নানা নাটকীয়তার পর কংগ্রেসের নেতা সিদ্দারামাইয়া মুখ্যমন্ত্রী ও ডি কে শিবকুমার উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভায় সব সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন কংগ্রেসের জাতীয় নেতারা। খ্রিস্টান সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে জে জর্জ, মুসলমান সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে বি জেড জামির আহমেদ খান মন্ত্রী হয়েছেন।
রাজ্যটিতে ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও ধর্মনিরপেক্ষ জেডিএস জোট সরকার গঠন করলেও এক বছরের মাথায় আস্থা ভোটে এই জোট সরকারকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল বিজেপি। নির্বাচনে একক দল হিসেবে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও রাহুল গান্ধী চটজলদি জেডিএসের সঙ্গে জোট করে জেডিএসের কুমারস্বামীকে মুখ্যমন্ত্রী মেনে নিয়ে বিজেপিকে আটকে দেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবির পর বিজেপি বিভিন্ন প্রদেশে জোট ভাঙানো, নেতা বাগানো ও আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট করার কৌশল নেন। তাদের প্রথম টেস্টটি হয়েছিল কর্নাটকে। রাহুল গান্ধী যে কৌশলে এক বছর আগে বিজেপিকে সরকার গঠন করতে দেয়নি, ঠিক একই কৌশলে ২০১৯-এ কর্নাটকের ক্ষমতা দখল করে বিজেপি। ফলে আজকের বিজয় রাহুল গান্ধীর বা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ২০১৯ সালের প্রতিশোধও বটে।
এই নির্বাচনে পরাজয়ে বিজেপি শুধু রাজ্য হারায়নি, প্রথমবারের মতো দলটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি ‘মোদি ম্যাজিক’ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ভারতের রাজনীতিতে এটা বলা হয়ে থাকে যে, নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি জনসভার মাধ্যমে ১০-১৫% ভোট সুইং করতে পারেন। কর্ণাটক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তত ২০টি জনসভায় যোগ দিয়েছেন। তিনি যে ১৭ কেন্দ্রে জনসভা করেছেন যেখানে মাত্র ৫টিতে বিজেপি জিতেছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ২০১৯ সালে বিশেষ কৌশলে রাজ্যটির ক্ষমতায় গিয়ে নানা ধরনের ধর্মীয় উসকানি তৈরি করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েছিল। কর্নাটকের রাজনীতি মূলত রাজ্যের হিন্দুদের দুটি প্রধান সম্প্রদায় লিঙ্গায়েত ও ভোক্কালিগাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের রাজনীতি। বিজেপি বরাবরই লিঙ্গায়েতদের সমর্থন পেলেও ভোক্কালিগাদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বেশ কম। কর্নাটকের এই নিজস্ব হিন্দু ‘জাতপাতের রাজনীতি’ শেষ করতেই বিজেপি চেয়েছিল হিন্দু-মুসলিম ভোট ভাগের রাজনীতি করতে, যেন মুসলিম-বিরোধিতার আবেগে লিঙ্গায়েত ও ভোক্কালিগারা একাট্টা হয়ে বিজেপিকেই ভোট দেয়।
ক্ষমতায় এসে রাজ্যের স্কুল-কলেজে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করে বিজেপি। নির্বাচনের আগে ইসলামসম্মত ‘হালাল’ মাংস বাজারে বিক্রির ওপরেও বিধিনিষেধ আনা হয়। মহীশূরের সাবেক শাসক টিপু সুলতানকে হিন্দুবিদ্বেষী চিহ্নিত করে বিতর্কও তৈরি করা হয়েছিল। এর আগে একই প্রক্রিয়ায় উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে জ্ঞানবাপী মসজিদে শিবলিঙ্গ থাকার দাবি করা হয় ও গুজরাটের নির্বাচনের আগে বিলকিস বানোর ধর্ষকদের ‘ব্রাহ্মণ সংস্কারী ধর্ষক’ দাবি করে মুক্তি ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কয়েকজন ‘অমুসলিম শরণার্থী’কে নাগরিকত্ব দিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিতর্ক উস্কে দেওয়া হয়।
কিন্তু উত্তর ভারত বা গুজরাটের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দক্ষিণ ভারত এক নয়। দক্ষিণ ভারতের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে অসাম্প্রদায়িক ও পরমতসহিষ্ণু। কোনো বড় দাঙ্গার ইতিহাসও নেই। মহীশূরের লোকজন টিপু সুলতানকে চিরকাল পরধর্মসহিষ্ণু শাসক বলে সম্মান করে আসছেন। হঠাৎ করে টিপু সুলতানকে ‘ভিলেন’ ও ‘অত্যাচারী’ হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা যাবে না।
বিজেপির কর্ণাটক হারের মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতের বিজেপির শাসনের এক প্রকার অবসান হয়েছে। দক্ষিণ ভারত বলতে মূলত পাঁচটি রাজ্যকে বোঝায় তামিলনাডু, কেরালা, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশ। পাঁচটি রাজ্যে মোট লোকসভা আসন ১৩০টি। তার মানে মোট লোকসভা আসনের মধ্যে দক্ষিণ ভারতের দখল ২৪% সিট। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দক্ষিণ ভারতের পাঁচ রাজ্য থেকে বিজেপি জিতেছিল ২৯টি আসন, অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতে বিজেপির লোকসভা আসনের দখল আছে মাত্র ২২%।
কর্ণাটক নির্বাচনে কংগ্রেসের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশজুড়ে বিপর্যস্ত কংগ্রেসকে আত্মবিশ্বাস দেবে নিশ্চিত। তবে এই জয়ে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সমীকরণ মেলানো কঠিন। ২০২৩ সালে আরও অর্ধডজন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে লোকসভা নির্বাচনের আগে এসব রাজ্যেও বিজেপি-কংগ্রেসকে জনপ্রিয়তার পরীক্ষা দিতে হবে।
তেলেঙ্গানায় কংগ্রেসের সমীকরণ কর্নাটকের মতো সবল নয়। অন্যদিকে রাজস্থানে নিজ দলের নেতা অশোক গেহলট ও শচীন পাইলটের দ্বন্দ্বে টালমাটাল রাজ্য কংগ্রেস। রাজস্থানে ২০১৮ সালে ভোট জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী হন অশোক গেহলোট, উপমুখ্যমন্ত্রী হন সচিন পাইলট। পরে ২০২০ সালে সচিন ও তার সমর্থকরা অশোক গেহলোটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সেই রেশ এখনো চলছে। কর্নাটকে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই নেতা সিদ্দারামাইয়া ও শিবকুমার দ্বন্দ্ব ভুলে যেভাবে মিলেমিশে কাজ করেছেন রাজস্থানে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে মধ্যপ্রদেশে রাজ্য বিজেপির দ্বন্দ্বের ফল ঘরে তুলতে পারে কংগ্রেস। ছত্তিশগড়েও নির্বাচনে জেতা সহজ হবে কংগ্রেসের জন্য। এসব রাজ্যে জিততে কংগ্রেসকে সর্বভারতীয় বিজেপিবিরোধী ঐক্যের ওপর নির্ভর করতে না হলেও লোকসভা নির্বাচনে জিততে কংগ্রেসে এ ছাড়া বিকল্প নেই। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা বিজেপির সর্বভারতীয় পপুলার ভোট ছিল ৩১%, ২০১৯ সালে তা ছিল ৩৭%। ফলে মূলত বিরোধী নানা দলে-উপদলে বিভক্তিই বিজেপিকে কেন্দ্রের ক্ষমতায় বসিয়েছে।
ভারতে বিজেপি বিরোধী দলগুলো নিয়ে ‘বিরোধীদের ঐক্যের’ যে চেষ্টা করা হচ্ছে তার বাস্তব চিত্র কংগ্রেসের কর্ণাটক রাজ্যের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ফুটে ওঠে। কর্নাটকে কংগ্রেস জয় পেলেও তা নিয়ে সর্বভারতের জনপ্রিয় ও বিজেপিবিরোধী মুখ অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায়নি।
শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে বিভিন্ন রাজ্যের যেসব নেতারা যোগ দিয়েছিলেন তারা হলেন তামিলনাড়–র মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেসের জোটসঙ্গী ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও জেডিইউ নেতা নীতিশ কুমার ও উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদব এবং ঝাড়খ-ের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমন্ত্রণ পেয়েও যাননি, তবে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন। আমন্ত্রণ পাননি বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী।
শপথ অনুষ্ঠানে বিজেপিবিরোধী অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের আমন্ত্রণ জানায়নি কংগ্রেস। আমন্ত্রণ পাননি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, উড়িষ্যার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক এবং তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও। স্পষ্টতই কংগ্রেস এসব দলকে নিজেদের জন্য ‘সমমনা’ মনে করছে না। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীতিশ কুমার, অখিলেশ যাদব তারা যে আগামী নির্বাচনে ‘বিজেপিবিরোধী’ ঐক্যে কংগ্রেসের নেতৃত্ব মেনে নেবেন তা বলা যায় না। কারণ এদের কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ‘ঘৃণার বাজারে ভালোবাসার দোকান খোলার’ ঘোষণা দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা দিয়ে সারা ভারতে আলোড়ন তৈরি করেছেন। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি বিরোধীদের ‘জোড়ো’ করতে পারবেন এমন আভাস দেখা যাচ্ছে না।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট