বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে দুটি জল্পনা

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০:১৯ পিএম

কী হলে কী হবে অতি বড় নির্বাচন বিশেষজ্ঞের পক্ষেও ভবিষ্যদ্বাণী করা শুধু কঠিন নয়, এক কথায় অসম্ভব।

তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে দুটি সম্ভাবনা নিয়ে প্রবল জল্পনা চলছে। ১. বিপুল ভোটে জিতে বিজেপি এ রাজ্যের মসনদে বসতে চলেছে। ২. কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ত্রিশঙ্কু বিধানসভায় এমএলএ কেনাবেচার মধ্য দিয়ে কোনো একটি দল ক্ষমতায় আসবে। সে ক্ষেত্রেও নিঃসন্দেহে বিজেপির পাল্লা ভারী। টাকার অঙ্কে বিজেপির সঙ্গে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা শুধু ভারতে কেন, দুনিয়ায়ও কোনো দলের আছে কি না সন্দেহ ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে বিপুলসংখ্যক সিট জিতে বিজেপি এ রাজ্যের মসনদে বসলেও বসতে পারে তার পেছনে কি পুরোপুরি জনসমর্থন না অন্য কোনো অঙ্ক থাকলেও থাকতে পারে? অবশ্যই দ্বিতীয় আশঙ্কাটাই ঠিক। বিজেপি জেতার জন্য যেকোনো উপায় বেছে নিতে পারে। যত দিন যাচ্ছে ততই ভারতীয় গণতন্ত্রের কঙ্কালসার চেহারাটা খোলাখুলিভাবে সামনে আসছে। দেশের সংবিধান রক্ষার যে কটি প্রতিষ্ঠান আছে তার সব কটিকে নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠে গেছে। আদালত, সিবিআই, ইডি, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা বা এনআইএ, পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, প্রচারমাধ্যম, এমনকি ইভিএম মেশিন সব কটিই কতটা নিরপেক্ষ তা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে। দিনকে দিন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবণতা হচ্ছে এ দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পুরোপুরি অতি কেন্দ্রীয়করণের দিকে নিয়ে যাওয়া। এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে যে দুই ইঞ্জিনের পরিবর্তে এক ইঞ্জিন সরকারের স্লোগান দেওয়া হয়েছে তার পেছনেও কিন্তু ওই অতি কেন্দ্রীকরণ নীতির ছায়া স্পষ্ট। এ হচ্ছে এক দল এক নেতা এক পতাকা এক জাতি বিজেপির আসল মস্তিষ্ক আরএসএসের দীর্ঘদিনের দাবি। এই ফ্যাসিবাদী ইচ্ছে সংঘ পরিবারের মধ্যে জন্মেছিল হিটলার ভক্তির মধ্য দিয়ে। অনেক দিন বাদে পায়ের তলার জমি কিছুটা শক্ত হওয়ার পর বিজেপি এখন তাদের সাবেক স্বৈরতান্ত্রিক নীতি প্রয়োগে বিপুল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

ইভিএম কারচুপি বিজেপির কাছে কোনো নতুন বিষয় নয়। ফলে একটা কারচুপির আশঙ্কা থাকছেই। এ ছাড়া আর একটা বিষয় ভাবাচ্ছে। বিজেপি নেতাদের শরীরের ভাষা দেখে মনে হচ্ছে যেনতেন প্রকারে এ রাজ্য দখল করতে বিজেপি মরিয়া। আসলে উত্তর ভারতে ও দক্ষিণ ভারতেও প্রচুর টাকা ছড়িয়েও বিজেপির হাল ভালো না। আমাদের মিডিয়ার একটা বড় অংশ যেভাবে বিজেপিকে বাঘ হিসেবে দেখায় আসলে সে যে নিতান্তই কাগুজে বাঘ এটা মহারাষ্ট্র ছত্তিশগড় দিল্লি পাঞ্জাব ও হরিয়ানায়ও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হরিয়ানায় বিজেপি ক্ষমতায়। তবু তাদের নেতা-মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে মিটিং-মিছিল করতে পারছে না। বিজেপির গড় গুজরাটেও পুরনো একাধিপত্য আর নেই। উত্তর প্রদেশের রমরমাও গেছে। ফলে অক্সিজেন পেতে বদ্ধপরিকর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে বেছে নিয়েছে। এখানে একে তো মমতা ব্যানার্জির রাজনীতি বিভাজনের অনুকূলে হাওয়া তৈরি করতে সহায়তা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, অস্বীকার করে লাভ নেই উচ্চবর্গের হিন্দু বাঙালির বড় অংশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের ওপরে ঘৃণা তা বুঝতে পেরে সংঘ পরিবারের তাত্ত্বিকরা সত্য অর্ধসত্য পুরোমিথ্যে বলে বলে নিজেদের অনুকূলে জমি নির্মাণ করে চলেছেন অনেক দিন ধরে একটু একটু করে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা পেলে বাংলাদেশকেও চাপে রাখতে বিজেপির সুবিধা হবে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ ছাড়া অন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক নেই।

বৃহৎ বঙ্গ পরিকল্পনাও কিন্তু আরএসএসের দীর্ঘদিনের। ফলে মাথায় রাখবেন, বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গ দখলে নানা ধরনের ছক কষছে। তাদের লক্ষ্য স্রেফ একটা রাজ্যের ক্ষমতা দখল নয়, বাংলাদেশের রাজনীতি অর্থনীতিতেও মাতব্বর হওয়া। যে ভাষায় একটা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অন্য স্বাধীন-সার্বভৌম দেশকে আক্রমণ করছে তা শুধু দৃষ্টিকটু নয়, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘন।

বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পেতে পারে। আমি সীমান্ত লাগোয়া বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘুরেছি। হাড়োয়া, দেগঙ্গা, বসিরহাট, হাবড়া ও অশোকনগর। সর্বত্রই শহর লাগোয়া এলাকায় বিজেপি টাকা ঢালছে অকাতরে। তাতে কিছু প্রভাব পড়লেও সামগ্রিকভাবে গ্রামের ছবি কিন্তু অত বিজেপিমুখী নয়। অশোকনগরের মতো উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকার গ্রামেও কিন্তু বামপন্থিদের সভায় ভিড় চমকে দিচ্ছে। বামদের ভোটের ফল যাই হোক, তারা পায়ের তলার মাটি যে অনেকটাই ফিরে পেয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তার দুটো কারণ। ১. প্রার্থী বাছাই। তরুণদের সামনে নিয়ে আসা। ২. আব্বাস সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের অন্তত দক্ষিণ ও উত্তর চব্বিশ পরগনার একাধিক কেন্দ্রে ঝড় তোলা প্রচার। ঠিক এ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে, আপনি স্বীকার করুন বা নাই করুন গ্ল্যামার বয় একজনই আব্বাস সিদ্দিকী। ওর মতো বক্তা একজনও নেই। কাছাকাছি থাকবে বামদের দুই তরুণ নন্দীগ্রামের সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জি ও বালির দীপ্সিতা ধর।

প্রশ্ন উঠবেই তাহলে তৃণমূল কী করবে! তৃণমূল যেটুকু যা লড়ছে তা মমতা ব্যানার্জির ব্যক্তি ক্যারিশমা সম্বল করে। সংগঠনের অবস্থা খুব খারাপ। আসন পেলেও মনে হয় না তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে। বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি গেলেই তৃণমূলের বিজয়ী বিধায়কদের অনেকেই বিজেপি শিবিরে লাইন লাগাবে।

সব মিলিয়ে পঞ্চম দফা ইলেকশনের পরও পরিস্থিতি ঘোলাটে। লড়াইটা এবার স্রেফ ভোটের আসন পাওয়া নয়। বলতে পারেন চরম দক্ষিণপন্থার সঙ্গে গণতন্ত্রের লড়াই। ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির। এবারের ভোট বাংলাদেশের পক্ষেও তাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত