আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়

মেসির পথেই রোনালদো

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ এএম

লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন বেশিদিন হয়নি। তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও অবসরের ঘোষণা দিলেন। টানা ৬টি বিশ্বকাপ এবং সর্বাধিক ৬টি ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাস গড়া ২৩ বছরের জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন ৪১ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ তারকা।

অবসরের পর দেশের জার্সিতে মাঠে না নামলেও ক্লাব ফুটবলে খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি। বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে মাঠ মাতানো সিআরসেভেন পেশাদার ক্যারিয়ারে ১,০০০ গোলের স্বপ্নের মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্যে খেলছেন, যার বর্তমান গোলসংখ্যা ৯৮৫টি। তবে জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে রেকর্ড ১৪৬টি গোল ও রেকর্ড সর্বাধিক ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করেই লালিত এই অধ্যায় বন্ধ করলেন তিনি।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত দীর্ঘ এক ভিডিও বার্তায় পর্তুগালের অধিনায়কের ব্যাজ এবং ঐতিহ্যবাহী ৭ নম্বর জার্সিকে বিদায় জানিয়ে রোনালদো বলেন, ‘পর্তুগালের মানুষের জন্য সেই দিনটি এসে গেছে আমাদের জাতীয় দলের ৭ নম্বর জার্সিটি হস্তান্তর করার দিন। আমি কখনোই মনে করিনি এটি শুধু আমার একার। তবে ২৩ বছর এটি গায়ে চাপানোর, একে আগলে রাখার এবং সারা বিশ্বের স্টেডিয়ামগুলোতে এই জার্সি গায়ে তুলে নেওয়ার পরম সৌভাগ্য ও দায়িত্ব আমার ছিল। আজ সময় এসেছে এটি ভবিষ্যতের হাতে তুলে দেওয়ার।’

নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে তিনি আরও যোগ করেন, ‘সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না; কারণ কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নেওয়া যায় না, হৃদয় থেকেও নিতে হয়। ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হওয়া একটি যাত্রা আজ শেষ করছি, যা আমার জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন কেবল ম্যাচ, গোল, রেকর্ড বা ট্রফি দেখি না; আমি মানুষ দেখতে পাই। ফুটবল কেবল একটি খেলার চেয়েও অনেক বড় কিছু ফুটবল মানেই মানুষ।’ নিজের ক্যারিয়ারের আত্মতৃপ্তির কথা তুলে ধরে রোনালদো বলেন, ‘পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হওয়ার জন্য আমি সারা জীবন পরিশ্রম করেছি। আজ এসে বুঝতে পারছি, আমার সবচেয়ে বড় জয় ছিল পৃথিবীর সেরা দেশটির প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করা।’

রোনালদোর এই বিদায় কিন্তু সম্পূর্ণ মসৃণ বা চিত্রনাট্যের মতো সুন্দর হয়নি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি গত মাসে আর্জেন্টিনার হয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিদায়ী ম্যাচের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়লেও, রোনালদোর বিদায় এলো কিছুটা অনাকাক্সিক্ষত বিতর্কের ভেতর দিয়ে। ২৪ সেপ্টেম্বর নেশন্স লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়টিই শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে তার শেষ ম্যাচ হয়ে রইল।

পরের ম্যাচে জাতীয় দলের নতুন কোচ জর্জ হেসুস তাকে একাদশে না রেখে বদলি বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন এবং পরবর্তী ম্যাচেও শুরুর একাদশে না খেলানোর ইঙ্গিত দেন। এতে ক্ষুব্ধ ও অভিমানী রোনালদো জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানা করলেও কোচ হেসুস তার জন্য দরজা খোলা রাখার কথা বলেছিলেন। তবে আর অপেক্ষা না করে চূড়ান্ত বিদায়ের পথ বেছে নেন এই কিংবদন্তি।

রোনালদো জাতীয় দলে পদার্পণ করার আগে ফুটবল বিশ্বে পর্তুগাল কখনোই কোনো মেজর ট্রফি জিততে পারেনি। ২০০৩ সালে রুই কস্তা ও লুইস ফিগোর যুগে ১৮ বছরের তরুণ রোনালদোর অভিষেকের পর দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে। পর্তুগাল বড় টুর্নামেন্টগুলোর নিয়মিত শক্তিতে পরিণত হয়। রোনালদোর নেতৃত্বেই ২০১৬ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের প্রথম বড় ট্রফি ইউরো কাপ জয় করে। এছাড়া ২০১৯ এবং ২০২৫ সালে দুটি উয়েফা নেশন্স লিগ শিরোপাও ঘরে তোলে তারা।

রোনালদোর অভিষেকের আগে পর্তুগাল মাত্র ৩ বার বিশ্বকাপে খেলেছিল (১৯৬৬, ১৯৮৬, ২০০২)। কিন্তু রোনালদোর ২৩ বছরে দলটি টানা সবকটি বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেছে এবং ২০০৬ সালে চতুর্থ স্থান অর্জন করে। ইউরোর ক্ষেত্রেও ঠিক একই চিত্র প্রতিটি আসরেই অংশ নিয়েছে তারা।

কোচের সঙ্গে বিভেদ এবং ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার বিতর্কের রেশ থাকলেও, পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন তাদের ইতিহাসের সেরা সন্তানের এই আকস্মিক বিদায়কে সম্মাননা ছাড়া শেষ হতে দিতে রাজি নয়। এক বিবৃতিতে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন জানায়, ‘পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন আমাদের চিরকালের অধিনায়কের প্রতি গভীর ও অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। তিনি পর্তুগাল ফুটবলের মর্যাদা বিশ্বদরবারে বৃদ্ধি করেছেন এবং কোটি কোটি তরুণকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমাদের কাছে তিনিই সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়।’ পর্তুগিজ সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে রোনালদোর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ খুব শিগগিরই একটি জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছে ফেডারেশন।

খেলার বিশ্ব থেকে কিংবদন্তিদের সময়মতো বিদায় নেওয়াটা সবসময়ই কঠিন। মাঠের পারফরম্যান্সে কিছুটা বয়সের ছাপ পড়ায় শেষ কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টে রোনালদোকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও পর্তুগিজ ফুটবলে তার অবদান চিরভাস্বর। দেশের ফুটবলকে একদম শূন্য থেকে বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মূল কারিগর তিনি। মাদেইরা দ্বীপের সেই বল কুড়ানো ছোট্ট ছেলেটি থেকে বিশ্বফুটবলের রাজপুত্র হয়ে ওঠার যে গল্প রোনালদো রচনা করেছেন ৭ নম্বর জার্সির সেই তেজ ও ইতিহাস পর্তুগিজ ফুটবলের ধমনিতে চিরকাল বহমান থাকবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত