সোনা চুরি এবং টাকা পাচার

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:৪৯ পিএম

বিদেশ থেকে মূল্যবান জিনিস যা আসে, তার মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দুটি বিষয়। একটি ডলার, অন্যটি সোনা। দুটোই দেশের রিজার্ভ হিসেবে বিবেচিত। ডলার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে প্রথমত, প্রবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা, যা ডলার হিসেবে ব্যাংকে জমা হয়। আর টাকা হিসেবে স্বজনদের হাতে যায়। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি, বিশেষত গার্মেন্টস দ্রব্য রপ্তানি। যদিও গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে ডলারের প্রয়োজন হয়। আর অন্য যে মূল্যবান দ্রব্য সোনা, তার খনি বাংলাদেশে নেই, কিন্তু প্রতিনিয়ত বিমানবন্দরে যে পরিমাণ সোনা আটক হয় এবং বাংলাদেশ যে পরিমাণ সোনা পেয়ে থাকে তাতে বিমানবন্দরকে সোনার খনি বলে মনে হতেও পারে। এখানে যে সোনা পাওয়া যায়, তা খনি থেকে উত্তোলন করতে হয় না। পরিশ্রম করে সংগ্রহ করতে হয় না। বরং সতর্ক থাকলেই সংগ্রহ করা যায়। ডলার এবং সোনা এই দুই সম্পদ নিয়েই চলছে তুলকালাম কাণ্ড। কারণ রপ্তানির মাধ্যমে যে ডলার আসার কথা তার খানিকটা যাচ্ছে পাচার হয়ে আর বিমানবন্দরে ধরা পড়া সোনা লকার থেকে হচ্ছে চুরি।    

সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে,  শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক বিভাগের গুদামে থাকা একটি লকার থেকে ৫৫ কেজির বেশি সোনা চুরি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা যতটা আতঙ্কের তার চেয়েও বেশি সন্দেহের।  টার্মিনাল ভবনের ভেতরে সুরক্ষিত স্থান থেকে কীভাবে এমন চুরির ঘটনা ঘটল? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে খুঁজতে হবে অনেক কিছু আর খুলতে হবে অনেক জট। জানা গেছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের ভেতরে শুল্ক বিভাগে দুটি গুদাম বা লকার আছে। একটি লকার আছে নিচতলায়। শুল্ক বিভাগের স্ক্যানার দিয়ে যাত্রীদের বের হওয়ার পথে তল্লাশি টেবিলের পাশে। এটি ছোট, এখানে মূলত তল্লাশির সময় তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করা পণ্য রাখা হয়। তবে সোনা বা বেশি মূল্যবান সামগ্রী হলে, সেসব নিয়ে রাখা হয় নিচতলায় ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ শাখার পাশেই শুল্ক হাউজের গুদামে। এই গুদামের ভেতর আলাদা লকার রয়েছে। এখানে অনেক লকার থাকলেও, সোনা চুরি হয়েছে একটি লকার থেকে। সেই লকার থেকে ৫৫ কেজি সোনা গায়েব হয়ে গেছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদগুলো থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা থেকে বিষয়টাকে সহজ বা হালকা মনে করার কোনো কারণ নেই।

প্রাথমিকভাবে শুল্ক বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরি হওয়া এসব সোনা ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হয়েছিল। এখানেই বড় প্রশ্ন, এত দিন ধরে এই পরিমাণ সোনা বিমানবন্দরের গুদামে রাখা হয়েছিল কেন?  

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা এক দিনে নয়, বিভিন্ন সময়ে লকার থেকে সোনা সরানো হয়েছে। আর সাধারণ মানুষের ধারণা, ভেতরের লোকজন জড়িত না থাকলে এ রকম ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়।

শুল্ক বিভাগ সূত্র থেকে জানা যায়, বিমানবন্দরের ওই গুদাম পাহারায় ২৪ ঘণ্টায় চারটি পালায় (শিফট) তাদের কর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন। শনিবার সকালে গুদামের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী, গুদামে ঢুকে চিৎকার শুরু করেন। তার চিৎকারে এসে দেখা যায়, লকার ভেঙে সোনা চুরি হয়েছে।  

একজন কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগে গুদামটিতে অটোমেশনের কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজের অংশ হিসেবে গুদামে থাকা সোনা গণনা করা হচ্ছে। তার ধারণা, সোনা চুরির ঘটনা আগেই ঘটেছে। গুদামের অটোমেশনের কাজ শুরু হওয়ায় সেটা ধরা পড়বে; তাই লকার ভাঙার ‘নাটক’ তৈরি করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন শুল্ক বিভাগে যারা কাজ করেছেন, এনবিআরের  কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা হলো,  বিমানবন্দর থেকে চোরাচালানের সোনা উদ্ধার হলে সেটার একটা জব্দ তালিকা করা হয়। তারপর যত দ্রুত সম্ভব সেই সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পাঠানো হয়। তার আগে আরও কিছু দাপ্তরিক কাজ আছে, বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিতে হয়। ব্যাংকের পক্ষ থেকে যেদিন সময় ধার্য করা হয়, সেদিন কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সোনা বাংলাদেশ ব্যাংকে পৌঁছানো হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত এক-দুই দিন লাগে। এর বাইরে যাত্রীদের আনা (ব্যাগেজ রুলের আওতায়) সোনা যদি তারা ঠিকভাবে শুল্ক পরিশোধ করতে না পারেন বা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি সোনা আনেন, তাহলে তা বিমানবন্দর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত ওই গুদামে রাখা হয়। এসব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে, সোনা ছাড়িয়ে নিতে কখনো কারও কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। সাত-আট মাস বা এক বছরও লেগেছে, এমন উদাহরণও আছে। কিন্তু চুরি হওয়া ৫৫ কেজি সোনার মধ্যে দু-তিন বছর আগের সোনাও নাকি ছিল। এত দিন লকারে সোনা রাখাটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়।  

বিমানবন্দর হলো কোনো দেশের সুরক্ষিত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিমানবন্দরের ভেতরের সব জায়গা সিসি ক্যামেরায় নজরদারিসহ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার মধ্যে থাকে। শাহজালাল  বিমানবন্দরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ সরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থা সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আর এত শক্তিশালী নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে গুদাম থেকে সোনা চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে আর কর্তব্য অবহেলার বিষয়টিকে সামনে এনেছে।

বিমানবন্দরে সোনা চুরির পাশাপাশি আর একটি খবর নিশ্চয়ই কারও চোখ এড়িয়ে যায়নি। খবর বেরিয়েছে, দেশের ১০টি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান পোশাক রপ্তানির আড়ালে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮ ডলার বা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। ঘটনাটি জানিয়েছে, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। অধিদপ্তরের দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এই ১০টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান হচ্ছে প্রজ্ঞা ফ্যাশন লিমিটেড, ফ্যাশন ট্রেড, এম ডি এস ফ্যাশন, হংকং ফ্যাশন লিমিটেড, থ্রি-স্টার ট্রেডিং, ফরচুন ফ্যাশন, অনুপম ফ্যাশনওয়্যার লিমিটেড, পিক্সি নিটওয়্যারস লিমিটেড, স্টাইলাইজ বিডি লিমিটেড ও ইডেন স্টাইল টেক্স। অভিনব কায়দায় রপ্তানি জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্যের চালান বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু রপ্তানি আয়ের সেই বৈদেশিক মুদ্রা প্রত্যাবসিত হচ্ছে না, এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তদন্ত করে এই অর্থ পাচারের ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে বলে তারা বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন। এই ১০টি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ২৩৪টি পণ্যচালানে এই জালিয়াতি করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে এ বিষয়ে জানিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো ১ হাজার ২৩৪টি চালানে ৯ হাজার ১২১ মেট্রিক টন রপ্তানি করেছে, যার মূল্য ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮ মার্কিন ডলার (৩০০ কোটি টাকা), কিন্তু এই টাকা দেশে আসেনি। শুল্ক গোয়েন্দারা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যালোচনা করে দেখেছেন, এসব প্রতিষ্ঠান টি-শার্ট, টপস, নারীদের পোশাক, ট্রাউজার, বেবি সেট, পোলো শার্ট প্রভৃতি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, সৌদি আরব, নাইজেরিয়া প্রভৃতি দেশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে রপ্তানি দেখিয়েছে। পণ্য পাঠিয়েছে কিন্তু টাকা আসেনি অর্থাৎ অর্থ পাচার হয়েছে।

আমদানি রপ্তানির ঘাটতি মেটানো, বিদেশি ঋণের সুদ আর আসল শোধ করার জন্য দরকার বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার। এর অন্যতম জোগানদাতা আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিক। এই আয় কমে গেলে দুশ্চিন্তা আর বাড়লে স্বস্তি। কিন্তু আগস্টে দেশে আসা প্রবাসী আয় বেশ বড় পরিমাণে কমেছে। এ মাসে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার, গত বছরের একই মাসে যার পরিমাণ ছিল ২০৪ কোটি ডলার। গত বছরের আগস্ট মাসের তুলনায় এ বছর ২১ দশমিক ৫৬ শতাংশ আয় কম এসেছে। কোনো একক মাসে আয় এত কমে যাওয়ার ঘটনা সম্প্রতি ঘটেনি। প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় না আসা। সরকারিভাবে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু খোলাবাজারে নগদ ডলারের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, গোপনে এবং প্রকাশ্যে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৭-১১৮ টাকায়। খোলাবাজার ও সরকার কর্র্তৃক নির্ধারণ করা দামের মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশি। এর সুযোগ নিচ্ছে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। এত পার্থক্য থাকলে আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে আসা প্রবাসী আয় বাড়বে না। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও ব্যয়ের বোঝা, বিদেশে গিয়ে স্বল্প মজুরিতে কষ্টকর কাজ করে প্রবাসী শ্রমিকরা। ফলে কোথাও দুটো টাকা বেশি পেলে তারা সেদিকে ঝুঁকবেই। তাই বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় আনতে হলে হুন্ডি বন্ধ করতে হবে সরকারকেই।

প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে সংকট বাড়ার আশঙ্কা আছে। এমনিতেই ডলার সংকট নিয়ে চাপে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রতিনিয়ত কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল যে পরিমাণ রিজার্ভ রাখার শর্ত দিয়েছিল বর্তমানে তার চেয়ে কম রিজার্ভ রয়েছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে, ফলে আমদানি দায় মেটাতে ভবিষ্যতে আরও বেশি ডলারের প্রয়োজন হবে। আবার সরকারি-বেসরকারি ঋণ পরিশোধ করার জন্যও ডলারের প্রয়োজন বাড়বে। একদিকে দেশের প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে প্রবাসী আয় কমে যাচ্ছে, অর্থনীতির জন্য ব্যাপারটা উদ্বেগজনক। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, মাথা পিছু আয় বাড়ছে এসব সূচক অর্থনীতির জন্য ভালো। কিন্তু যদি জনগণের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তাহলে অসন্তোষ তীব্র হয়ে ওঠে। যখন বৈষম্য, বেকারত্ব এবং মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে তখন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আর প্রবৃদ্ধির কাগুজে হিসাব তার কাছে হয়ে পড়ে মূল্যহীন। এর সঙ্গে যদি চুরি, দুর্নীতি আর পাচারের ঘটনা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তখন এই প্রশ্ন ওঠা তো স্বাভাবিক, এই চুরি দুর্নীতির বোঝা জনগণ আর কতদিন বহন করবে?

লেখক:  রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত