বঙ্গ-ভারতের ঔপনিবেশিক পরাধীনতার কলঙ্ক শুধু পলাশী নয়; মুর্শিদাবাদ তো বটেই, কলকাতাও। বঙ্গবিজয়ী ষড়যন্ত্রকারী ইংরেজ জয় করেও কেন মুর্শিদাবাদকে রাজধানী না-করে কলকাতাকে করল? এ কারণেই করল, তাদের প্রকল্প ছিল অর্থনীতি বা বাণিজ্য। সমুদ্র হচ্ছে নৌপথ, বাণিজ্যপথ, পণ্যবাহী পথ, নৌবাহিনীর পথ। শুধু ইংরেজ আর ইউরোপীয় বণিকশ্রেণি নয়, দেশীয় জগৎ শেঠেরাও জানত তাদের জন্মভূমি রাজস্থানের মরুপথের পরিবহন যান উটের চেয়ে উত্তম বাণিজ্যপথ সমুদ্র। এ পথেই চলে ধনের দেবী শ্রী শ্রী লক্ষ্মী এবং যুদ্ধের দেবী শ্রী শ্রী চণ্ডী এবং দুর্গা। জানল না শুধু বাউল-বৈষ্ণব ভাববাদী গায়ক-কীর্তনীয়া বাঙালিরা। কম দুঃখে কি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ করো নি।’ সেই ষোলোআনা বাঙালি হওয়ার জন্য কত না রক্ত দিল জাতি। আক্ষেপটা তো এখানেই। শুধু বাঙালি হলেই দিন চলে না, মানুষও হতে হয় যে। বাঙালিত্বের গৌরবের চেয়ে অনেক বড় মনুষ্যত্ব আর মানুষের গৌরব।
সমুদ্রপথে ইংরেজের সঙ্গী শুধু উপনিবেশবাদ আর সাম্রাজ্যবাদই হয়নি, নিজেদের প্রয়োজনে সঙ্গে এনেছে উন্নত প্রযুক্তিগত সভ্যতা, বিজ্ঞানচর্চা, আধুনিক শিক্ষা-সাহিত্য। ইউরোপীয় রেনেসাঁকে বাঙালি চিনল, জানল। অবশ্য নিজেদের মতো করে। আইন-ব্যবসা শিখতে বাঙালি এই প্রথম সমুদ্রযাত্রী হলো। মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ গেলেন আরও বড় কবি হতে। রেনেসাঁর কারিগরদের তো বিলাত গমন এবং বসবাসের ফলে প্রবল শীতে গাত্রবর্ণ কালো থেকে খানিকটা গৌরবর্ণ ধারণ করল। অন্যদিকে নগর কলকাতা সমুদ্রতীরবর্তী হওয়ায় ব্রিটিশ পুঁজি গঙ্গা নদীর তীরবর্তী স্থানে শিল্প-কারখানা তৈরিতে এগিয়ে আসে। পণ্য পরিবহনে নৌপথ বাণিজ্যের প্রধান পথ হয়ে ওঠে। শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে ওঠে কলকাতা। প্রযুক্তি শিক্ষা কেন্দ্র থেকে আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্রও গড়ে ওঠে শহরে। দর্শনচর্চার নিদর্শন তো তরুণ অধ্যাপক ডিরোজিও। ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলন, পৌত্তলিকতাবিরোধী নিরাকার একেশ্বরবাদ বা ব্রাহ্মধর্ম জীবন্ত এক ইতিহাস। কলকাতা হয়ে ওঠে বাঙালির আধুনিক মনীষা চর্চার প্রাণকেন্দ্র। বাংলা ভাষায় প্রথম কোরআনের অনুবাদক ভাই গিরীশচন্দ্র সেনের জন্মস্থান ঢাকার নরসিংদীতে হলেও অনুবাদ কার্যটির জন্য আরবি-ফারর্সি শিক্ষা নিতে তাকে যেতে হয় কলকাতায়। ঢাকা তো ছিল তার বাড়ির পাশের শহর। যশোরের মধুসূদন দত্তের বেলায়ও তাই খাটে। শুধু বিদ্যাচর্চা নয়, আধুনিক বিনোদনের যে চলচ্চিত্র তা নির্মাণ শিক্ষার জন্য যাত্রা-থিয়েটারের মঞ্চ ছেড়ে বাঙালিকে প্রথম যেতে হয় কলকাতায়, তারপর বিলাতে।
আজকের টিউশন বা প্রাইভেট পড়ানো নিয়ে এত যে হইচই, তার পেছনের ইতিহাসটা চমকপ্রদ। শিক্ষা পেশা বা শিক্ষা-বাণিজ্য ছিল প্রাচীন যুগেও। বৈদিক সাহিত্য, মহাকাব্য, পুরাণ, স্মৃতিশাস্ত্রের নিদর্শন আছে। বৈদিক পণ্ডিত-মুনি-ঋষিরা শাস্ত্র শিক্ষা দিতেন দক্ষিণার বিনিময়ে। রাজা-বাদশাহর সন্তানরা শিক্ষা পেত দেশি-বিদেশি পণ্ডিত ওস্তাদদের হাতে মণি-মুক্তা তুলে দিয়ে। মুঘল যুগে শিক্ষার বাহন ছিল আরবি-ফারসি। প্রশাসনিক ভাষাও তাই। ঔপনিবেশিক যুগে প্রশাসনিক ভাষা ইংরেজি প্রবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত ফারসি ছিল সরকারি ভাষা। লক্ষেèৗ, বেনারসের ওস্তাদরা দল বেঁধে কলকাতায় চলে আসতেন। তারা বনেদি হিন্দু এবং উচ্চবর্গীয় নাগরিকদের ঘরে ঘরে আরবি এবং ফারসি শিক্ষা দিতেন। তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত শুধু ভাই গিরীশচন্দ্র সেনই নন, রাজা রামমোহন রায়ও। আরবি-ফারসিতে রামমোহনের পাণ্ডিত্য অসাধারণ। তিনি ফারসি ভাষায় পত্রিকাও প্রকাশ করেন। তার পত্রিকার নাম ছিল ‘মিরাত-উল-মুল্ক’।
সবকিছুই ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। বঞ্চনার সময় বয়ে গেল নগর ঢাকার বুক বেয়ে। ঔপনিবেশিক নগর ঢাকায় ব্রিটিশ পুঁজিতে হলো না শিল্পায়ন। আর কিছু না হোক বুড়িগঙ্গার তীর ধরে গড়ে উঠতে পারত চটশিল্প। হলো না। পাট চলে গেল কলকাতার হুগলী নদীতীরের পাটের মিলে। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সময় বাঙালিরা পাট থেকে পূর্ববঙ্গের বঞ্চনার প্রশ্ন তুলেছিল। তার পুরাতন পথটা তো তৈরি করেছিল ইংরেজ আর ভারতীয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা। আক্ষেপটা এই, বাণিজ্যের যে নৌপথ পদ্মা, মেঘনা, যমুনা আর ব্রহ্মপুত্র, ঔপনিবেশিক যুগে তা ব্যবহৃত হলো হুগলীর চটকলের কাঁচামাল পাটবোঝাই নৌযানের জন্য। লাভের লাভ, অন্তত রবীন্দ্রনাথ তার কাব্যের উৎস ভূমি হিসেবে পদ্মা এবং তার প্রকৃতিকে ব্যবহার করেছিলেন। তার সোনার তরী কাব্যে আমরা পেলাম কী করে? অর্থনৈতিক মূল্য না-থাকলেও কাব্যটির দার্শনিক মূল্য কম কী?
পাকিস্তান সৃষ্টি হলো। মানুষের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ঢাকা শহর ভাগের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর ইতিহাসের সাক্ষী হলো। তার ভেতরটার সামাজিক বদল হলো, বাইরেরটা অনড় হয়ে পড়ে রইল। ঔপনিবেশিক পুরাতন ঢাকা নগরীর বাইরে মোহাজের বিহারিদের জন্য অপরিকল্পিতভাবে তৈরি হলো মোহাম্মদপুর, পাকিস্তানি মুসলিম লীগ নেতাদের নামে নামকরণ হলো রাস্তার, বাদ পড়লেন বাঙালি নেতারা। উর্দুভাষী মরহুম নেতারা প্রাণ ফিরে পেতে চাইলেন বাঙালির ঢাকা শহরে। সম-আদর্শের বাঙালি নেতারা জায়গা পেলেন না। কিন্তু এতে ঢাকা শহরের শ্রীবৃদ্ধি ঘটল না। ভাগ হলো বিহারির ঢাকা, বাঙালির ঢাকা। নামের প্রলেপ দেওয়া হলো মাত্র। স্মৃতিতে আজও অমর হয়ে আছে গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন ও রেললাইন। গে-ারিয়া রেললাইন। তেজগাঁও রেললাইন। রেললাইনের দুপাশে দরিদ্র-বঞ্চিত-শোষিত আদম সন্তানদের বাসস্থান। মানুষ নয় তো পতঙ্গের বাস। আমরা বেইমানি করেছি এসব মানুষের সঙ্গে। এরাই ছিল পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক আন্দোলনের রাজপথের সৈনিক। এরাই বুকের রক্ত দিয়েছে জঙ্গি আন্দোলনে। একাত্তরের ২৫ মার্চ তাদেরই খুন করেছে পাকিস্তানি সেনারা। বস্তিতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। কি হতভাগ্য এই বিস্তবাসী! স্বাধীনতার পর নগর উন্নয়নের নামে বস্তিগুলোতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দখল করা হয় সরকারি ভূমি। নব্যধনীদের জন্য তৈরি করা হয় সুরম্য আকাশছোঁয়া বাড়ি। কবি গুন্টার গ্রাস তো এমনি তরো পুরাতন কলকাতাকে দেখেই কবিতায় লিখেছিলেন, ‘ঈশ্বরের বিষ্ঠা’। আমরাও তাই উন্নয়নের নামে, আধুনিকতার নামে অপরিকল্পিত, স্বেচ্ছাচারে গড়ে ওঠা ঢাকা নগরকে বাঙালির গৌরবের বদলে অপরিণামদর্শিতার দীর্ঘশ্বাস বলতে চাই। কিন্তু গরিব-ধনীর শ্রেণি পার্থক্যটা স্পষ্ট হলো ঠিকই।
মৌমাছির এমন প্রজাতিও আছে যারা কক্ষনো চাকে মৌ বা মধু সঞ্চয় করে না। চাক হচ্ছে তাদের প্রজননগৃহ। এরা ভয়ংকর বিষাক্ত। তাদের হুলে থাকে প্রাণঘাতী বিষ। বর্তমান ঢাকা শহরটাও জনসংখ্যার ভারে ও ভিড়ে মধুহীন মৌচাকে পরিণত হয়েছে। দূষিত পরিবেশ, অপরিচ্ছন্ন, রোগ-ব্যাধির আঁতুড় ঘর, অপরাধের অন্ধকারে পরিণত হয়েছে এই শহর। প্রকৃতিও প্রতিশোধ নেয়। করোনার মৃত্যুহার এই শহরে কত? সারা দেশে কত? এসব নির্মম প্রশ্ন। কলকাতা শহরের মতো ঢাকা শহরও প্রবল ভূকম্পনপ্রবণ এলাকার অধীন।
ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য প্লেট দিয়ে পৃথিবী তৈরি। ঢাকা শহরের তলায়ও রয়েছে এমনি বিভক্ত প্লেট। প্লেটের ধর্ম হচ্ছে প্রবল ভূকম্পন হলে একটি প্লেট অন্যটির ওপর উঠে স্থান পরিবর্তন করে। ফল দাঁড়ায় এই, ওপরের নগর-লোকালায়-বন-জলাশয়-পাহাড় ভেঙে পড়ে। ধ্বংসলীলার চিহ্ন রেখে তবেই থামে কম্পন। এমনি বিপর্যয় ঘটলে অপরিকল্পিত ঘনবসতির ঢাকার কী হবে? কবছর আগে ভারতের গুজরাটের ভুজ শহরটি ভূকম্পনে ধ্বংস হয়ে যায়। চাপা পড়ে হাজার হাজার মানুষ। মৃতদের কঙ্কাল কোনোকালেই উদ্ধার করা যাবে না। ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবসভ্যতার নিদর্শন হয়ে থাকবে ভুজ শহর। কোনো দিন আর মানুষের ফেরা হবে না ওই শহরে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ইট-পাথরে তৈরি বহুতল বাড়িগুলো দুর্গম মৃত্যুপুরী হয়ে থাকবে অনন্তকাল।
বিগত শতবর্ষে সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ভূমিকম্পে। অসংখ্য ছোট-বড় শহর, জনপদ ধ্বংস হয়েছে। দেশের নগর নির্মাণ পরিকল্পনায় যারা থাকেন, বিষয়টা তাদের মাথায় রাখতে হবে। উন্নয়নের শুধু আসমানছোঁয়া বাড়ি বা আবাসন-বাণিজ্য ভবন নির্মাণ নয়, তাদের রক্ষা করাও বড় দায়। নির্মাণ সংস্থাগুলোর সীমাহীন লোভ, নির্মাণ-দুর্নীতি জাতীয় বিপর্যয় ঘটাতে পারে। বাঙালির ‘সবে ধন নীলমণি’ অর্থাৎ একমাত্র সম্বল ঢাকা শহর নিয়ে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে ভাবতে হবে সময় থাকতে।
বিশ্ব সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাগুলোর রিপোর্টে নগরসভ্যতার পরিমাপে নগর ঢাকার স্থান সম্মানজনক স্থানে নেই। নাগরিক সুবিধা, জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শ্রেণিগত সাম্য, ব্যক্তি বা পারিবারিক সুখ-শান্তির হিসাবে ঢাকা অবশ্যই প্রথম দিকে নেই। কিন্তু এটা ভাবতে হবে যে স্বাধীন ঢাকার বয়স মাত্র পঞ্চাশ বছর, ইংল্যান্ডের মতো হাজার বছর নয়। এই পঞ্চাশ বছরের ভেতর আবার গণতন্ত্র বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। স্বৈরাচার হিংস্র আক্রমণে রক্তাক্ত করেছে। নগর ঢাকা আবার ঠাটবাটে বড় হচ্ছে চার পাশের চিরায়ত সবুজ গ্রাম আর স্বচ্ছ জলাশয়কে রূপান্তর ঘটিয়ে নয়, বরং গ্রাস করে। প্রশস্ত সড়ক, আকাশচুম্বী দালাল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপার মার্কেট নাগরিক চমক বৃদ্ধি করে, গৌরব নয়। সম্প্রতি যুক্ত হওয়া বিস্ময়ের পদ্মা সেতু কতটা পরিমাণ অক্সিজেন আর বিশুদ্ধ রক্ত সরবরাহ করে শহরের ধমনিতে তা টের পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক