে পড়েন তিনি। বিশেষ করে জিমি হেনড্রিক্সের অনন্য পরিবেশনা তাকে ভীষণভাবে টানে।

১৯৭৫ সালে সরকারি মুসলিম উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াকালে বন্ধুর গিটার ধার এনে বাজাতেন বাচ্চু। বাজনার প্রতি এমন অনবদ্য ভালোবাসা দেখে বন্ধুটি শেষমেশ গিটারটি তাকেই উপহার দেন। পরবর্তী সময় সুরের ব্যাকরণ শেখেন জেকব ডায়াজের কাছে। কলেজ জীবনে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘গোল্ডেন বয়েজ’ (পরে ‘আগলি বয়েজ’), যেখানে গায়ক ছিলেন কুমার বিশ্বজিৎ আর গিটারিস্ট বাচ্চু।

১৯৭৭ সালে ‘ফিলিংস’ এবং ১৯৮০ সালে নকীব খান ও তপন চৌধুরীর আহ্বানে ‘সোলস’-এ যোগ দেন তিনি। সোলসের হয়ে পরবর্তী এক দশকে ‘সুপার সোলস’, ‘কলেজের করিডরে’, ‘মানুষ মাটির কাছাকাছি’ ও ‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট’ অ্যালবামে তার গিটার ও কণ্ঠের উপস্থিতি ব্যান্ডটিকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

১৯৯১ সালে এসআই টুটুল, সাইদুল হাসান স্বপন ও হাবিব আনোয়ার জয়কে নিয়ে জন্ম নেয় ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ সংক্ষেপে ঐতিহাসিক ‘এলআরবি’। ১৯৯২ সালে দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম ‘এলআরবি-১’ ও ‘এলআরবি-২’ দিয়ে বাজারে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়, তা আর কখনোই থামেনি। ‘সুখ’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘আমাদের বিস্ময়’ কিংবা ‘যুদ্ধ’-এর মতো অ্যালবাম দিয়ে এলআরবি হয়ে ওঠে কোটি তরুণের উন্মাদনা।

ব্যান্ডের গন্ডি পেরিয়ে একক অ্যালবামেও তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ‘রক্ত গোলাপ’ ও ‘ময়না’ দিয়ে শুরু, আর ১৯৯৫ সালের ‘কষ্ট’ অ্যালবামটি বাংলা একক অ্যালবামের ইতিহাসে সৃষ্টি করে এক মাইলফলক। চলচ্চিত্রেও তার সুর ও গায়কী যোগ করেছে নতুন মাত্রা। ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘রুপালি গিটার’, ‘মেয়ে’ কিংবা ‘এক আকাশের তারা’র মতো গানগুলো যুগে যুগে বাঙালির আবেগ ও স্মৃতির নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকবে।

আজ শোকের দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্বজন, বন্ধুমহল ও ভক্তরা স্মরণ করবেন আইয়ুব বাচ্চুকে।

মঞ্চের বাতি নিভে গেছে, থেমে গেছে গিটারের গর্জন। তিনি যে সুর রেখে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী রয়ে যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত