পরিসংখ্যান মতে বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ষোল কোটি বা সতের কোটির কাছাকাছি, যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই সংখ্যা আরও বেশি। এই জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হচ্ছে যুব জনগোষ্ঠী যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। সংখ্যার দিক দিয়ে তা প্রায় পাঁচ কোটি বা তারও বেশি। বলা হয় এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বিচারে জনমিতির একধরনের সুফল ভোগ করছে বা অনুকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্র্তৃক ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০-২৪ বছর সময়কাল একজন মানুষের মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালে এই বয়সের জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫৬.৬ মিলিয়ন যা মোট জনগোষ্ঠীর ২৯.৭ শতাংশ। এই প্রতিবেদন মতে, ২০২০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও ১০ মিলিয়ন বাড়ার কথা।
বাংলাদেশের মানুষ এদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই দেশের মানুষ উদ্যমী ও পরিশ্রমী। তারা বিভিন্ন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে কীভাবে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হয় তা নিয়ে সচেষ্ট এবং সে নিয়ে পরিশ্রমের যেন শেষ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের এই পরিশ্রম কায়িক শ্রম কেন্দ্রিক। ঢাকা শহরের একজন রিকশাচালক কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছ্যন্দের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রচন্ড গরমে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে। একজন গৃহশ্রমিকও তাই। কিন্তু এখানকার সময় হচ্ছে প্রযুক্তি ও গুণগত মানে উৎকর্ষ অর্জনের সময়। যেখানে পরিশ্রমের পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখা ছাড়া বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কোনোটাই সম্ভব না। তাই সামনের সময়ে আমাদের যুব সমাজ নিজেকে আরও কীভাবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবে এবং দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে বিশ্বের শ্রমবাজারে হাজির হবে তা নিয়েই ভাবনার সময় এখন। শর্টকাট পদ্ধতিতে হয়তো কেউ কেউ সাফল্য অর্জন করতে পারে কিন্তু সাফল্যের কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা টিকেও থাকে না। সাফল্যের জন্য চাই সঠিক দিকনির্দেশনা ও অধ্যবসায়। এই সত্যটি যেমন তরুণদের বুঝতে হবে একইভাবে সরকারি ও বেসরকারিভাবে তরুণ ও যুবদের মধ্যে এই চেতনা জাগ্রত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যুবদের দক্ষতা উন্নয়ন, বিশেষ করে যুবনারীদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার সময় প্রায় ফুরিয়ে আসছে। কারণ বর্তমানে বাংলাদেশ যুব জনগোষ্ঠী যে সংখ্যাধিক্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বলছে ২০২৬-এর পরে যুবদের এই সংখ্যাধিক্য ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।
অনেক সময় আমরা দেখি যুবরা সম্মুখ সারির কর্মী হিসেবে বিভিন্ন দুর্যোগ বা দুর্বিপাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবার আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা যুবদের তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করে। তাদের প্ররোচনায় যুবরা বিপথগামী হয়ে যেমন নিজেদের অমিত সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটায় একই সঙ্গে সমাজ ও দেশ হারায় যুবশক্তির মাধ্যমে কাক্সিক্ষত অর্জনের সুযোগ। তাই যুবদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথমে নিজেদেরই ভাবতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায় থেকে যুবদের উন্নয়ন ও তাদের মানস গঠনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি যুবদের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। আজ যে যুবকের বয়স ১৮ বছর, ২০৪১ সালে তার বয়স হবে ৩৮ বছর। জাতিকে দেওয়ার জন্য দক্ষতা ও উদ্যমে ভরপুর। এই সময়টাকেই যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে দেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে এবং আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
এতকিছু পরও যুবদের নিয়ে বর্তমান চিত্র খুব একটা আশাপ্রদ না। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পানায় ২০১৬-১৭-এর শ্রম জরিপের আলোকে বলা হয়েছে এখনো ২.১ মিলিয়ন যুবজনগোষ্ঠী বেকার। প্রায় ১২.৩ মিলিয়ন যুব জনগোষ্ঠী আছে যারা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অথবা কর্মসংস্থানের কোথাও নেই। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ যুব নারী। এই যদি হয় আমাদের যুবদের বর্তমান অবস্থা তাহলে যুবদের আমরা মানবসম্পদে পরিণত করতে পারছি কই?
যুবদের এই কর্মশক্তিকে আমাদের যথাযথভাবে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এজন্য এখনই একটি যথাযথ জরিপ পরিচালনা করে সেক্টরভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এগোতে হবে। আমরা আর যুবকদের হোক সে নারী বা পুরুষ, শুধুমাত্র কায়িক শ্রমে জীবন অতিবাহিত করতে দেখতে চাই না। কায়িক শ্রমের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের মিশেলের জন্য আমাদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে।
আমাদের দেশের যুবদের মধ্যে একটা অংশ রয়েছে যারা খুবই অবহেলিত, যারা নিজেদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক প্রতিকূলতায় তারা উন্নয়নের মূলস্রোত থেকে হারিয়ে যায়। এদের মধ্যে একটি বড় অংশ গ্রামীণ জনপদ বা বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করে। যারা দরিদ্র, ভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ, যাদের কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা আছে। এছাড়া যুবনারীদের একটা বড় অংশও বাল্যবিবাহের প্রকোপে অকালে ঝরে পড়ে। আবার শহর অঞ্চলের যুবরা জীবিকার তাড়নায় অকালেই বিভিন্ন শ্রম খাতে যুক্ত হয়ে পড়ে।
আজকের যুবকদের শিক্ষা ও সৃজনশীলতার বিকাশ, যুবশক্তিকে প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই আমরা আমাদের দেশকে নিয়ে যে প্রত্যাশা করছি, যে স্বপ্ন দেখছি তা হয়তো একদিন সফল হবে। আর এতে আমরা শুধু আর্থিকভাবেই সামর্থ্যবান জাতি হব না। এই যুবদের মধ্য থেকে কেউ কেউ হবে বিখ্যাত সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী, লেখক, দার্শনিক বা কবি। যারা হয়তো শুধু দেশ ও জাতিই নয় পুরো বিশ্বকেই সমৃদ্ধ করবে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী