পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষায় হোক কৃষি উৎপাদন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

জলাভূমি আছে বলেই প্রাণের বৈচিত্র্য আছে, বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে, পুষ্প আছে, পাখি আছে, মিঠাপানির মাছ আছে, হিজল করচ, মান্দার, তমাল, বরুম গাছ আছে, বনরাজি আছে, পানির স্তর আছে এবং প্রকৃতি টিকে আছে। নদী নাই, জলাভূমি নাই, সবুজ নাই, সবুজ উদাও! যেখান দিয়ে নদী বয়ে যাবে যেখানের সবকিছুই বাঁচবে। জলাভূমি যেখানে আছে সেখানে বাস্তুতন্ত্র টিকে থাকবে। বন্যপ্রাণীরা টিকে থাকবে। জলজ উদ্ভিদ টিকে থাকবে। এটাই বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্র। উচ্চফলনের আশায় কৃষিতে বাধাহীনভাবে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দেশের প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। ফসলের মাঠে বালাইনাশক ব্যবহারে কীটপতঙ্গ আসে না, এলেও মারা পড়ে। কীটনাশক প্রয়োগে উপকারী পোকামাকড়ের ডিম মারা যায়। এর অতিরিক্ত ব্যবহার জনস্বাস্থ্য তো বটে, পুরো প্রাণিকুলকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। অতিরিক্ত কীটনাশকে মারা পড়ছে পরাগায়নে সবচেয়ে জরুরি উপকারী সব পতঙ্গ। অথচ ফসল উৎপাদনে পরাগায়নের বিকল্প নেই। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে বিপন্নের পথে পরাগায়নে অতি জরুরি মৌমাছি। পৃথিবীর ৮৬ শতাংশ পরাগায়ন মৌমাছির মাধ্যমে হয়।

চায়না দুয়ারি জাল ছোট মাছ, ডিম, পোনামাছ, শামুক, ঝিনুক, জলজপ্রাণ, চিংড়ি, কাঁকড়া, ঘাস, জলজ উদ্ভিদ, অন্যপ্রাণের খাদ্যের উৎস ধ্বংস করে। প্রজননচক্র ভেঙে ফেলে। চায়না দুয়ারিকে জাল হিসেবে বর্ণনা করা হলেও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটা চাঁই বা কারেন্ট জালের চেয়েও ভয়ংকর এক ফাঁদ। এই জাল এমনভাবে বোনা হয়েছে যে, একটি গিঁট থেকে আরেকটি গিঁটের দূরত্ব খুব কম। মূলত মশারি তৈরির নেটের আদলে এই জাল বোনা। জলজপ্রাণ ও মাছ একবার ঢুকলে আর বের হতে পারে না। তা ছাড়া জলাভূমিতে কারেন্ট জাল, বেরজাল, এয়ারগান, বিষটোপ ব্যবহার করা হয়। বিষটোপ হিসেবে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড, গ্যাস ট্যাবলেট, রোটেনন, ল্যাম্বডা, সাইহ্যালোথ্রিন, গ্লাইফোসেট নামক বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া হিজল করচ বন উজাড়, সেচ দিয়ে মাছ ধরা, পোনামাছ, ডিমওয়ালা মা মাছ ধরা বিক্রি, মাটি ঘেঁষে জাল টানা, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পানি দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, উজান থেকে আসা রাসায়নিকযুক্ত পানি, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, পানিতে অক্সিজেনের অভাব, শামুক ঝিনুক নির্বিচারে আহরণ এবং চুন, মাছের ও হাঁস-মুরগির খাবার তৈরির জন্য কোম্পানির কাছে বিক্রি করা, জলাশয়ের নীরব বন্ধু ও বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী। হাওর হলো জেলের পেশা, পাখির খাবার, প্রাকৃতিক জলজ খাবার, মিঠাপানির মাছ, পাখির আবাসস্থল, প্রাকৃতিক জলাধার, পরিযায়ী পাখি, জলজ পরিবহন, সেচের পানিসহ অনেক প্রাকৃতিক সম্পদের আবাসস্থল। ছোট ছোট মাছ ও পতঙ্গের  ভেতর ফুরাডান, বাসুডিন, কার্বোটাফ, গণফসফরাস, নিউনিকোটিনয়েড নামক বিষ দিয়ে ফেলে রাখে সেগুলো পাখি খেলে অজ্ঞান হয়ে যায়। এসব বিষ খুবই মারাত্মক। তা ছাড়া নাইনলের সুতার তৈরি ফাঁদ, বক ধরার জন্য কলাপাতার ঘর, ঘুঘু ধরার জন্য পিঞ্জর, গুলতি, বন্দুক, ব্যবহার করা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন খাল, বিল, ডোবা এবং নদীতে মোট ২৬০ প্রজাতির দেশীয় মাছ দেখা যায়। এর মধ্যে ছোট মাছের সংখ্যা ১৪৩ প্রজাতি। তবে এর মধ্যে ১২ প্রজাতি চরম বিপন্ন, ২৮ প্রজাতি বিপন্ন এবং ১৪ প্রজাতি সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। তীব্র কীটনাশক পানিতে ঢেলে দেওয়া হয়। এতে পানির অক্সিজেন দ্রুত কমে যায় এবং ছোট-বড় সব মাছ ও জলজ প্রাণী ভেসে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে কার্বাইড ও বিস্ফোরক পটকা বা হালকা বিস্ফোরক ব্যবহার করে পানিতে শক দেওয়া হয়, যা মাছের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ নষ্ট করে দেয়। তীব্র আলো শক্তিশালী ব্যাটারির সাহায্যে পানিতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। এতে ওই এলাকার মাছের প্রজনন ক্ষমতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় এবং পোনা মাছ তাৎক্ষণিক মারা যায়। হাওরাঞ্চলে প্রধানত বোরো ধানের আবাদ হয়। বছরে একটিমাত্র ফসল ঘরে তোলার লড়াইয়ে কৃষকরা পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। অসচেতনতা এবং স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতাদের অতি-মুনাফার লোভে অনেক সময় সরকারিভাবে নিষিদ্ধ বা অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিষাক্ত রাসায়নিক জমিতে ছিটানো হয়। একটি সুস্থ জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তি হলো ফাইটোপ্লাংকটন জুপ্লাংকটন এবং বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ হাওরের বাস্তুতন্ত্রে শামুক এবং ঝিনুকের ভূমিকা অপরিসীম। এদেরকে বলা হয় প্রাকৃতিক ‘পানি শোধনকারী’ বা ন্যাচারাল ফিল্টার। এরা পানি থেকে ক্ষতিকর উপাদান দূর করে পানি পরিষ্কার রাখে। চুন ও ক্যালসিয়ামের উৎস : শামুক-ঝিনুক মারা গেলে পানির প্রাকৃতিক ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

বাস্তুতন্ত্রের একটি নিয়তি হলো কেউ একা মরে না। যখন মাছ, শামুক ও পোকা-মাকড় মারা যায়, তখন তার প্রভাব পড়ে হাওরের পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীর ওপর। হাওরের কচ্ছপ, উদবিড়াল (ভোদড়), ব্যাঙ এবং জলজ সাপ আজ খাদ্যের অভাবে এবং বিষাক্ত পরিবেশের কারণে বিলুপ্তির পথে। কীটনাশকের ক্ষতিকর উপাদানগুলো প্রকৃতিতে সহজে নষ্ট হয় না। হাওর শুধু পানির আধার নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ, অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং প্রকৃতির এক অমূল্য আশীর্বাদ। নিষিদ্ধ ও বিষাক্ত কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার রোধ করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে হাওরগুলো একেকটি ‘মৃত জোনে’ পরিণত হবে, যেখানে কোনো প্রাণ থাকবে না। প্রকৃতি তার ওপর করা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না। তাই পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করে টেকসই কৃষির দিকে এগোতে হবে। হাওর বাঁচলে মাছ বাঁচবে, পাখি বাঁচবে, আর তবেই ভালো থাকবে আমাদের  দেশ।

লেখক : গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক।

okjrahman1971@gmail

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত