 স্বাধীন বিচার বিভাগ

জনআক্ষাংকা বাস্তবায়নে বিলম্ব নয় 

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৭ এএম

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার মূল ভিত্তি মজবুত করা দুরূহ। ফরাসি দার্শনিক, বিচারক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শার্ল দ্য মন্তেস্কু, যার চিন্তাধারা রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তিনি এ নিয়ে প্রণিধানযোগ্য কথা বলেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি’তে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘যদি বিচার বিভাগ আইনসভা ও শাসন বিভাগ থেকে পৃথক না থাকে, তবে কোনো স্বাধীনতা থাকতে পারে না’। তার এই ভাষ্যের প্রতিফলন আমাদের দেশেও প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা জানি, সর্বোচ্চ আদালতে বিচার বিভাগকে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণের রায় হয়েছিল ২৭ বছর আগে হয় এবং সরকারের নথিপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগ পৃথক হয় ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর। এ নিয়ে ১ নভেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা জট ও বিচারপ্রত্যাশীদের অনিঃশেষ দুর্ভোগ নিয়ে যত কথা উঠে, তার সঙ্গে উঠে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুপ্রিমকোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রসঙ্গ। অর্থাৎ, বিভাগের স্বাধীনতা এখনো যেন দূরঅস্ত।

আমরা এও জানি, উচ্চ ও নিম্ন আদালতে মামলার পাহাড়। দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়তে বাড়তে এখন তা ৫০ লাখ ছুঁইছুঁই। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে ৪১ লাখের বেশি দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। প্রতি বছর উচ্চ ও নিম্ন আদালতে উল্লেখযোগ্য হারে মামলা নিষ্পত্তি হলেও জটের হার সংকুচিত হচ্ছে না। নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা মূলত নির্বাহী বিভাগ তথা আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকায় বিচার বিভাগ নিয়ে ‘দ্বৈত শাসন’ নীতির অভিযোগ নানা মহল থেকে ফিরে ফিরে উঠছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আদালত ও বিচারকরা নির্বাহী বা আইন বিভাগের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা প্রভাব ছাড়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেন। আমরা দেখেছি, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় ও স্বাধীনতা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইনি জটিলতায় কিংবা সদিচ্ছার অভাবে তা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি আশাবাদ বা নিরাশাবাদের নয়, সরকারের সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য নীতিনির্ধারকদের মানসিকতাই হলো সমস্যা এই অভিযোগ অমূলক নয়। বিচার বিভাগের আর্থিক স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের স্মরণে আছে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছিলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার মানে হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা, আধিপত্য বিস্তার নয়। এ জন্য একটি স্বাধীন সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা জরুরি, যা বিচার বিভাগের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করবে। আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসে এমন কোনো উদাহরণ নেই, যেখানে বিচার বিভাগ এককভাবে রাষ্ট্রের ওপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিয়েছে।’ এসব বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তো বটেই, বিদ্যমান পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটেও ভুক্তভোগীরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্ব পদে পদে অনুভব করেন।

দেশে বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে না, এই অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিচার বিভাগের স্বাভাবিক কাজে বাধা সৃষ্টি করছে, নজির আছে এরও। চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত রাজনৈতিক সরকারের পরবর্তী প্রেক্ষাপট এ ক্ষেত্রে যে আশার সঞ্চার করেছিল তাও সংস্কার কমিশন গঠন ও সুপারিশের মধ্যেই আটকে থাকে। বিরোধী দলে থাকার সময় বিএনপি বারবার অভিযোগ করেছে, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৬ সালে সাধারণ নির্বাচনের জন্য দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও একই অঙ্গীকার করা হয়। আমরা আশা করি, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিপুল জনরায়ে গঠিত বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে রাজনৈতিক নয়, দেশ-জাতির স্বার্থকে অগ্রগণ্য রেখে। দীর্ঘদিনের জনআকাক্সক্ষার বাস্তবায়নে তারা তাদের অতীতের অভিযোগ খ-াতে যথাযথ ভূমিকা দৃশ্যমান করবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত