জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের ধাক্কা সত্ত্বেও দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬০ দশমিক ৬০ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়েছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর ৭ম পর্যায়ের জরিপে এমন ফলাফল উঠে আসে।
গতকাল সোমবার এক ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি জানান, এর আগে ২০২১ সালে মার্চের ফলাফলে ব্যবসার সর্বোচ্চ ৫৭ দশমিক ৪০ শতাংশ পুনরুদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।
ওয়েবিনারে জানানো হয়, ৭ম পর্যায়ের জরিপে ১৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার জোরদার হয়েছে। যদিও ৬ষ্ঠ পর্যায়ে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল ২১ শতাংশ। অপরদিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার মোটামুটি বলে মনে করে ৪৪ শতাংশ, যেটি আগের পর্যায়ে ছিল ৫২ শতাংশ।
জরিপকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৩ শতাংশ প্রণোদনার ঋণ পেয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪০ শতাংশ জানিয়েছে প্যাকেজ যথেষ্ট নয়। ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প সুদে কার্যকরী পুঁজির ঋণ, রপ্তানিকারকদের জন্য শিপমেন্ট-পূর্ববর্তী পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং অসহায় শ্রমিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো সহায়তা দরকার।
করোনা মহামারীর সময়ে বাংলাদেশের শিল্প ও সেবা খাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে সানেম ধারাবাহিকভাবে তিন মাস পরপর এ জরিপ করছে। এ পর্যায়ের জরিপে বাংলাদেশের সার্বিক ব্যবসা পরিস্থিতির ওপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং ওমিক্রন ঢেউয়ের প্রভাব নিয়েও আলোকপাত করা হয়।
দেশের ৮টি বিভাগের ৩৮টি জেলার মোট ৫০২টি ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ করা হয়। উৎপাদন খাতের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ প্রস্তুতকারক, হালকা প্রকৌশল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলো জরিপে অংশ নেয়। সেবা খাতের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, আইসিটি ও টেলিকমিউনিকেশন, আর্থিক খাত ও রিয়েল এস্টেট খাত জরিপের অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত ৩-২৪ জানুয়ারি এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।
জরিপের উত্তরের ওপর ভিত্তি করে প্রেজেন্ট বিজনেস স্ট্যাটাস ইনডেক্স বা পিবিএসআই (বার্ষিক), প্রেজেন্ট বিজনেস স্ট্যাটাস ইনডেক্স বা পিবিএসআই (ত্রৈমাসিক) এবং বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স (পরবর্তী তিন মাস) এই তিনটি সূচকের মাধ্যমে তাদের গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করে সানেম।
এছাড়াও, জরিপে পাওয়া তথ্যাবলি থেকে ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে ‘এনাবলিং বিজনেস এনভায়রনমেন্ট ইনডেক্স (ইবিআই)’ তৈরি করা হয়। সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, পরিবহন, দক্ষ শ্রমশক্তি, সম্পত্তি নিবন্ধন, অর্থায়নের সুবিধা, কর ব্যবস্থা, লজিস্টিক্স, দুর্নীতি, সরকারি নীতি সহায়তা এবং করোনাভাইরাস মহামারীর ব্যবস্থাপনা।
গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে সার্বিকভাবে ইবিআই সূচকে কিছুটা পতন হলেও জরিপে দেখা যায় এই সূচকে বর্তমানে উন্নতি হয়েছে এবং ৭ম জরিপে এই সূচকে সর্বোচ্চ মান দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ, ব্যবসার পরিবেশে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উন্নতি হয়েছে।
তবে, ইবিআই সূচকের কিছু কিছু উপাদান যেমন কর, দুর্নীতি, দক্ষ শ্রমশক্তি, যানবাহনের মান, বাণিজ্য কাঠামো এবং কভিড ব্যবস্থাপনায় কিছু অবনতি দেখা গিয়েছে। এছাড়া চামড়া, পাইকারি এবং আবাসন খাতে ইবিআইয়ে কিছু অবনতি হয়েছে।
জরিপকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭১ শতাংশ জানিয়েছেÑ ওমিক্রন সংক্রমণের প্রভাবে তাদের রপ্তানি বা বিক্রি কমেছে। অন্যদিকে, ৭৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে তাদের অতিরিক্ত স্বাস্থ্য-সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে এবং খরচও বেড়েছে। ৮২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে ওমিক্রনের জন্য সার্বিকভাবে পুঁজি ও শ্রমের খরচ বেড়েছে।
ওমিক্রণের কারণে রপ্তানি কমার ঝুঁকি বেড়েছে বলে জানিয়েছে ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে ওমিক্রনের জন্য অতিরিক্ত স্বাস্থ্য-সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং সে সংক্রান্ত খরচ বাড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। ৯১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে পুঁজি ও শ্রমের খরচ বাড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
জরিপে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবটিও উঠে এসেছে। ৯৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে যানবাহনের খরচ বেড়েছে এবং ৭৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে তাদের উৎপাদন শক্তির খরচ বেড়েছে।
আগের পর্যায়ের জরিপের মতোই, এ পর্যায়ের জরিপেও দেখা গেছে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, বন্ধক, দীর্ঘসূত্রতা, ব্যাংক-মক্কেল সম্পর্ক ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হয়।
কভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য ওয়েবিনারে খাতভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন, টিকা কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং সংক্রমণ রোধে গৃহীত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে আরও বাস্তববাদী চিন্তা করার কথা বলা হয়।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান প্রণোদনা প্যাকেজের দ্রুত বিতরণ এবং প্রণোদনা প্যাকেজ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর জোর দেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন প্রাপ্তিতে এবং জোগান প্রবাহে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানের কথাও বলেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক গৃহীত ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের প্রচার এবং ব্যাপক বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন।
সেলিম রায়হান জ্বালানি তেল আমদানির ওপর কর কমানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যের জন্য নীতিনির্ধারকদের একটি কৌশলগত, গতিশীল এবং ভবিষ্যৎমুখী নীতি গ্রহণ করা দরকার। রেমিট্যান্সের নিম্নমুখী ধারা লক্ষ করে ওয়েবিনারে বলা হয়, রেমিট্যান্সের ধারার একটি মূল্যায়ন করা দরকার এবং রেমিট্যান্সের জন্য নির্ধারিত সরকারি প্রণোদনা ৩ শতাংশ বাড়ানো দরকার। গবেষণায়, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মুদ্রা নীতি ও ব্যয় নীতির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হয়। এছাড়াও, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া জোরদারকরণে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক কর্মপন্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে সেলিম রায়হান বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি একটি উদ্বেগজনক ইস্যু। অর্থায়ন ও অন্যান্য সুবিধাপ্রাপ্তিতে তিনি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রভাব নিয়েও আলোচনা করেন।
জরিপে দেখা যায়, পিবিএসআই (বার্ষিক) সূচকের মান ৫৬.৭৯ থেকে ৬০-এ উন্নীত হয়েছে। একইভাবে পিবিএসআই (ত্রৈমাসিক)-এও উন্নতি দেখা গেছে।
আগের বছরের তুলনায়, অন্য খাতগুলোর চেয়ে তৈরি পোশাক খাত, টেক্সটাইল, রেস্টুরেন্ট, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওষুধ শিল্পের ব্যবসায় পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে।
