হু হু করে বাড়ছে কভিডে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। গড়ে প্রায় ২০০ জন প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রতিদিন গণমাধ্যমে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। হ্যাঁ, মৃত্যু এখন একটা সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। খবরের কাগজের প্রথম পাতায় করোনায় আক্রান্ত, সুস্থ হয়ে ওঠা ও মৃত্যু-সংক্রান্ত খবর শেষে সংখ্যাতেই পর্যবসিত হয়। কথায় বলে, যার যায় তারই যায়। হচ্ছেও তাই। আমরা একটু আহা-উঁহু করছি। কিন্তু ব্যাপক মাত্রায় সতর্ক হচ্ছি না। সতর্ক করছি না। যে যার নিজের পরিমণ্ডলে ডুবে থাকছি। সংখ্যা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে অনুভূতির অস্তিত্বকে নিজেদের অজান্তেই অস্বীকার করে ফেলছি। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি করে পরিবার। তাদের কথা ঢাকা পড়ে যায়। অনেক সময়ই ভেসে যায় সংসার।
আমরা প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকি মৃত্যুর সংখ্যাটা যেন হ্রাস পায়। মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস পাওয়া আমাদের উল্লসিত করে। আনন্দের প্রধান কারণ ওই সংখ্যায় আমি বা আমার খুব কাছের জন নেই। সংখ্যাটি যখন শূন্য হবে, আনন্দে তখন আমরা ফেটে পড়ব। মুক্তি পাব মানসিক লকডাউনের বেড়াজাল থেকে। ভুলে যাব কে বা কারা মারা গিয়েছেন। ভুলে যাব তাদের কথা, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। করোনা হয়তো চলে যাবে এক দিন। কিন্তু মানুষের কী হবে? মানবিকতার কী হবে? আমরা যারা বাঁচলাম, যারা বাঁচব, তারা যেন জানি যে, একটি মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়, আমরা মানুষকে হারিয়েছি। অসংখ্য। তারা নামহীন গোত্রহীন নন। তারাও কোনো পরিবারের সদস্য। সমাজের সদস্য। এ দেশের মানুষ। গণকবরে শায়িত হলেন কারা? তারা আমাদের স্বজন, এ দেশের মানুষ, কোনো না কোনো পরিবারের সদস্য।
করোনা আমাদের মানবিক অনুভূতিকে ভোঁতা করে দিচ্ছে। আমরা হারিয়ে ফেলছি সহমর্মিতা বোধ। ওদিকে সরকারও যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। কখনো অর্ধসত্য, কখনো নির্জলা মিথ্যা মোটামুটি এই মন্ত্রেই কভিড যুদ্ধ লড়ছে আমাদের প্রশাসন। টিকা দেওয়া শুরু হওয়ার পর প্রায় ছয় মাস কেটে গেল। কত টিকার জোগান আছে, অদূর ভবিষ্যতে কত টিকা মিলবে, বর্তমান হারে চললে দেশের সব নাগরিকের টিকাকরণে মোট কত সময় লাগবে এমন বহু প্রশ্নের যথাযথ উত্তর মিলছে না। সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যানে প্রভূত গরমিল। বিশেষজ্ঞদের একাংশের অনুমান, বর্তমান হারে টিকাকরণ চললে সারা দেশের মানুষকে টিকা দিতে আরও অন্তত সাড়ে চার বছর সময় লাগবে। কোন দেশ থেকে কবে নাগাদ আর কত টিকা আসবে, কবে আসবে এখনো সে বিষয়ে প্রভূত ধোঁয়াশা। কভিড-নিরাপত্তা বা টিকাকরণ দেশের কর্তাব্যক্তিদের কাছে এখনো এক নম্বর অগ্রাধিকার কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। তা না হলে কেবল একটি দেশের ওপর টিকার জন্য নির্ভর করে প্রায় চার মাস টিকার জন্য হা-পিত্যেশ করতে হবে কেন? ভাগ্যিস কোভ্যাক্সের আওতায় গরিব দেশগুলোর জন্য বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তা না হলে তো আমাদের আরও ভুগতে হতো। টিকা নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না থাকার কারণেই কভিড মোকাবিলায় আমরা পেছনের সারিতে রয়ে গেছি।
আমাদের দেশে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে, না তৃতীয় ঢেউ, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট গবেষণা নেই। যদি দ্বিতীয় ঢেউ চলে, তাহলে তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা প্রকট হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় ঢেউকে কতখানি সামলানো যাবে, তা বহুলাংশে নির্ভর করছে রাষ্ট্রচালকদের সদিচ্ছার ওপর। তারা যদি মুখে জগৎ মারবার এবং সংকীর্ণ রাজনীতির চশমায় দুনিয়া দেখার প্রবণতা ত্যাগ করতে পারেন, তবে আশা আছে। প্রথমেই নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। টিকার জোগান বাড়ানোর জন্য যা প্রয়োজন, তাতে দ্বিধা করলে চলবে না। এবং, টিকা বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। দ্বিতীয় প্রবাহটি এমন মারাত্মক হওয়ার পেছনে দেশের মানুষের নিয়ম না মানার একটা বড় ভূমিকা ছিল। সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি কোনো মতেই চলবে না। অতীত অভিজ্ঞতাকে নির্দেশক মানলে এতখানি আশাবাদী হতে ভয় করে। কিন্তু এ মুহূর্তে এই আশাটুকুই সম্বল।
তবে, দায়িত্ব শুধু সরকারেরই নয়। সাধারণ মানুষেরও। গত দেড় বছরে অসংখ্যবার বলা কথাটি আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে এই মহামারীকে রুখবার অন্য কোনো উপায় নেই। এখনো আমাদের দেশের মানুষ ঠিকমতো মাস্ক পরেন না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন না। শহর-শহরতলিতে মানুষ কিছুটা নিয়ম মানলেও, গ্রামগঞ্জে নিয়ম মানার বালাই নেই। গলি ও গ্রামের দোকান-বাজারে ভিড় উপচে পড়ছে। দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে বাধ্য হলে অবসাদ জন্মায়, সত্য। সামান্য ফাঁক পেলেই বিধিনিষেধ ভুলে পথে নামতে ইচ্ছা করে, তাও সত্য। কিন্তু আমাদের বিপদ মোটেই কাটেনি প্রতিদিনের আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ। এ অবস্থায় সুরক্ষাবিধি ভুললে পরবর্তী বিপদের মাত্রা আরও বাড়বে। অপ্রয়োজনে বাড়ির বাইরে না যাওয়া, সামাজিক দূরত্ববিধি বজায় রাখা, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা এবং অতি অবশ্যই মাস্ক পরা এই কয়েকটি সাধারণ কাজ যদি বিনা গাফিলতিতে করা যায়, একমাত্র তাহলেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় ঢেউ থেকে সুরক্ষা মিলবে। সরকার নিজের কাজ করবে এবং নাগরিক নিজের কভিডের বিরুদ্ধে এই দ্বিমুখী যুদ্ধই পরিত্রাণের একমাত্র পথ।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবনযাপন করতে পারেন না ক্ষুধার জ্বালায় জর্জরিত অতিদরিদ্র মানুষ। এই মানুষগুলোর জন্য আমাদের সবার সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। উপযুক্ত নীতি ও পরিকল্পনার অভাবে যারা সব লজ্জা জলাঞ্জলি দিয়ে হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে, তাদের হাতে খাদ্য বা নগদ টাকা পৌঁছে দিতে হবে। আর দরকার দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা। মনে রাখতে হবে, সবার টিকাকরণ একটা প্রধান কাজ, কিন্তু একমাত্র কাজ নয়। করোনা নিয়ে কিন্তু এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। টিকা নেওয়ার পর আর কি মৃত্যুর আশঙ্কা থাকবে না? টিকা কি একবার নেওয়াই যথেষ্ট? নাকি বছর বছর নিতে হবে? কবে থেকে মাস্ক ছাড়া জীবনযাপন সম্ভব হবে? নাবালকদের ভ্যাকসিন কবে দেওয়া সম্ভব হবে? এই কভিডকালে বিনা পরীক্ষায় পাস করা ছাত্রছাত্রীদের ক্যারিয়ারে আগামী দিনে কী প্রভাব পড়তে পারে? কর্মসংস্থান অথবা উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে কীভাবে মূল্যায়ন হবে তাদের? সাধারণ মানুষরা কীভাবে আবার পেশাগতভাবে ঘুরে দাঁড়াবে? রাষ্ট্র আমাদের কী সাহায্য করবে? আমরা জানি যে, একটি প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর নেই! তাই শুধু বিনম্র আবেদন, সবার টিকাকরণের কর্মসূচিটা সম্পূর্ণ করুন! অন্তত ওটা তো রাষ্ট্রের হাতে! ১৬ কোটি মানুষের ডাবল ডোজ ভ্যাকসিন কবে শেষ হবে? সব তর্ককে ছাপিয়ে একমাত্র আশার আলো ওটাই! কবে পৌঁছাব আমরা ওই স্বস্তির গন্তব্যে?
লেখক কলামনিস্ট ও লেখক