চলছে রুচির মড়ক

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৩, ১০:৩৭ পিএম

একসময় আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হতো। উত্তরবঙ্গে মঙ্গা হতো। প্রান্তিক পর্যায়ে চৈত্র মাসে কেউ কেউ একবেলা আটা বাকি দুই বেলা ভাত খেয়ে জীবনধারণ করত। অনেক ঘরে আজকে চুলা জ্বলেনি, এমনও শোনা যেত। মানুষের কাছে তখন খেয়ে পড়ে বাঁচা অনেক বড় ব্যাপার ছিল। দুর্ভিক্ষ শব্দটি মানুষের খাদ্য সংকট তথা জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত ছিল। রুচিরও যে দুর্ভিক্ষ হতে পারে এমনটা তখন চিন্তায় আসত না। সেই অভাবের সময় এখন আর আমাদের দেশে নেই। আমাদের দিন পাল্টেছে। বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়েছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে।

আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার যে চিত্রটি ওপরে তুলে ধরলাম তা খুব বেশিদিন আগের নয়। নব্বই দশকেও এমনটা দেখা যেত। বর্তমানে মানুষের জীবনমান বেড়েছে। মানুষের সক্ষমতা, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ফলে এখন আর উত্তরবঙ্গে মঙ্গার কথা শোনা যায় না, পত্রিকার পাতায় এখন আর লবণ দিয়ে কচু শাক সেদ্ধ করে খাওয়ার ছবিও ছাপা হয় না। বর্তমানে কোনো কবিকেও ভাত না পেলে মানচিত্র খাওয়ার হুমকি দিয়ে কবিতা লিখতে দেখা যায় না। যে উত্তরবঙ্গে সংবাদপত্র যেত প্রকাশের একদিন পরে, সেখানে যমুনা সেতু হওয়ার ফলে ওই অঞ্চলে উৎপাদিত ফসল এখন সকালে জমি থেকে তুলে বিকেলেই চলে আসছে ঢাকাসহ সারাদেশে। পদ্মা সেতু হওয়ার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যে হাওরে একসময় শুকনার দিনে পাউ (পা) বর্ষার দিনে নাউ (নৌকা) ছিল যোগাযোগের মাধ্যম, সেখানে এখন পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো রাস্তা নির্মিত হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সব সেক্টরে প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। দেশ এখন ফোর জি থেকে ফাইভ জির দিকে এগোচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যাপ্তি এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে, একজন গ্রামের কৃষকও এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের খোঁজখবর রাখাসহ কৃষিসেবা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে পুলিশি সহায়তা কিংবা বিভিন্ন ধরনের জরুরি সেবা গ্রহণ করছে।

আমাদের এখন ভাবতে হবে প্রযুক্তির সহজলভ্যতাকে কি আমরা আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করব, নাকি এটাকে আমাদের জীবনে অভিশাপ হিসেবে ব্যবহার করব। একদিকে যেমন তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘরে বসে ডলার ইনকাম করছে আবার সেই সঙ্গে আরেকটি অংশ প্রযুক্তিতে আসক্তির ফলে অবক্ষয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। যেহেতু মানুষ স্বভাবজাতভাবেই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি বেশি আকৃষ্ট, কাজেই অনলাইনে বিকৃত রুচির কনটেন্টের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। এর ফলে অনেকটা অবচেতন মনেই মানুষের মধ্যে এক ধরনের রুচির বিকৃতি তৈরি হচ্ছে। ধীরে ধীরে রুচির এই বিকৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে যাতে করে রুচির দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির আশঙ্কাও দেখা দিচ্ছে। কিছুদিন আগেও রুচির দুর্ভিক্ষ নিয়ে সারা দেশ আলোচনায় মশগুল ছিল। ওই আলোচনায় অবশ্য রুচির বিকৃতি নিয়ে তেমন কথা হয়নি। অথচ ইস্যুটি এক প্রকার রুচির দুর্ভিক্ষের অংশ। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে রুচির দুর্ভিক্ষের এবারের এই উপক্রম তৈরি হয়েছে এবং এই লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রায় দিনই আমরা সংবাদে কার সঙ্গে সংসার ভাঙল আর কার সঙ্গে জোড়া লাগল এ নিয়ে খবর দেখতে দেখতে বিষিয়ে উঠেছি। এগুলোও অনেক ক্ষেত্রে রুচির দুর্ভিক্ষের অংশ বটে। কাদের নিয়ে প্রতিদিন আলোচনা-সমালোচনা হয়, টিভি খুললে কিংবা পত্রিকার পাতায় কাদের শিরোনাম করা হয় তা দেখলে সহজেই অনুমেয় হয় যে, আমাদের রুচির লেভেল কোন পর্যায়ে নেমেছে। এক ধরনের রুচির মড়ক লাগার মতোই অবস্থা।

দুর্ভিক্ষ, সেটাও আবার রুচির! কথাটি শুনতেও আসলে কেমন জানি লাগছে। কিন্তু আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিষয়টি। যে একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে রুচির দুর্ভিক্ষ কথাটি সামনে এসেছে সেটা মোটামুটি আমাদের সবারই জানা। আমাদের বাঙালি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল শিষ্টাচার। আমরা আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের খুবই সম্মান করতাম, সমাজে একটা মান-মান্যতা ছিল। সিনিয়ররা অন্যায় কিছু বললেও আমরা প্রতিবাদ করতাম না বরং মেনে নিতাম। এটাকে যে যেভাবেই দেখেন আমার কাছে বিষয়টার একটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কারণ এটাও ছিল আমাদের বাঙালি সমাজের এক ধরনের শিষ্ঠাচার ফলে সমাজে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যে কজন সিনিয়র এখন আমাদের মাঝে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন মামুনুর রশীদ। তিনি কোট করে একটি কথা বলেছেন এবং এটাই বাস্তব। তারপরও তাকে নিয়ে যেভাবে সমালোচনা এবং ট্রল করা, সত্যিই দুঃখজনক।

কথাটি সাংস্কৃতিক অঙ্গন দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে রুচির দুর্ভিক্ষ সমাজের সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। যেহেতু গাছের চেয়ে আগাছার বৃদ্ধি বেশি হয় এবং আমরা ধানক্ষেতে যেমনটা দেখি আগাছা মূল গাছের চেয়ে লম্বা ও খাপছাড়া। ঠিক তেমনি সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা আগাছাগুলোও কেমন জানি প্রতিটি সেক্টরেই খাপছাড়া লাগে, মনে হয় যেন পরিবেশের সঙ্গে যাচ্ছে না। বুদ্ধিমান কৃষক সেই আগাছাকে বেশি বাড়তে দেন না। মূল গাছের সুরক্ষার জন্য সময়মতো সুন্দর করে আগাছাগুলো উঠিয়ে ফেলেন, যার ফলে ফলন ভালো হয়। বর্তমানে এমন আগাছায় ছেয়ে গেছে আমাদের চারপাশ। সর্বত্রই চলছে হাইব্রিড তথা উচ্চ ফলনশীল আগাছার দাপট। হাইব্রিড আগাছার দাপটে মূল গাছেরা অনেকটাই কোণঠাসা। কোনো কোনো জায়গায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে মূল ধারার মানুষগুলো।

কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সর্বত্রই আমাদের রুচির দুর্ভিক্ষের কারণে এই আগাছাদের উত্থান। আর এমনটা যদি চলতে থাকে তবে মূল গাছেরাই একদিন অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। আমাদের যে ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার তা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমরা যদি আমাদের সেই ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাই, তাহলে অবশ্যই অতি দ্রুত আগাছায় ছেয়ে যাওয়া সমাজ থেকে আগাছা দূর করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন মূলধারার দেশপ্রেমিক মানুষগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা, তথা মূল্যায়ন করা।

আরেকটা বিষয় খুবই লক্ষ্যণীয় আমরা স্বীকার করতে চাই না যে, এই কাজটা আমাকে দিয়ে হবে না বা হচ্ছে না। আমরা এটাকে পরাজয় মনে করি এবং এই পরাজয় নিজ স্বার্থের কারণে দেশের ক্ষতি হলেও মানতে চাই না। যেটাকে আমি বলি আমাদের কোনো শেল্ফ অ্যাসেসমেন্ট বা আত্ম মূল্যায়ন নেই বললেই চলে। আমরা সবকিছুর জন্যই নিজেকে উপযুক্ত এবং যোগ্য মনে করি। ফলে সমাজে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হলে আমাদের রুচির পরিবর্তন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের রুচির দুর্ভিক্ষের সুযোগ নিয়ে কোনো আগাছা যেন গজাতে না পারে সেই ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

লেখক : লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত