নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলা একের পর এক নতুন ট্র্যাজেডির জন্ম হচ্ছে। গত দশ বছরের ব্যবধানে পুরান ঢাকায় বিভিন্ন অগ্নিকান্ডে মারা গেছেন ১৯৯ জন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকাটিকে মৃত্যুকূপ বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। মৃত্যুসংখ্যা ও ভয়বহতায় কোনোটির চেয়ে কোনোটি কম নয়। ২০১০-এ নিমতলী ট্রাজেডি থেকে ২০১৯-এর চুড়িহাট্টা ও সবশেষ আরমানিটোলার অগ্নিকান্ড একইসূত্রে গাঁথা। এর বাইরেও বিভিন্ন সময়ে ছোট-ছোট অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনার পেছনেই অভিযোগের তীর রাসায়নিক গুদামের দিকে।
নিমতলীর ঘটনার পরে তদন্ত শেষে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এমন ঘটনা আর যাতে না ঘটে, সে জন্য রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে ফেলা হবে। সরিয়ে ফেলা যে হয়নি, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল চকবাজারের চুড়িহাট্টার কাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে আগুন লাগার পরে। চুড়িহাট্টার ঘটনার পরে আবারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, বলা হয়েছিল রাসায়নিকের গুদাম আর কারও মৃত্যুর কারণ হবে না। সবই যে কথার ফুলঝুরি ছিল, আরমানিটোলার অগ্নিকান্ডের ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ঘটনার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা সামনে আসার পর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক ব্যবসা রাসায়নিক পল্লীতে নিয়ে যাওয়া হবে। তার আগে দ্রুত টঙ্গী ও শ্যামপুরে দুটি অস্থায়ী গুদাম করা হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, রাসায়নিক পল্লীর মাঠপর্যায়ের কাজই শুরু হয়নি, এমনকি অস্থায়ী গুদামের নির্মাণকাজও শেষ হয়নি। বিশে^র ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি ঢাকা। এই ঢাকাকে নিয়ে কার্যত কোনো সমন্বিত কর্মসূচি দৃশ্যমান হচ্ছে না। রাজধানীর নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রণয়নের জন্য গৃহীত প্রকল্পে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি চেহারা ও জরাজীর্ণ অবস্থা বদলে দিতে ভূমি পুনঃউন্নয়নের মাধ্যমে খণ্ড খণ্ড প্লটগুলোকে একত্র করে ব্লকভিত্তিক আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার যে সুপারিশ করা হয়েছিল, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। রাজধানী ঢাকাকে সামগ্রিকভাবে একটি পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নগর পরিকল্পনায় পুরান ঢাকাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এ এলাকার ভবনগুলোর বেশির ভাগই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব ভবনে বাস করছে কয়েক লাখ মানুষ। দু-একটি প্রধান সড়ক ছাড়া পুরান ঢাকার কোনো সড়ক ১০ ফুটের বেশি প্রশস্ত নয়। এসব সরু রাস্তার পাশেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য বৈধ ও অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি, আড়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরু অলিগলি পেরিয়ে ৭০ শতাংশ বাড়িঘর পর্যন্ত পৌঁছায় না অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। পুরান ঢাকায় ভয়াবহ ৩টি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে আশঙ্কার হয়ে সামনে এসেছে, এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়িই একেকটি গুদাম। আর এসব অগ্নিকান্ডের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছেএগুলো একেকটি রাসায়নিক বোমা! একইবাড়িতে নিচতলায় গুদাম ও ওপরের তলায় মানুষ বসবাস করে আসছে। পান থেকে চুন খসলেই সমূহ বিপদ। অথচ, একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার আওতায় আনা গেলে পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, রূপলাল হাউস, আর্মেনীয় গির্জা, হোসেনি দালানসহ নানা ঐতিহাসিক স্থাপনাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে ও এর সঙ্গে সমন্বয় করে পুরান ঢাকাকে ঢেলে সাজানো যেত। অথচ এ নিয়ে দায়িত্বশীলদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এভাবেই আগুনে পুড়ে মরাই যেন নিয়তি!
প্রতিটি অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটি তাদের সুপারিশ দিলেও পুরান ঢাকা থেকে সরেনি অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম। যখনই কোনো রাসায়নিকের গুদামে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তখনই সচল করা হয় ওই এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানাগুলো সরানোর ফাইল। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও শিল্প মন্ত্রণালয়, পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠকের খবর প্রকাশ হয়। প্রায় প্রতিটি বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে কারাখানা সরিয়ে নেওয়া হবে। এমনকি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয় ব্যবসায়ীদের। কিন্তু কিছুদিনই পরই ওইসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগে ভাটা পড়ে। যেন আগুনের লেলিহান শিখার নিচেই চাপা পড়ে সিদ্ধান্তের ফাইলগুলো।
ফলে এত বছরেও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের সব গুদাম ও কারখানা সরানোর কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে রাসায়নিক গুদাম। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অবৈধ গুদামের সংখ্যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজারে। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলার পরে আর কোনো নাম যুক্ত হোক- সেটা প্রত্যাশিত নয়। সব বাধা পেরিয়ে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম কবে সরবেএটাই এখন জিজ্ঞাসা।
