ভোগ-প্রবণতা ত্যাগেই সুখ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:১৮ এএম

যারা আল্লাহর সম্মুখীন হওয়াকে মিথ্যা বলেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি অকস্মাৎ যখন তাদের কাছে কেয়ামত উপস্থিত হবে তখন তারা বলবে, হায় আফসোস! এ ব্যাপারে আমরা কতই না ত্রুটি করেছি। তারা তাদের পিঠে নিজেদের পাপ বহন করবে। দেখো, তারা যা বহন করবে, তা অতি নিকৃষ্ট! পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন করো না?’ -সুরা আনআম : ৩১-৩২

কোরআনে কারিমের উল্লিখিত দুই আয়াতের প্রথম আয়াতে পুনরুত্থানে অবিশ্বাসীদের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে আলোচনা করে দ্বিতীয় আয়াতে দুনিয়ার জীবন ও আখিরাতের জীবনের চূড়ান্ত ও সার্বিক মূল্যায়ন করা হয়েছে। সুরা আনআমের ২৯ নম্বর আয়াতেও এ বিষয়ে বলা হয়েছে,  ‘তারা বলে, আমাদের এ পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন, আমাদের পুনরায় জীবিত করা হবে না।’

বর্তমানে এ ধরনের মানসিকতার লোক পৃথিবীতে বাড়ছে। দুনিয়ার জীবনের ভোগ-বিলাস, আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদনকেই এক শ্রেণির মানুষ মুখ্য ও জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য জ্ঞান করে। জীবনকে ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য তারা মদ, নারী ও নেশায় মগ্ন। পরকালের শাস্তির ভয় না থাকায় তারা দুনিয়াতে বল্গাহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত। আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। আল্লাহর অবাধ্যতায় যারপরনাই ধৃষ্টতা দেখায়। মৃত্যুকে তারা জীবনের শেষ পরিণতি মনে করে। তারা মনে করে, মরে যাওয়া মানেই সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়া। কিন্তু শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ কি কেবলই ভোগের জন্য এ দুনিয়ায় এসেছে? শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ভোগ করা হলে জীবজন্তুই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার কথা। কেননা, উট মানুষের চেয়ে বেশি খায়। মোরগ ও চড়–ই পাখি সর্বাধিক সহবাস করে। সিংহ ও বাঘ অনেক বেশি নৈরাজ্য ও ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে। সাপ-বিচ্ছু অন্যকে অনেক বেশি কষ্ট দেয়। কিন্তু তাদের পাপ তো ধর্তব্য নয়। যেসব মানুষ জীব-জানোয়ারের মতো পাপ করে, তারা তো পাপের বোঝা বহন করে বেড়ায়। দুই চোখ বন্ধ হলেই তা বুঝে আসবে; তখন আফসোসের শেষ থাকবে না।

উল্লিখিত দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে, ‘পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়।’ অর্থাৎ খেলাধুলা যেমন দ্রুত ও অল্প সময়ে শেষ হয়ে যায়, ঠিক তেমনি পরকালের জীবনের তুলনায় দুনিয়ার জীবন দ্রুত ফুরিয়ে যায়। খেলাধুলা যেমন চিত্তবিনোদনমূলক অন্তঃসারশূন্য, ঠিক তেমনি দুনিয়ার কাজকর্ম ক্ষণিকের সুখ ও ভোগের জন্য; এর ফলাফল শূন্য। তবে পার্থিব জীবনের পুরোটাই খারাপ নয়; পার্থিব জীবনের যে মুহূর্তগুলো, যে কাজগুলো আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও স্মরণে অতিবাহিত হয় তার সমতুল্য পৃথিবীর কোনো নিয়ামত ও সম্পদ নেই। ইসলামে দুনিয়াকে বর্জন করতে বলা হয়নি; দুনিয়ার ভালোবাসা বর্জন করতে বলা হয়েছে।

দুনিয়ায় মানুষের ভোগের বাসনার শেষ নেই। ভোগের কারণে যে সুখানুভূতি সৃষ্টি হয়, তা ক্ষণিকের। আর মানুষ এই ক্ষণিকের সুখকে স্থায়ী সুখে পরিণত করার জন্য আরও বেশি ভোগ্যপণ্য ব্যবহার করছে, অবিরাম ছুটে চলেছে। কিন্তু ভোগবাদে যে প্রকৃত সুখ নেই তা সে বুঝতে পারছে না। আসলে ভোগবাদে বিভোর কোনো ব্যক্তি কখনোই এই উপায়ে প্রকৃত ও টেকসই সুখ এবং আনন্দ খুঁজে পাবে না, এটা তার মিথ্যা ছুটে চলা।

এ কথা অস্বীকার উপায় নেই, অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও ভোগবাদী সংস্কৃতি লালন ও তা ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে পাশ্চাত্যের ধনী দেশগুলো সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। তারা নিজেদের মুনাফার জন্য গোটা বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছে। তারা নিজেদের ভোগ-বিলাস অক্ষুণœ রাখতে বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে, প্রয়োজনে যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ভোগ ও চাহিদার সীমাকে নিয়ন্ত্রণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করে যাওয়ার কোনো সদিচ্ছা পাশ্চাত্যে লক্ষ করা যাচ্ছে না।

ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনা জোরদার করছে। কারণ ভোগবাদীরা নিজের চাওয়া-পাওয়া দিয়েই পৃথিবীকে বিচার করেন। পাশ্চাত্যে ভোগবাদী যে সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাতে মানুষের মনে এক ধরনের কৃত্রিম স্বাধীনতা ও মুক্তির অনুভূতি তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার মধ্যেই রয়েছে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা এবং এখানেই কেবল একজন ব্যক্তি তার সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করতে সক্ষম। এই ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তি অন্যের প্রতি কোনো ধরনের টান, ভালোবাসা, মানবিকতা ও দায়িত্ব অনুভব করে না। দায়িত্ব এড়িয়ে জীবনযাপন করতে পারাকে বড় ধরনের সাফল্য বলে মনে করে।

এর ফলে দেখা যাচ্ছে, এক পরিবারের প্রতিটি সদস্যের আলাদা টিভি রয়েছে। প্রত্যেকের গাড়ি আলাদা। মোবাইল ও ল্যাপটপসহ সবকিছুই আলাদা। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাদী সমাজের একজন সদস্য আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করে। বেশি বেশি পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে সুখ খুঁজে বেড়ায়। বৈষয়িক সম্পদের দিক থেকে অগ্রগামী দেশগুলোর মানুষের সুখের একটা মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের ভোগ্যপণ্য ক্রয় ও ব্যবহারের সক্ষমতা। কিন্তু ভোগবাদী ব্যবস্থায় মানুষ কি সত্যিই প্রকৃত সুখী হতে পেরেছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোগবাদ মানুষের সুখ নিশ্চিত করতে পারেনি, মানুষ আগের চেয়ে বেশি সুখী হয়নি বরং মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে। ভোগবাদ ও পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত দেশগুলোর মানুষের মধ্যে অবিরাম নিজের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা ক্লাব, সিনেমা ও পিকনিকসহ নানা ধরনের আধুনিক ব্যবস্থার মধ্যে ডুবে থেকে প্রকৃতপক্ষে নিজের সত্তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াতে চায়। মানুষের মধ্যে এখন সব সময় কাজ করে না পাওয়ার আত্মগ্লানি। কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থেকে সেই আত্মগ্লানি ভুলে থাকতে চায়। মানুষ ভোগের পেছনে ছুটতে গিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, নিজেকে নিয়ে চিন্তার অবকাশটুকুও তার আর নেই। মানুষ এখন সময়ের ঘাটতি অনুভব করছে, এর কারণ হলো- সে তার চাহিদার গণ্ডিকে এতটাই বিস্তৃত করে ফেলেছে যে এখন সে ওই বিস্তৃত গণ্ডির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। 

ভোগবাদ মানবজাতিকে আত্মবিধ্বংসী পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সময়, বিশ্রাম, চিকিৎসাসহ সবকিছুরই একটি সীমা রয়েছে, কিন্তু ভোগের যে তাড়না তা সীমাহীন। বস্তুত ভোগ ও ত্যাগ দুটি বিপরীত জীবন-দর্শন। ভোগের দর্শন সেখানে ত্যাগকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ত্যাগের মধ্যেও যে সুখ আছে তা ভোগবাদীরা বুঝতে পারে না। এই বুঝতে না পারাটাই সব অনিষ্টের মূল।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত