৭ নভেম্বর আজও প্রাসঙ্গিক

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার বিপ্লব গত ৫১ বছর ধরে দেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে বলে দিনটি জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আজও প্রাসঙ্গিকএমনটি মনে করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে দিবসটির বিষয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন দলের প্রবীণ এই নেতা। 

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে একদলীয় শাসনের অবসান হয়েছিল। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছিল। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব জাতিকে স্বৈরাচারের দুঃশাসন থেকে মুক্তির আন্দোলনের প্রেরণা জোগায়। এরই ধারাবাহিকতায় ’৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল।

 তিনি মনে করেন, এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ জুলাই আন্দোলন ২০২৪-এ রক্তপিপাসু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন হয়েছে।

প্রশ্ন : সিপাহি-জনতার বিপ্লবকে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রুহুল কবির রিজভী : অবশ্যই সিপাহি-জনতার বিপ্লবকে আমরা মূল্যায়ন করি। কারণ এই বিপ্লবটা হচ্ছে গণতন্ত্রকে হত্যা করে যে একদলীয় বাকশালী শাসনের যাত্রা শুরু হয়েছিলে, তার পতনের জন্য। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছিল। এটার মধ্যে দিয়ে মানুষের স্বাধীনভাবে কথা বলা সুনিশ্চিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী হয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই দিন রাষ্ট্র ক্ষমতার পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে মনে হয়েছে যে, একটা নতুন স্বাধীনতার স্বাদ এদেশের মানুষ পেয়েছে।

৭ নভেম্বর আমাদের মুক্তির দিন। গণতন্ত্রের মুক্তির দিন। কথা বলার স্বাধীনতার মুক্তির দিন। আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার দিন। আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন। আমি এভাবেই এটা বিবেচনা করি। কারণ এর আগে আমরা দেখেছি গণতন্ত্রকে একেবারে খুব ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছিল। পার্লামেন্টের ভেতরেই মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটি আইন প্রণয়ন করে বাকশাল করা হয়েছিল। সব দল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শুধু একটা দল থাকবে। সব সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকার সমর্থিত মাত্র চারটা পত্রিকা রাখা হয়েছিল। এই যে ঘটনাগুলোএই ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে একটি ভয়ংকর দুঃশাসন চেপে বসেছিল। তার আগের যে অত্যাচার, উৎপীড়ন, নিপীড়ন, বিরোধী দলের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল ’৭২-এর পর থেকে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে ঘটতে চরম পর্যায়ে আসে তখন এই বাকশালটা গঠন করা হয়। অর্থাৎ এক ব্যক্তি এবং একটি দলের দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী করার জন্যই বাকশাল করা হয়েছে।

এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একজন অনন্য সাধারণ গণতন্ত্রপ্রেমী মানুষ রাষ্ট্র ক্ষমতার পাদপ্রদীপের আলোই উদ্ভাসিত হয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমান, যিনি দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে মুক্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ’৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৭ নভেম্বরে এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সিপাহি-জনতা বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। তারা জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। তার হাত ধরেই এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র বহু পথ এবং মতের চর্চা শুরু হয়। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। যে রক্ষীবাহিনী স্বাধীনতার পর একটা ভয়ংকর অত্যাচারী বাহিনী গেস্টপো মতো শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার করেছে। জিয়াউর রহমান সেই রক্ষীবাহিনী বাতিল করে দেন। নানা গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

প্রশ্ন : দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য তখন সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ঐক্য থেকে আমাদের আজকের প্রজন্ম কী শিক্ষা নিতে পারে?

রুহুল কবির রিজভী : সিপাহি বিপ্লব জাতিকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং উৎপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নামলে অত্যাচারী শাসক যে পরাজিত হয় তার প্রমাণ হচ্ছে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার এই বিপ্লব। এই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে ’৯০-এ আরেক ভয়ংকর এক নায়ক হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতন হয়েছে। ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের একজন ভয়ংকর রক্তপিপাসু ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার পতন হয়েছে এবং সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে

প্রশ্ন : বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের প্রভাব বর্তমান প্রেক্ষাপটে কি প্রাসঙ্গিক? কীভাবে ?

রুহুল কবির রিজভী : এটা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে দেশে বহুদুলীয় গণতন্ত্রের ধারা শুরু হয়েছে। এখনো প্রাসঙ্গিক যে, এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ এদেশের ছাত্র-জনতা ২৪-এর জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী পর্যায়ে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। ভবিষ্যতে গণতন্ত্রেও এ অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে। সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র এবং সমাজের মানে গণতান্ত্রিক যে চেহারা এবং গণতন্ত্রের শক্তিশালী করার যে অঙ্গীকারগুলো, সেখানে বিধিবদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন : রাজনৈতিক বিভাজন দূর করতে ৭ নভেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো কী কী বার্তা নিতে পারে? 

রুহুল কবির রিজভী : ৭ নভেম্বরের আগে দলগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ৭ নভেম্বরের পরে বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। একই সমাজে, একই রাষ্ট্রে রাজনীতি করার অধিকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিশ্চিত করেছিলেন। যারা একদলীয় রাজনীতি চালু করেছিলেন তাদেরও রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। রাজনীতিতে বহু দল থাকবে, বহু মত থাকবে কিন্তু তারা রাজনীতির চর্চা করতে পারবে। একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে তারা অবস্থান করবে। কারও রাজনৈতিক মতামতের জন্য কেউ উৎপীড়িত হবে না, গুম হবে না। কেউ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হবে না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। দেশের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে। জনগণের পক্ষে কাজ করতে হবে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত