ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মির্জা নুরুল হুদা ১৯৬২’র জুলাই মাসে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হাফিজুর রহমানকে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী করা হলে, তার শূন্য পদে এম এন হুদাকে পছন্দ করা হলো। ১৯৬৫’র মার্চে পরিকল্পনা কমিশন থেকে পদত্যাগ করে মন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ অপরাহ্ণে রাওয়ালপিন্ডিতে সরাসরি আলোচনার জন্য ডেকে নিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান। ১৯৬৮’র ডিসেম্বরেও একবার ডেকেছিলেন, তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানে বিরাজমান অসন্তোষের কারণগুলো জানতে চেয়েছেন। এবার জানতে চাইলেন গভর্নর মোনেম খানের কথা। এম এন হুদার আত্মজীবনীমূলক ইংরেজি গ্রš’ মাই সেভেন ডিকেড’স জার্নি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ থেকে এ বিষয়ে খানিকটা তুলে ধরছি :
প্রেসিডেন্ট হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, মোনেম খান (পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর) এত অজনপ্রিয় কেন?
আমি হেসে জবাব দিই, ‘আমার বলাটা অন্যায় হবে... আমি তার কেবিনেটের একজন মন্ত্রী। আপনি তার কর্মপদ্ধতি তো অবশ্যই জানেন। তিনি শিক্ষক, ছাত্র এবং সবাইকে তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন।’
প্রেসিডেন্টকে স্মরণ করিয়ে দিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পদাধিকার বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর, গভর্নর মোনেম খানের কাছ থেকে ১৯৬৪ সালে ডিপ্লোমা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ নিয়ে মহাগোলযোগ ও উপদ্রব সূচিত হয়। ১৯৬৮’র শেষ নাগাদ মোনেম খানের জন্য কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে থাকে। গাড়িতে এমনকি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতেও তিনি নিরাপদ বোধ করতেন না। রাস্তা এড়াতে তাকে হেলিকপ্টারে উড়িয়ে আনা হতো। স্বচ্ছতার প্রশ্নে আমি প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে সোজা গভর্নরের কাছে চলে যাই এবং তার সম্পর্কে যে আলাপ হয়েছে সেটি আড়াল করে অন্য সব বিষয়ই তাকে জানাই। গভর্নর মোনেম খানের সামান্য প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে মনে হয়েছে যে তিনি বুঝতে পেরেছেন তার দিন ঘনিয়ে এসেছে।
১৯৬৮’র ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পর অনেকবারই গুজবটা হুদার কাছে এসেছে যে তাকেই মোনেম খানের জায়গায় বসানো হচ্ছে। এটাকে তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে করেননি। কিন্তু ১৯৬৯’র ১০ মার্চ ‘শেখ মুজিব রাওয়ালপিন্ডিতে আমাকে বললেন মোনেম খানের কাছ থেকে আমাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের দায়িত্বভার নিতে হবে। আমি তখন ঢাকায় ফিরছিলাম। বললেন তার সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। শিগগিরই আমাকে ফেরার জন্য তিনিও চাপ দিলেন।’
পরবর্তী কিছু অংশ তার রচনা থেকে অনূদিত : ‘‘পাকিস্তানের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং তথ্য সচিব আলতাফ গহরের কাছ থেকে আমার গভর্নর হওয়ার ইঙ্গিত পাই। এক-দুদিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব আমাকে ডাকলেন এবং ১৩ মার্চের একান্ত বৈঠকে বললেন, আমাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি বললাম ‘না’। প্রেসিডেন্ট সত্যিই আমার আবেগ ও দেশপ্রেমের কাছে আপিল করলেন, একমাত্র আমিই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারব এবং দেশের এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে এটাই আমার কাছে দেশের চাওয়া। তারপরও আমি যখন না বলতে থাকলাম তিনি বললেন, এখনই আপনাকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। ঢাকা ফিরে যান, প্রস্তাবটা নিয়ে ভালো করে ভাবুন আর এক সপ্তাহ পর ফিরে এসে আমাকে বলুন, আমি আপনার চড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে নেব। তিনি যা পরামর্শ দিলেন তাই করলাম। যখন এয়ারপোর্টে এলাম, দেখলাম শেখ সাহেবও একই ফ্লাইটে ঢাকা ফিরছেন। আমরা যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছি, লোকে লোকারণ্য। তারা এসেছেন শেখকে স্বাগত সংবর্ধনা জানাতে এবং যারা রাউন্ড টেবিল বৈঠকে তার বিরোধিতা করেছেন তাদের নিন্দা জানাতে। সৌভাগ্যবশত যারা শেখের বিরোধিতা করেছেন তাদের কেউই সেই ফ্লাইটে না থাকায়, অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি।’’ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হওয়ার পক্ষের ও বিপক্ষের যুক্তিগুলোর বিচার করা তার কাছে কঠিন কাজ মনে হয়। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করলেন। শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। মোনেম খান ছুটিতে যাচ্ছিলেন, ১৮ মার্চ ১৯৬৯ একই ফ্লাইটে রাওয়ানপিন্ডিতে পৌঁছলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করলেন এবং সম্মতিসূচক সিদ্ধান্ত জানালেন। প্রেসিডেন্ট সন্তুষ্ট হলেন। ঢাকা ফেরার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরামর্শ দিলেন।
বাকিটা এম এন হুদার লেখার অনুসৃতি : ঢাকা রওনা হওয়ার আগের দিন জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। এক ঘণ্টার আলোচনায় আমি কেমন করে পূর্ব পাকিস্তানের বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি শান্ত করব সে কথা বললাম। মনে হলো সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং আমার পরিকল্পনাতে আশ্বস্ত। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি যা বলেছেন তা করতে পারলে আমাকে তাহলে এসবের মধ্যে ঢুকতে হবে না। সাধ্যমতো চেষ্টা করুন একমাস সময় নিন। ঢাকায় কর্তৃপক্ষ যদি আপনাকে পর্যন্ত সহযোগিতা না করে তাহলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং আমাকে আলিঙ্গন করে বললেন ‘খোদা হাফেজ’।
২২ মার্চ ১৯৬৯ সকাল, দুপুর নাগাদ আমার ঢাকায় পৌঁছার কথা। সে হিসাব করেই বিকেলে গভর্নর হিসেবে শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আমার ফ্লাইট লাহোরে অনেক দেরি করে ফেলে। পৌঁছাতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি হয় ২৩ মার্চ ১৯৬৯ সকালে। আমাকে শপথ করান আমার বন্ধু, প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী। শপথের পরপরই আমি হাইকোর্ট কমপ্লেক্সে তিন নেতার (একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমউদ্দিন) মাজারে এবং আমার শ্বশুর পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার (১৯৬২-৬৩) তমিজউদ্দিন খানের মাজারে ফাতেহা পাঠ করি। বিকেল ও সন্ধ্যেবেলায় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, নুরুল আমিন ও অন্যদের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করি। তারা সবাই আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং নভেম্বরে (১৪৬৯) অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তারা পরদিন সকালে গভর্নর হাউজে আমার সঙ্গে বৈঠকে বসতেও সম্মত হন। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; আগামী জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুতির সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়। ২৩ তারিখ সন্ধ্যায় শহরের বিভিন্ন অংশে যখন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি; সর্বস্তরের জনগণ করতালি দেয় এবং আমার উদ্যোগের শুভকামনা করে। কোথাও কোথাও ভিড় এত বেশি যে মোটরক্যাড এগোতে পারছিল না। আমি সুযোগটা কাজে লাগাতে গাড়ি থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলি, তারা আমার বিনীত আচরণের প্রশংসা করেন।
২৩ মার্চ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে আমি রেডিওতে ভাষণ দিই। বিকেলবেলায় এই ভাষণ রেকর্ড করা হয়। তখন আমার পাশে আমার স্ত্রী কুলসুম হুদা এবং তিন সন্তান নাজমুল, সিমিন ও জারিন বসা ছিল। আমি বিশেষ করে ছাত্রদের উদ্দেশ্য করে বলি, তারাই প্রতিবাদ ও আন্দোলনের অগ্রনায়ক। আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিই, আমার স্ত্রী ও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। আমি তাদের অভিযোগের কারণ জানি, আশা করি শিগগিরই প্রতিকার করতে পারব। আমি বুঝতে পেরেছি, ভাষণটি সর্বমহলে আন্তরিকতার সঙ্গে গৃৃৃহীত হয়েছে।
২৫ মার্চ ১৯৬৯ সকালে আমি সংবাদ সম্মেলনে দেশি ও বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আনতে আমার পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দিলাম। আগের দিন ২৪ মার্চ স্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে আমার ভাবনা ও পরিকল্পনা শেয়ার করি। সব বৈঠকেই আমি সবার সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করি যাতে ছয় মাস সময়ের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনটা সম্পন্ন করতে পারি। শেখ মুজিব যদিও নিজস্ব কারণে বৈঠকে আসেননি তিনি আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচন অনুষ্ঠানে পরিকল্পনায় সম্মত, নিজেও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। সংবাদপত্রের কাভারেজ ও সংবাদের ধরন সহানুভূতি এবং প্রশংসাসূচক।
জনগণ ও গভর্নরের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে আমি ছোট ছোট শুভেচ্ছাসূচক নির্দেশনা পাঠাই। গভর্নর হাউজের (বঙ্গভবন) সামনের রাস্তা গণচলাচলের জন্য খুলে দিই (আগে বন্ধ ছিল)। গভর্নরের মোটরক্যাডে সাইরেন বাজাবার প্রথা রদ করার নির্দেশ দিই। এসব শুভেচ্ছা ও বিনয়ের নিদর্শন হিসেবে প্রশংসিত হয়। ২৩ মার্চের ভাষণে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে আবেদন রেখেছি যেন তারা আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে আমাকে সহযোগিতা করেন যাতে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনের আয়োজন করতে পারি। ছাত্র-শিক্ষকের যে সাড়া আমি পেয়েছি তাতে অভিভূত। ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এ বি এম হাবিবুল্লাহ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে জানালেন শিক্ষকদের প্রস্তাবিত ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হচ্ছে। জগন্নাথ কলেজের একজন ছাত্রনেতা এসে কিছু দাবি জানালেন এবং তারাও ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে যাচ্ছেন। এ ধরনের ধনাত্মক অগ্রগতিতে আমি সন্তুষ্ট ও উৎসাহিত বোধ করি।
২৫ মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। কোনো অকাক্সিক্ষত ঘটনার সংবাদ নেই। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে শেখ মুজিব ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পুরো ট্রেনই ভাড়া করে নিয়েছেন। কিন্তু হায়! রাওয়ালপিন্ডি কর্তৃপক্ষ-সামরিক জান্তা মনস্থির করে ফেলেছে বেসামরিক শাসন অব্যাহত রাখতে দেবে না। আমাকে পূর্ব পাকিস্তান শান্ত করতে একমাস সময় দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। সেদিন সন্ধ্যায় সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হলো। যখন এই ঘোষণা আসে আমি একটি সভায় বক্তৃতা করছিলাম। সে রাতেই গভর্নর হাউজ ত্যাগ করে বাড়ি ফিরে আসি।
তার এডিসি মেজর এমজি জিলানি চিফ সেক্রেটারিকে ফোন করলেন, গভর্নর সাহেবের কি গভর্নর হাউজ ছেড়ে দেওয়া উচিত? খাঁটি সিএসপির মতো তিনি জবাব দিলেন, গভর্নর নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন। জিওসি মেজর জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে ফোন করলে তিনি খাঁটি ফৌজি ভাষায় বললেন, হ্যাঁ, তিনি যেতে পারেন।
জিলানি অতঃপর গভর্নরকে তার মিন্টো রোডের বাসায় পৌঁছে দিলেন।
লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলামিস্ট