আতঙ্কে ভয়ে মার্চ

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৩, ১০:১৭ পিএম

এবার গ্রীষ্মকালের সূচনাতেই বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকা-ে দেশের মানুষ আতঙ্কিত হতে শুরু করেছে। বিস্ফোরণের সংবাদে মানুষ এখন এতই ভীত হয়ে গেছে যে, যেকোনো জায়গাতেই তারা একটা বিস্ফোরণ আঁচ করছে। এই আতঙ্ক অবশ্য একদিক থেকে ভালোই। যদি তার প্রতিকার করার জন্য মানুষ ভাবতে শুরু করে। বহু দিন ধরে জরাজীর্ণ ভবনে এখানে মানুষের বাস। বিল্ডিং পরিদর্শক নেই, সিটি করপোরেশনের কোনো দায় নেই। বিস্ফোরক বা নানা ধরনের দাহ্যপদার্থের জন্য নেই কোনো রাষ্ট্রের খবরদারি। এক অনিরাপদ অবস্থায় মানুষ থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এমন অনেক নবনির্মিত ভবনে গিয়েছি যেখানে কোনো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই। কোথাও হয়তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে কিন্তু সূর্যালোক বা বাতাস ঢোকার কোনো ব্যবস্থা নেই।

পুরান ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়, কংক্রিটের বা শতাব্দী প্রাচীন সুরকি ছাদের নিচে বাঁশের ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে। সিঁড়িগুলো এতই সরু যে, কোনো দুর্ঘটনায় মানুষ নিচেও নামতে পারবে না। সিঁড়িতেই একজন আরেকজনের ঠেলাঠেলিতে ওখানেই একটা সমাধি হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাড়িটির দখল রাখতে গিয়ে যেকোনোভাবে জীবনবাজি রেখে এ ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও সিটি করপোরেশনের ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। সরকারের খাজনাও দিতে হচ্ছে। তারপর আছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনের প্রাচীনব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার মধ্য থেকে এমন একটি অভ্যাস রয়ে গেছে যে, মনে হতে থাকে এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ বাঁচার উপায়। শুধু ঢাকায় নয় জেলা বা উপজেলা শহরে একই অবস্থা। কোথাও কেউ পরিকল্পনায় ধার ধারে না। কোথাও নগর-পরিকল্পনার লোকটি নেই। এ যেন একটা মেঠোপথ, তার দুধারে ইচ্ছামতো বাড়িঘর স্থাপনা গড়ে উঠছে। গ্রামের ধানের জমিতে ইচ্ছামতো বাড়িঘর উঠিয়ে দিগন্ত ঢেকে দিচ্ছে, তাতেও কোথাও কোনো আপত্তি বা নিষেধ নেই।

স্থানীয় সরকার বলে একটা ব্যবস্থা অনেক দিন ধরে চলে আসছে। সেখানে একসময় দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হতো না। এখন সেখানে দলীয় পরিচয় এসে গেছে। দলের নমিনেশন প্রয়োজন। বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সেই নমিনেশন পেতে হয়। উন্নয়ন কর্মকান্ডে তাই বিপুল উৎসাহ তাদের। তারপর নির্বাচনের সময় ভোটারদের কোথাও কোথাও প্রয়োজন। তাই ভোট উন্নয়ন কর্মকা-কেও নিয়ন্ত্রণ করে। সব জায়গার মতোই দুর্নীতিই এখানে প্রধান বিষয়। লাখো কোটি টাকার নমিনেশনের টাকা তুলতে গিয়ে আর কী উপায়? কিন্তু তাতে কী লাভ হলো দেশের? প্রকারান্তরে দুর্নীতিকে ব্যাপকতা দিয়েই প্রাচীন এবং নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা।

একদা আমরা প্রবীণদের দেখেছি, ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হতে। কেউ কেউ আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকতেন। সারাজীবনই তারা দেশের সেবা করতেন। পৌরসভার সদস্য এবং চেয়ারম্যানদের দুয়ার মানুষের জন্য খোলা থাকত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিছু কিছু জায়গায় জনহিতকর কাজে তাদের পাওয়া যেত। কিন্তু আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের পথ ধরে এ ব্যবস্থার যে অবক্ষয় শুরু হলো তা বহু বছর পর্যন্ত গণপ্রতিধিনিদের আনুগত্য, শুধু সরকারের প্রতিই রইল। ১৯৭৫ সালের পর সামরিক শাসনের আমলে জনগণের প্রতি জবাবদিহি একেবারেই নিঃশেষ হতে চলল। এ অবস্থায় একচেটিয়া রাজনৈতিক কর্তৃত্বে  আর গণমুখী ব্যবস্থাটি থাকল না। নাগরিকদের কাছ থেকে প্রচুর ট্যাক্স আদায়, সরকারের বার্ষিক অনুমোদিত অর্থ পেয়েও জনকল্যাণের বিষয়টি আর গুরুত্বপূর্ণ থাকছে না। নাগরিকদের সুস্বাস্থ্যের তদারকি করার প্রয়োজনটিও গণপ্রতিনিধিদের কর্মপরিধির বিষয় নয়।

শহরগুলো বিশেষ করে ঢাকা শহরের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশাল বিশাল জনপদ গড়ে উঠেছে। অধিকাংশ স্থানে রাজউক বা অন্যান্য সংস্থা কোনো ধরনের অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা না করেই দালান নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছে। ধরা যাক, পান্থপথ, এই রাজপথে কতগুলো হাসপাতাল, বিপণি, সরকারি-বেসরকারি অফিসের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? যদি একটু চিন্তা করা যায়- প্রতিদিন কতগুলো গাড়ি, কত মানুষজন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করবে, কোথায় তাদের গাড়ির পার্কিং, কত ধরনের গাড়ি চলাচল করবে তার একটা মোটা হিসাবও যদি ভাবা যেত, তাহলে কোনো বিবেচনাতেই এসব অনুমোদন পাওয়ার যোগ্যতা রাখত না। কিন্তু দুর্নীতির সহজ পথে অর্থের বা ক্ষমতার প্রভাবে এসব অনুমোদন পেয়ে গেছে।

নগরের প্রধান বয়স্ক সিটি করপোরেশনের কর্তৃপক্ষও বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। জনকল্যাণের মহত্তম পথই হচ্ছে স্বাধীনতা। এখানেই যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে। নিজেদের মতো করে একেবারেই স্থানিক বিবেচনায় স্বদেশকে গড়ে তোলার সংগ্রামটাই তো স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমাদের দেশেও লাখ লাখ মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে, সংগ্রাম করেছে। কি দুঃসাহসকে স্বীকার করে লাখো কোটি মানুষ কত ত্যাগ স্বীকার করল! কিন্তু আমরা স্বাধীনতাকে, মুক্তিযুদ্ধকে সংহত করতে শিখলাম না। একসময় সেনাবাহিনী মনে করল, তারাই দেশের সর্বোচ্চ মঙ্গল করবে। সে এক অসম্ভব কল্পনা হয়ে দাঁড়াল। রাজনৈতিক দল ক্ষমতার লড়াই করছে কিন্তু সংসদটাকেও হাজির করতে পারেনি। জনপদকে নিরাপদ করার যে কাজটুকু নির্বিঘেœ করা যেত, তাতেও কাউকে মনোযোগী হতে দেখা গেল না।

দেশে অবকাঠামোগত একটা উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সেই অবকাঠামোকে ব্যবহার করার কোনো সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় কত তাজা প্রাণ বলি হয়ে যাচ্ছে, তার খবর আমরা জানি! সড়ক পরিবহনে আমরা কোনো দায়িত্বশীলতা দেখতে পাই না। যাত্রীসাধারণ এক চরম অসহায় অবস্থায় যানবাহন ব্যবহার করে থাকেন। সেখানে যে নেতৃত্ব আছে, সে নেতৃত্বও দায়িত্বহীন। তারা বিনাপরীক্ষায় চালকদের গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দিতে বলে। কোনো কঠোর আইন করতে গেলে ধর্মঘটের হুমকি দেয়। ভাড়া বাড়ানো হয় ইচ্ছামতো। সেখানেও এক বিশাল দানবীয় সংগঠিত শক্তির তৎপরতা লক্ষ করা যায়। রাজনৈতিক দলের সব কর্মকা- ক্ষমতায় থাকার এবং ক্ষমতায় যাওয়াকে কেন্দ্র করে। নাগরিকদের অন্য কোনো সমস্যা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেই।

’৭৫ থেকে ৯০ পর্যন্ত একটা দীর্ঘ সময় গেছে শুধু সেনাবাহিনীর মধ্যেই ক্ষমতার লড়াই নিয়ে। সে সময় মানুষ কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রকে পরিবর্তন করার জন্য লড়াই করেছিল। ’৫২ বছর পর মার্চ মাসে দাঁড়িয়ে যদি আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাই তাহলে একটা ঝলমলে শপিংমলের মতো বাংলাদেশকে দেখতে পাই, যেখানে শিক্ষা-সংস্কৃতি উৎসারিত মূল্যবোধ হারিয়ে বসে আছি। তার বদলে পদে পদে দুর্নীতিগ্রস্ত একটা দেশ দেখতে পাই। হাজার বছর ধরে এই ভূখ-ের মানুষ যে সমাজটা নির্মাণ করেছিল তা ভেঙেচুরে অদ্ভুত একটা দেশ গড়ার চেষ্টা চলছে।

একদা বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন বাংলাদেশ একটি সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র অর্থাৎ সংস্কৃতিই নির্দেশ করবে রাষ্ট্রের কানুন। অতীতের সবকিছুই যে ভালো ছিল তা বলা যাবে না, বিশেষ করে দারিদ্র্য। কিন্তু সেই দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য আমরা জাতীয় কোনো পথ খুঁজে পাইনি, আমাদের দেশের শ্রমিকরা আয়ের উৎস হিসেবে খুঁজে নিয়েছে এক আদিম ব্যবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে কিশোর শ্রমিকরা উঠের দৌড়ের সহিসের কাজ খুঁজে নিয়েছে। এ করেই পেটেভাতে, প্রবল অনিশ্চয়তায় চলছে সেই কাজ। বিদেশে কায়িক শ্রমের বিনিময়ে আসা বৈদেশিক মুদ্রায় আমাদের রিজার্ভ গড়ে ওঠে, সেই সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পে নির্মম শ্রম শোষণ তো আছেই।

রাষ্ট্রটা তুলে দেওয়া হয়েছে দায়িত্বহীন ব্যবসায়ীদের হাতে, যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য এক লাফে বাড়িয়ে দেয়। রাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ তারা মানে না। বর্তমানে ইউক্রেনের যুদ্ধ তাদের এ সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেছে। সময়টা খুব কম নয়। অনেক সময়ের আমরা অপচয় করে ফেলেছি। এর মধ্যে ভালো দৃষ্টান্ত যে নেই তা নয়। কিন্তু মূল্যবোধহীন উন্নয়ন আমাদের রাষ্ট্রটাকে আরও অমানবিক করে তুলতে পারে তার কথা কি আমরা ভাবছি?

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের উত্তাল দিনগুলোর স্বপ্নের মধ্যে, কোন বাংলাদেশ অবস্থান করছিল?

লেখক: নাট্যকার, অভিনেতা ও কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত