দেশের ২৮টি রাজ্য এবং দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে মোট ৩০টি রাজ্য সরকারের অর্ধেক এখন বিরোধী দলগুলোর দখলে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজেপির শাসনাধীনে রয়েছে ১৫টি রাজ্য সরকার। বিজেপি একক ক্ষমতায় ৯টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। বিজেপির শরিক দলগুলো ক্ষমতায় রয়েছে ৬টি রাজ্যে। বিজেপিবিরোধী বলে পরিচিত আঞ্চলিক দলগুলোর হাতে রয়েছে ৮টি রাজ্য। কংগ্রেস এবং কংগ্রেস সমর্থিত দলগুলো ৭টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো কর্নাটকের নামও।
কর্নাটকে (Karnataka) বিধানসভা নির্বাচনে হারের ফলে, গোটা দক্ষিণ ভারত থেকেই পুরোপুরি মুছে গেল বিজেপি (BJP)। দক্ষিণের পাঁচ রাজ্যের একটিতেও ক্ষমতায় রইল না তারা। এদিকে, গোটা দেশে ক্ষমতার বিচারেও অর্ধেকে নেমে গেল বিজেপি। এতেই বিরোধী শিবিরের পালে বাতাস লেগেছে, একথা স্বীকার করে নিতে অসুবিধা নেই।
এটা ঠিক যে, কর্নাটকে তীব্র বিজেপি-বিরোধী হাওয়ার ক্ষেত্রে রাহুল গান্ধীর ‘ভারতজোড়ো’ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচকম-লীর ধারাবাহিক চিন্তা ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করলে দেখা যাবে, প্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষে নাগরিকদের মধ্যে সেক্যুলারিজমের বীজ প্রোথিত রয়েছে অনেক গভীরে। সেই কারণেই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্নাটকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। যা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল রাজ্যবাসী।
২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, কর্নাটক সরকার সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিজাব, গেরুয়া চাদরসহ সব ধরনের ধর্মীয় বস্ত্র পরিধান করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তার আগেই একদল মুসলিম ছাত্রীকে হিজাব ও বোরখা পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া নিয়ে বিতর্ক চলছিল। মুসলিম ছাত্রীদের বিক্ষোভের পাল্টাপাল্টি একদল ছাত্র-ছাত্রী গেরুয়া চাদর পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসা শুরু করেছিল। এই বিক্ষোভ-পাল্টা বিক্ষোভের মধ্যেই এই নির্দেশিকা জারি করেছিল কর্নাটক সরকার। কর্নাটক হাইকোর্ট সরকারি নির্দেশ বহাল রাখলেও, যদিও বর্তমানে এই নিষেধাজ্ঞাটি সুপ্রিম কোর্টে বিবেচনাধীন। তবে, হিজাব বিতর্কের শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছিল কংগ্রেস। কংগ্রেস বিধায়িকা কানিজ ফতিমা বিধানসভা কক্ষে সরকারকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ফতিমা বলেছিলেন, ‘আপনারা জানেন আমিও হিজাব পরি এবং আমি বিধানসভার একজন সদস্য। যদি কারও সাহস থাকে, তারা আমায় থামিয়ে দেখাক। যারা হিজাব ও বোরখা পরতে চান, তারা সেগুলো পরবেন। এই পোশাক পরা আমাদের অধিকার। হিজাব পরা আমাদের সংস্কৃতি। এতে বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। এই অধিকার রক্ষা করতে আমরা যতদূর যেতে হয় যাব।’
একদিকে হিজাব নিষিদ্ধ করা অন্যদিকে বজরংবলীর কথা বলে ভোটের আগে ঝাঁপিয়ে পড়া দুটোর কোনোটাই ভালো চোখে দেখেনি রাজ্যের সাধারণ মানুষ। আর তার জেরেই ব্যাটিং করতে সুবিধা হয়েছিল কংগ্রেসের। প্রায় প্রত্যেক রিজিয়নে ভোট বেড়েছে কংগ্রেসের। উপকূলবর্তী কর্নাটকে যেখানে প্রতিবারই দেখা যায় মারাত্মক মেরুকরণ, সেখানেও ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদ বিজেপিকে এগিয়ে দেওয়ার তুলনায় সর্বক্ষেত্রেই পিছিয়েই দিয়েছে।
এসব বলার আগে বলতেই হবে, দক্ষিণ ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রসায়ন মূলত জাতীয় দলগুলোর (বিজেপি, কংগ্রেস ও অন্যান্য) বিরোধিতা। যদিও তামিলনাড়–র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা, অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্র বাবু নাইড়– বা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার ছেলে কুমারস্বামী কখনো কখনো বিজেপির দিকে ঝুঁকে থাকলেও মূলত দক্ষিণ ভারতে বরাবরই শক্ত অবস্থানে থেকেছে স্থানীয় দলগুলো। তবে ২০১৮ সালেই প্রথম দক্ষিণ কর্নাটক বা মহিশুর অঞ্চলে বেশ ভালো ফল করেছিল বিজেপি। সেবারে ভোক্কালিগা অধ্যুষিত এলাকায় ডবল ফিগারে আসন লাভ করেছিল বিজেপি, এর প্রভাবেই রাজ্য সরকার গঠন করতে পেরেছিল। তবে এবার তাদের সেই আসন সংখ্যা নেমে এসেছে ৬-এ। যদিও সেই অর্থে এই অঞ্চলে ভোট কমেনি বিজেপির। তবে এই অঞ্চলে জেডিএস-এর একটা বড় অংশের ভোট গিয়েছে কংগ্রেসের দিকে। এর জন্যই এই অঞ্চলে ৩৭টি আসনে জিতেছে কংগ্রেস। এই অঞ্চলে আগেরবার যেখানে জেডিএস জিতেছিল ২৬টি আসন, তারা এবার এই অঞ্চলে পেয়েছে মাত্র ১৪টি আসন। অর্থাৎ বিজেপির কর্নাটকের ক্ষমতা লাভ কেবলই তাদের রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। এটাকে বিজেপি বড় করে প্রচার করলেও তার তেমন যে বাস্তব ভিত্তি ছিল না, এবারের নির্বাচন তারই প্রমাণ।
১৯৬৫ সালের পর হিন্দিকে একমাত্র আধিকারিক করার জন্য ভারত সরকারের প্রচেষ্টায় অনেক অ-হিন্দি ভারতীয় রাজ্যে গ্রহণযোগ্য ছিল না, যারা ইংরেজির অব্যাহত ব্যবহার চেয়েছিলেন। দ্রাবিড় কড়গমের বংশধর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কড়গম (ডিএমকে) বিরোধী দলের নেতৃত্বে ছিলেন। হিন্দির ভয় দূর করতে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৬৩ সালে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার অব্যাহত রাখার জন্য ১৯৬৫ সালে সরকারি ভাষা আইন প্রণয়ন করেন। যদিও আইনটি ডিএমকে সন্তুষ্ট করেনি, এই বিষয়টি তাদের এই মর্মে আতঙ্কিত করে যে এই ভিত্তিতে অ-হিন্দিভাষীদের ভবিষ্যতে অসম্মানিত করা হতে পারে, এই আন্দোলনই তাদের ১৯৬৭ সালে তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় নিয়ে আসে। এরপর থেকেই দক্ষিণ ভারতে হিন্দিভাষী আধিপত্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, জাতীয়তার উন্মেষে।
বহু ভাষা ও মিশ্র সংস্কৃতির দেশ ভারতে হিন্দিকে জাতীয় ভাষা করার কথা বলে ক্ষোভের মুখে পড়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শাসক দল বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। অমিত শাহর মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অন্য ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষ। তাদের মধ্যে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিলনাড়–তে ডিএমকে সভাপতি এম কে স্ট্যালিন, কর্নাটকের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী, পদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী ভি নারায়ণস্বামী, সিপিএমের নেতা মহম্মদ সেলিম প্রমুখ। নির্দিষ্ট কোনো ভাষার একচ্ছত্র ব্যবহার নেই ভারতে। উত্তর ভারত ও মধ্য ভারতে যেমন হিন্দি ভাষার প্রচলন বেশি, তেমনি দক্ষিণ ভারতের প্রতিটি রাজ্যের স্ব স্ব আঞ্চলিক ভাষার আধিক্য। তবে সবশেষ জরিপ অনুযায়ী, ভারতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় হিন্দি ভাষা। এর পরিপ্রেক্ষিতে অমিত শাহ ভারতে একটি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেন। কর্নাটক নির্বাচনের আগে তিনি বলেন, ‘এক রাষ্ট্র, এক ভাষা হোক ভারতে। সেই ভাষা হোক হিন্দি।’ এটাই হয়তো বিজেপির হারের অন্যতম কারণ বলে কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সবাই জানেন, বিজেপি বা আরএসএসের রাজনৈতিক মতাদর্শ মূলত দুটোই, এক তাদের হিন্দুত্ববাদ আর দ্বিতীয়ত হিন্দুসংস্কৃতিকে ঐতিহ্যপূর্ণ প্রমাণ করতে গিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা। তাদের এই ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদের আদতেই কোনো ভিত্তি নেই। ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে হিন্দি ভাষার প্রাধান্যের ভিত্তিতে তারা অনেক ক্ষেত্রেই বলপূর্বক ক্ষমতা দখলের খেলায় সাময়িক লাভবান হয়েছে। কিন্তু এসব অঞ্চলে অ-হিন্দুদের সংখ্যাও নিতান্ত মন্দ নয়। কিন্তু সংবিধানকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে নানাভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলেছে। বিশেষত গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ক্ষমতায়ন ও তাদের কার্যকালের দিকে চোখ রাখলেই এ পরিস্থিতি বোধগম্য হবে। তবে কিছু কিছু রাজ্যের ক্ষেত্রে বিজেপি ক্ষমতা দখলে অপারগ হলেও সেখানে আরএসএসের গোপন তাস হিসেব বিজেপির সুবিধা করে দিচ্ছে কিছু কিছু রাজনৈতিক দল। তাদের বহিরঙ্গে বিজেপি বিরোধিতা থাকলেও আদপে তাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে ভেতরে ভেতরে। আর এখানেই বিপদের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মানুষ বিজেপির অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে বটে কিন্তু ব্যালটবক্সে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
কেবলই হিন্দুত্ব বা সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ নয়, বিজেপির আমলে ভেঙে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। মোদি সরকারের আমলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নের সূচক ক্রমাগত নিম্নমুখী আর ক্ষুধা সূচক, বেকারত্বে এবং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের অগ্রগতির লেখচিত্র বিশ্বের দরবারে ভারতের অবস্থান কলুষিত করেছে। এমনকি মোদি সরকার প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতাকে রক্ষা করতে তাদের উদাসীনতা লক্ষ করার মতো। আসলে বিজেপি প্রশাসনের হাতে প্রতি মুহূর্তেই লঙ্ঘন হচ্ছে সংবিধানের নিরপেক্ষতা। উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভারতের সার্বভৌমত্ব। প্রগতিশীল ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবাই চায় এই প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিস্ট শক্তির হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে কর্নাটক বিধানসভা ছাড়াও অন্যান্য যেসব উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে বিজেপির পরাজয় যে বিজেপিবিরোধীদের বেশ কিছুটা বাড়তি অক্সিজেন জোগাচ্ছে, সে কথা বলাই বাহুল্য।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও শিক্ষক