শক্তিশালী ভূমিকম্পের মুখোমুখি আমরা

আপডেট : ২১ জুন ২০২৩, ১০:৩২ পিএম

আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেটের ডাউকি চ্যুতি (সিলেট-ভারত সীমান্ত) এলাকায় ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পে পুরো মেঘালয় রাজ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। এতে ঢাকায়ও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছিল। এখন এই এলাকায় আবারও ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। সম্প্রতি সিলেটের গোলাপগঞ্জ এলাকায় ৪ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের একটি ভূমিকম্প হয়। এর আগে ঢাকার সন্নিকটে ভূমিকম্প হয়। এসব ভূমিকম্পের অর্থ হলো আমরা একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সামনে অবস্থান করছি। সাধারণত একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ১০০ থেকে ১৫০ বছর পর আরও একটি ভূমিকম্প হয়ে থাকে।

২০১৬ সালে তিনটি (৩ জানুয়ারি ৬ দশমিক ৬, ১৩ এপ্রিল ৭ দশমিক ২ ও ২৪ আগস্ট ৬ দশমিক ৮ রিখটার স্কেল) বড় আকারের ভূমিকম্প হয়েছিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে। তারপর ২০২০ সালের ১৭ এপ্রিল একই এলাকায় ৫ দশমিক ৯ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল। আগেই বলেছি, স্বাভাবিকভাবে কোনো এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ বছর পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে। সেই হিসেবে আমাদের এই এলাকায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প সময়ের ব্যাপার।

ঢাকা শহরের আশপাশে কোনো ফল্ট লাইন নেই। আমাদের দেশের ভেতরে মধুপুর, সিলেট ও সিলেট সীমান্তের ডাউকি এবং ফেনী থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত সাব-ফল্ট লাইন রয়েছে। এসব লাইনে একটি বড় ভূমিকম্প হলেও হতে পারে। এছাড়া যমুনা সেতুর আশপাশ এলাকায় একটি ছোট ফল্ট লাইন রয়েছে। সেই ফল্ট লাইনের কারণেও ঢাকা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ মিয়ানমার (বার্মা) সীমান্তের পাশ দিয়ে একটি ফল্ট লাইন রয়েছে। আর এই ফল্ট লাইনটি আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত এবং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ত্রিপুরা, বিহার, মেঘালয়, শিলং হয়ে হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই এলাকায় ভূমিকম্প বেশি উৎপত্তি হয়ে থাকে এবং তা আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় বড় ভূমিকম্প হতে পারে। আর সেই ভূমিকম্পের কারণে ঢাকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে আরেকটি বিষয় হলো ঢাকার নিচের মাটির পলল গঠন কাঠামোর কারণে এখানে গভীরে ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর গভীরে ভূমিকম্প না হলে এতে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে। সিলেটের সেদিনের ভূমিকম্পটি যেখানে হয়েছিল সেখানেও কিন্তু কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আর এই ক্ষয়ক্ষতি না হওয়াতে বুঝা যায় এটি কোনো পাকা দালানকোঠা এলাকায় হয়নি। মাটির যত গভীরে কোনো ভূমিকম্পের উৎপত্তি হবে এটির শক্তি ততবেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। একইসঙ্গে ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প যখন ৫ মাত্রায় উন্নীত হয় তখন তা ৩২ গুণ বেশি শক্তিশালী হয়। একইভাবে যখন তা ৬ রিখটার স্কেলে উন্নীত হয় তখন ১০২৪ গুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে থাকে। তাই রিখটার স্কেল বেড়ে যাওয়া কিন্তু শুধু একটি সংখ্যা নয়, এর সঙ্গে ভূমিকম্পের শক্তি অনেকগুণ বেড়ে যায়।

প্রশ্ন থাকতে পারে যে, ছোট ছোট ভূমিকম্পের পর বড় ভূমিকম্প কেন হয়? তুরস্কে বড় আকারের ভূমিকম্প হওয়ার আগে কিন্তু অনেকগুলো ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। আর এর পরপরই শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছিল। একইভাবে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরও আবার অসংখ্য ছোট-মাঝারি ভূমিকম্প হয়। তাই ধারণা করা হচ্ছে এই অঞ্চলে একটি বড় ভূমিকম্প আসন্ন। বর্তমানে দেশের ভেতরেও প্রান্তীয় এলাকায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বেড়ে গেছে। আর এতেই আমাদের শঙ্কা বাড়ছে।

৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হতে ১০০ থেকে ১৫০ বছর সময় লাগে। আর ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হতে সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। যেহেতু ১৮৯৭ সালে ৮ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক নামে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, তাই সাম্প্রতিক সময়ে ৭ বা এর চেয়ে বড় রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হতে পারে। এছাড়া দেশের দক্ষিণ-পূর্বে সেন্টমার্টিনে ১৭৬২ সালে ৮ রিখটার স্কেলের একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই হিসেবে এখানেও একটি বড় ভূমিকম্প উৎপত্তি হওয়ার সময় হয়ে এসেছে। এছাড়া ১৯৯৯ সালে মহেশখালী ভূমিকম্প ও ২০০৩ সালে রাঙ্গামাটির বরকল ভূমিকম্প আমাদের সামনে উদাহরণ রয়েছে। সেসব ভূমিকম্প আভাস দিচ্ছে এই এলাকায় একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। অর্থাৎ, দেশের উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব দুই প্রান্তীয় এলাকা শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুই এলাকার যেখানেই ভূমিকম্প  হোক না কেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঢাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত নগর জনসংখ্যা ও অপরিকল্পিত দুর্বল কাঠামোর ভবনের কারণে। ১৮৯৭ সালে যে ঝাঁকুনি ঢাকা পেয়েছিল এখন সেই ঝাঁকুনি পেলে ঢাকা শহরের অবস্থা ভয়ানক হয়ে যাবে। তাই এই শহরের ভবনগুলোকে ভূমিকম্পসহনশীল পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। একইভাবে নির্মাণাধীন ভবনগুলোকে ভূমিকম্পসহনীয় পর্যায়ে নির্মাণ করতে হবে। আমরা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক শিল্পকারখানার ভবনগুলোর শক্তিমাত্রা বাড়িয়েছিলাম। প্রকৌশলবিদ্যায় তা সম্ভব। ভূমিকম্পসহনশীল ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। ভবনের শক্তি বাড়িয়ে সহজেই ৭ রিখটার স্কেলের সহনীয় মাত্রার ভবন গড়ে তোলা সম্ভব। এসব ভবন ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়বে না, তবে কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে ভবনের শক্তি বাড়ানোর এই কার্যক্রম শুধু ঢাকা শহরে করলেই হবে না। চট্টগ্রামকেও বিবেচনায় আনতে হবে। ভূমিকম্পের কারণে এই দুই শহর সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। যেহেতু আমরা গার্মেন্টস ভবনের ক্ষেত্রে ভূমিকম্পসহনশীল ভবন গড়ে তুলতে সফল হয়েছি তাই বিদ্যমান ভবনগুলোকেও চাইলে ভূমিকম্পসহনীয় করতে পারব। এরজন্য ভবন মালিকদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে তেমনিভাবে ভবন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। দেশে এখন প্রায় ২৮টি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যারা ভূমিকম্প সহনশীল ভবন গড়ে তুলতে সার্ভিস দিচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায়, ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তা প্রতিনিয়ত হবেই। আমরা আমাদের ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হবে। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে।

অনুলিখন : ভূঁইয়া নজরুল, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত