ওমিক্রনের চোখ রাঙানো

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০:০৮ পিএম

অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন। শনাক্ত হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই ১২৮টি দেশ আক্রান্ত হয়েছে আর সংক্রমিত হয়েছে কোটির ওপর মানুষ। বাংলাদেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। হাসপাতালে যেখানে রোগীর সংখ্যা ছিল দুইশ থেকে আড়াইশ, সেখানে এখন রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে ১৭০ শতাংশ। প্রায় তিন মাস ধরে শনাক্তের হার তিন শতাংশের কম থাকলেও এখন সেটি প্রায় ১৪ শতাংশ।

ধারণা করা হচ্ছে, আফ্রিকা থেকে এই নতুন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়েছে সারা দুনিয়ায়। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকায় টিকা না পাওয়া আর ওমিক্রনের উদ্ভব হওয়ার একটা তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক আছে। আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ড্যাটার নামের একটি দাতব্য সংস্থার হিসাবে এই নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আফ্রিকায় জনসংখ্যার ৭ শতাংশেরও কম লোককে দুটো টিকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে সারা বিশ্বে এই হার ৮০ শতাংশ।

এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মাইকেল হেড মনে করেন, কভিড ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঠেকাতে হলে টিকার এই অসাম্যের দিকে আমাদের এখন আরও বেশি নজর দিতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট বের হয়ে আসার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। কিন্তু টিকার এই অন্যায্যতা এর অন্যতম প্রধান কারণ। আমি বিশ্বাস করি আফ্রিকায় এই অসাম্যের কারণেই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের উদ্ভব ঘটেছে।’ ড. হেড বলেন, ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট সারা বিশ্বে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ‘আরও একবার সজাগ’ করেছে। টিকা-বাণিজ্য যখন রমরমা, তখন দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে ভয় দেখানোর কাজটাই করপোরেট দুনিয়ায় ঘটছে বেশি।

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে বা মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সবাইকে টিকা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কম দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশে এখন যারা করোনায় আক্রান্ত তাদের মধ্যে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ ওমিক্রন আক্রান্ত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গত ১০ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১১ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা খেল গণপরিবহনে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচলের নির্দেশনা। সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে বাসমালিকদের এক বৈঠকের পর জানানো হয় শনিবার থেকে এটি কার্যকর করা হবে। বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমরা ভাড়া বৃদ্ধি করেছিলাম জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে। এ সময় ভাড়া বৃদ্ধি আমরা যৌক্তিক মনে করছি না।’ আবার মালিক পক্ষ ভাড়া না বাড়ালে সব আসনে যাত্রী পরিবহন করতে চায়। তাদের দাবি ছিল, ভাড়া বৃদ্ধি না করলে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস চালানো সম্ভব নয়। ফলে যত সিট তত যাত্রী এই নিয়মে বাস চলবে। অন্য যেসব নির্দেশনা কার্যকর করা হবে বলে বলা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে : ১. রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাওয়া এবং আবাসিক হোটেলে থাকার জন্য অবশ্যই করোনার টিকা সনদ দেখাতে হবে; দোকান, শপিং মল ও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সব জনসমাগমস্থলে বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। না হলে আইনানুগ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। ২. অফিস-আদালতসহ ঘরের বাইরে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে ব্যত্যয় রোধে সারা দেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। ৩. ১২ বছরের ঊর্ধ্বের সব ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক নির্ধারিত তারিখের পর টিকা সনদ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। ৪. স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরসমূহে স্ক্রিনিংয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পোর্টসমূহে ক্রু-দের জাহাজের বাইরে আসার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করতে হবে। স্থলবন্দরগুলোতেও আগত ট্রাকের সঙ্গে শুধু ড্রাইভার থাকতে পারবে। কোনো সহকারী আসতে পারবেন না। বিদেশগামীদের সঙ্গে আসা দর্শনার্থীদের বিমানবন্দরে প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ৫. বিদেশ থেকে আসা যাত্রীসহ সবাইকে বাধ্যতামূলক কভিড-১৯ টিকা সনদ প্রদর্শন ও র‌্যাপিড এন্টিজেন টেস্ট করতে হবে; এসব নির্দেশনা প্রয়োগ করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে। কারণ, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিকরা তো ৪০ শতাংশের বেশি টিকা পায়নি। তারা টিকা সনদ দেখে যাত্রী পরিবহন বা খাবার সরবরাহ করবেন এবং এতে সংক্রমণ ঠেকানো যাবে এ বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয়। 

সিদ্ধান্ত যাই হোক, তা নিয়ে সমালোচনা হবেই, এ কথা বলে অনেকেই সিদ্ধান্ত পালনে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলবেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যদি সবার মতামত নেওয়া হয় তাহলে সমালোচনা হলেও তার মধ্য দিয়ে নতুন পথ বেরিয়ে আসে। ত্রুটি কমানো সম্ভব হয় এবং একেবারে নির্ভুল না হলেও ভুল অনেকখানি কমানো সম্ভব হয়। এটা করোনা নিয়ে সাম্প্রতিক সরকারি নির্দেশনার ক্ষেত্রে যথার্থভাবেই প্রযোজ্য। সিদ্ধান্তগুলো সব যেন ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। বাস্তবে পরিস্থিতি কী, প্রয়োজন কতখানি, সামর্থ্য কতটুকু আছে তার কোনো কিছুই বিবেচনা করা হয় না। যেমন ধরুন ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে বলা হলো এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলা হবে কিন্তু তার আগে কি বিবেচনা করা হয়েছে যে, গত বছরের নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছিল? সেখানে কোন কোন ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল, কোন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলা সম্ভব ছিল না, সেগুলো কি যাচাই করা হয়েছে? ফলে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে সামর্থ্য বৃদ্ধি করা এবং নতুন পরিকল্পনা করার উদ্যোগ চোখে পড়ে না। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, না মানলে আমরা কী করব এ রকম গাছাড়া মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। গত করোনাকালীন পরিবহন বন্ধ ছিল বহু দিন কিন্তু শ্রমিকরা কীভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে, বন্ধ হয়ে থাকা হোটেল এবং রেস্টুরেন্টের শ্রমিক-কর্মচারীরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করেছে, পর্যটন-সংক্রান্ত শ্রমিকরা কাজ হারিয়েছিল, তারা বেকারত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা কেমন করে মোকাবিলা করেছে, গার্মেন্টসের কাজ হারানো শ্রমিকরা কী করছে কিংবা করোনাকালে কীভাবে কাজ করেছে তা নিয়ে খুব বেশি ভাবনা তো দেখা যায় না।

করোনা মহামারীকালে লকডাউনে ঢাকা শহরের পরিবহন, দোকানপাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে চাকরি হারিয়েছে ৮৭ শতাংশ শ্রমিক। চাকরি হারানো শ্রমিকদের ৭ শতাংশ এখনো বেকার এবং তাদের আয় কমেছে ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিলসের ‘ঢাকা শহরের পরিবহন, দোকানপাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের ওপর সাম্প্রতিক লকডাউনের প্রভাব নিরূপণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিলস পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউনে (গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত) চাকরি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৭ শতাংশ শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি পরিবহন খাতের শ্রমিকদের ৯৫ শতাংশ, দোকানপাট শ্রমিকদের ৮৩ শতাংশ এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের ৮২ শতাংশ কর্মসংস্থান হারায়। লকডাউন-পরবর্তী সময় ৯৩ শতাংশ শ্রমিক চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছে, ৭ শতাংশ শ্রমিক এখনো বেকার। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো যে, যারা কাজ পেয়েছে তারা আগের চেয়ে কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে এবং কাজের চাপ আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে।

গবেষণায় আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে যে, লকডাউনের সময় এসব খাতে খণ্ডকালীন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বেড়েছিল ২১৫ শতাংশ। এ ছাড়া লকডাউনে তিনটি খাতে কার্যদিবস কমেছিল ৭৩ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি ৯২ শতাংশ কার্যদিবস কমেছে পরিবহন খাতে। লকডাউন-পরবর্তী সময় অবশ্য কাজের চাপ বেড়েছে, কার্যদিবস এবং কর্মঘণ্টা আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য হলো এই যে, কাজের তুলনায় মজুরি কমেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, লকডাউনে তিনটি খাতের শ্রমিকদের আয় গড়ে ৮১ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি পরিবহন খাতের শ্রমিকদের ৯৬ শতাংশ এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের শ্রমিকদের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। যেখানে লকডাউনের আগে মাসিক গড় আয় ছিল ১৩৫৭৮ টাকা, সেটা লকডাউন সময়ে নেমে এসেছিল ২৫২৪ টাকায় এবং লকডাউন-পরবর্তী সময়ে আয় দাঁড়িয়েছে ১২৫২৯ টাকা। অর্থাৎ লকডাউন-পরবর্তী সময়েও ৮ শতাংশ আয়ের ঘাটতি থাকছে। লকডাউনে শ্রমিকদের পরিবারে আয় এবং ব্যয়ের ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৭ শতাংশ, সর্বোচ্চ ৯৭ শতাংশ পরিবহন খাতের এবং সর্বনিম্ন ৪৬ শতাংশ রয়েছে খুচরা দোকান বিক্রেতা খাতের শ্রমিক পরিবারের। আয় কমে গেলেও ব্যয় তো কমেনি। খাদ্যপণ্য, ওষুধ, পানি, বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। তাহলে শ্রমিক পরিবার কীভাবে টিকে ছিল? ২০ শতাংশ শ্রমিক পরিবার সম্পত্তি বিক্রি, খাবার কমিয়ে দেওয়া এবং সন্তানদের কাজে পাঠানোর মাধ্যমে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেছে। এ ছাড়া ৮০ শতাংশ শ্রমিক পরিবার ধার করে এবং সঞ্চয় কমিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করছে। এর ফলাফল হবে পুষ্টিহীনতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস। যার প্রভাব শ্রমজীবীদের ওপর পড়বে দীর্ঘমেয়াদি। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটুকু তা নিরূপণ করা অর্থনীতিবিদদের কাজ। কিন্তু শ্রমজীবীদের জীবনকে যে তা প্রবল ধাক্কা দিয়েছে তা দেখা গেছে গবেষণায়। উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রমজীবীদের লকডাউন-পরবর্তী সময়ে সঞ্চয় কমেছে ৬৪ শতাংশ এবং সঞ্চয়কারীর সংখ্যা কমেছে ৫০ শতাংশ।

সরকারের অনেক ঘোষণা ও প্রচারণা সত্ত্বেও লকডাউনে উল্লিখিত তিনটি খাতের শ্রমিকদের মাত্র ১ শতাংশেরও নিচে সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পেয়েছে। সহায়তা কর্মসূচির মধ্যে ছিল কমমূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং নগদ টাকা। টিকাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও উৎপাদন ও সেবা অর্থনীতির প্রধান অংশ শ্রমিকরা অনেক বঞ্চিত। গবেষণা অনুযায়ী, ৩৬ শতাংশ শ্রমিক কভিডের টিকা নিয়েছে এবং ৬৪ শতাংশ শ্রমিক এখনো টিকার আওতার বাইরে। ফলে ওমিক্রনের চোখ রাঙানো থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি, অর্থনৈতিক আঘাত ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় রাষ্ট্রের আরও দায়িত্ব নেওয়ার বিকল্প কি কিছু আছে? 

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত