শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যক্রম, শ্রেণিকক্ষ সব একই অথচ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে পরীক্ষার ফলাফলের চিত্র। এক সরকারের আমলে যে পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৮ শতাংশের বেশি, অন্য সরকারের আমলে তা নেমে এসেছে ৫২ শতাংশে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে এইচএসসিতে পাসের হার কমেছে ২৬ শতাংশের বেশি। শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলো নয়, গত ৩৬ বছরের পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণেও দেখা যায়, কখনো পাসের হার নেমেছে ২৫ শতাংশের নিচে, আবার কখনো পৌঁছেছে শতভাগে।
এই নাটকীয় উত্থান-পতন সামনে এনেছে এক মৌলিক প্রশ্ন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে কি বদলে যায় পরীক্ষার মূল্যায়নপদ্ধতিও? আগের সরকারের আমলে কি নম্বর বাড়িয়ে ফল ভালো দেখানো হয়েছিল, নাকি বর্তমান সরকার ফল কমিয়ে দিচ্ছে, অথবা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখনঘাটতি প্রকাশ পাচ্ছে? একই শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েক বছরের ব্যবধানে ফলাফলের এমন বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষাবিদরা পরীক্ষার মান, উত্তরপত্র মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
২০২৩ থেকে ২০২৬ এই চার বছরের এইচএসসির ফল বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবশেষ ২০২৩ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশে। যদিও এই ফল অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকাশ হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা ও মূল্যায়ন সবই ছিল আগের সরকারের নিয়মেই। কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক ধাক্কায় পাসের হার নেমে আসে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে। সর্বশেষ গত শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৬ এই সময়ের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।
শুধু এই চার বছরের হিসাব নয়, ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এইচএসসির ৩৬ বছরের ফলাফলেও পাসের হারে বড় উত্থান-পতন দেখা যায়। কোনো বছর পাসের হার ২৫ শতাংশের নিচে নেমেছে, আবার কোনো বছর তা শতভাগে উন্নীত হয়েছে। সার্বিকভাবে পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মান কতটা বেড়েছে, সেটাই বড় প্রশ্ন। পাসের এই হার হ্রাস-বৃদ্ধিতে শিক্ষার মান নাকি সরকারের সিদ্ধান্ত ভূমিকা রাখে তা স্পষ্ট নয়!
৩৬ বছরের ফলাফলে বড় উত্থান-পতন : বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এইচএসসির ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে পাসের হার ছিল ২৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয় এবং ১৯৯২ সালে ৬৫ দশমিক ৪৬ শতাংশে পৌঁছায়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আবার বড় পতন ঘটে। ওই বছর পাসের হার নেমে আসে ২৪ দশমিক ৭৭ শতাংশে। পরবর্তীতে ফলাফলে ধীরে ধীরে উন্নতি দেখা যায়। ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০০৫ সালে তা বেড়ে হয় ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০০৮ সালে পাসের হার দাঁড়ায় ৭৪ দশমিক ৮৫ শতাংশে। অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরে ফল বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে ৪০ শতাংশের নিচে পাসের হার নামে ১৯৯০-২০০৩ এই সময়ে সাতবার। এই ১৮ বছরে ফল ছিল অধারাবাহিক।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯-২৪ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৭০-৭৯ শতাংশের ঘরেই ছিল। কেবল পাঁচবারই ফল ৭০ শতাংশের কম বা বেশি ছিল। কোভিডের সময় ২০২০ সালে অটোপাসের ফলে শতভাগ উত্তীর্ণ হয়। আওয়ামী লীগ আমলে উদারভাবে খাতা দেখার নীতি চালু হয়, যা নিয়ে বিভিন্ন সময় শিক্ষাবিদরা সমালোচনা করেছিলেন। ২০১৭ সালে এইএসসির ফল খারাপ হওয়া প্রসঙ্গে তখনকার শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আগে প্রধান পরীক্ষকরা খাতাই দেখতেন না। আবার পরীক্ষকও ঠিকভাবে দেখেননি। এ জন্য এবার সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই পরিবর্তনই কাম্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। এতে তারা বিস্মিত নন।’ অথচ এর আগে টানা আট বছর ধরেই তার সরকার ক্ষমতায় ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক বোর্ড চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে প্রান্তিক নম্বর পূর্ণ করে দেওয়ার ঘটনা ছিল, তখন সরকার থেকে গ্রেস নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া, হাফ বা ১ নম্বর বাড়িয়ে জিপিএ-৫ দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। সরকারের নির্দেশনাই তারা পরীক্ষকদের ব্রিফ করতেন।’
রাজনৈতিক সময়কাল বিবেচনায় নিলে ফলাফলের এই উত্থান-পতন আরও আলোচনার দাবি রাখে। ১৯৯১-৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি, ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি এবং ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের ফল দেখা যায়। এরপর ২০০৯-২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আবার আওয়ামী লীগ, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি সরকার দায়িত্ব পালন করছে।
খাতা মূল্যায়নে নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ : ফলাফলের এই বড় পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি। বিশেষ করে আগের বছরগুলোতে পরীক্ষার খাতায় উদারভাবে নম্বর দেওয়া, প্রান্তিক নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া এবং দুর্বল উত্তরেও নম্বর দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এবার সে রকম ঘটনা ঘটেনি, যা ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
২০১৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পরীক্ষকদের বক্তব্যে উঠে আসে, আগের কয়েক বছর কিছু পরীক্ষক ভুল উত্তরের জন্যও নম্বর দিয়েছেন। কোনো শিক্ষার্থী ৭৭ পেলে তাকে ৮০ নম্বর দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যায়।
বিষয়টি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে গত শনিবার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের বক্তব্যে। তিনি বলেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন শতভাগ নির্মোহভাবে করা হয়েছে। পূর্বের সময়ে খাতা মূল্যায়নে কৃত্রিম জিপিএ-৫ বা পাসের হার বৃদ্ধির প্রবণতা পরিহার করে এবার শতভাগ মেধানির্ভর ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
সরকারের চিন্তা ও নির্দেশনার বাস্তবায়ন ফলাফলে পাওয়া যায় বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারগুলো তার নীতি সম্পর্কে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে যে নির্দেশনা দেয়, তা-ই অনুসরণ করেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যায়ন পদ্ধতিও বদলে যায়, যা সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। আমাদের যদি একটি শিক্ষা কমিশন থাকত, তাহলে তারা যৌক্তিক নির্দেশনা দিতে পারত।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন যা ফল হচ্ছে এটাই প্রকৃত চিত্র। আমাদের সন্তানদের যে সক্ষমতা তারা সেই ফল অর্জন করছে। আওয়ামী লীগ সরকার উদার খাতা দেখার যে নীতি গ্রহণ করেছিল, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।