ডেঙ্গু নিয়ে তামাশা কীর্তন

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৫৯ পিএম

এডিস মশা নিধন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, মশা মারার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের একার না। জনগণকে সম্পৃক্ত করে এই কাজ করা হয়। মন্ত্রী মশাই ভালোই বলেছেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় বা সিটি করপোরেশন মশা মারার বাজেট নেয় কেন? বা খরচ নেয় কেন? জনগণ তো কোনো পয়সা নেয় না। ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব  দেখা দেওয়ার পর সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগের কথা বলেছে। বাস্তবায়ন করতে বড় বাজেট তৈরি করেছে। কিন্তু জনগণ কী করেছে? তাদের হাতে যা ছিল তা নিয়ে মশা মোকাবিলার চেষ্টা করছে। রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডেঙ্গু মশা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি ঘরে মশা তাড়াতে কয়েল, স্প্রে বা লোশন ব্যবহার হচ্ছে। এতে জনগণ কি কোনো বাজেট নিচ্ছে? নিজের রোজগারের পয়সায় মশা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে যাচ্ছে তাদের খরচের হিসাবটা দেখুন? মন্ত্রী মশাই এ টাকার হিসাব করবেন না যে মশা তাড়াতে শহরের একজন মানুষের খরচ কতটা বেড়েছে? আপনারা বাজেট করে বসে আছেন প্রকৃতির ওপর ভরসা করে। বৃষ্টি কমে গেলে মশা কমে যাবে। বড় জোর আর মাসখানেক। অক্টোবর থেকে মশা আপনাআপনি কমে যাবে, এ আশায় তারা আছেন। সিজন শেষে আক্রান্তের হার এমনিতেই কমে যাবে সেখানে সরকারের মন্ত্রণালয় বা সিটি করপোরেশনের কোনো কৃতিত্ব নেই। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতে ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণে  রেখেছে। তারা কিন্তু প্রাকৃতিক নিরোধের ওপর ভরসা করেনি। তারা নানাভাবে চেষ্টা করেছে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য।

মশা নিধনের ফগার মেশিন চালানোর দক্ষতা অর্জনের জন্য গত আগস্টে চারজন সরকারি কর্মকর্তা ও একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জার্মানি সফর করেছেন। তারা সেখানে থার্মাল ফগার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পালসফগে প্রশিক্ষণ নেন। যদিও এই কর্মকর্তারা এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মশানিধন প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত নন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সম্প্রতি ১০০টি ফগার মেশিন কিনেছিল। এসব মেশিন চালাতে এবং ফগার মেশিন পরিচালনার সঙ্গে জড়িতদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এ সফরের উদ্দেশ্য। কিন্তু জরুরি ছিল ডেঙ্গু নিধনে কীটতত্ত্ববিদদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। কিংবা তাদের গবেষণার জন্য সুযোগ তৈরি করা, যা আমাদের দেশে এখনো হয়নি। আর গবেষণা ছাড়া বছর বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা একেবারেই সম্ভব না। যে কথা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ার শুরু থেকে বলা হচ্ছে।

২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে ১৫৬ জনের মৃত্যু ও ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রেকর্ড গড়েছিল। এরপর ডেঙ্গু মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল। সেটা হয়নি। সেখান থেকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত। ওই বছরও ডেঙ্গু নিধনে প্রকৃতির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকেই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুও হয়েছে। মারাত্মক আকার ধারণ করতে শুরু করেছে গত মে থেকে। ওই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের কোটা পেরোয়। এর পরের মাসগুলোতে এ হার লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা দিনক্ষণ ঠিক করে মশা মারার অভিযানে নামেন। ওই অভিযানে মশা নিধনের জন্য ফগার মেশিন নিয়ে যারা  বেরিয়েছিলেন তারা শুধু কর্মকর্তাদের সঙ্গই দিয়েছেন। খবরের কাগজের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন ভবনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা ও জরিমানা আদায়ে দিন পার করেছেন। উত্তর সিটি করপোরেশন সাংবাদিকদের ডেকে অভিযানে নামার ঘোষণা দেয়। সেখানে ড্রোনের সাহায্যে এডিস মশার জন্মস্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এসব উদ্যোগে ফলাফল হলো ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার এবং মৃত্যু দুই-ই বাড়ছে। গত চার মাসে মৃত্যু হয়েছে ৭ শতাধিক মানুষের। আক্রান্ত লাখ ছাড়িয়েছে।

গত মে থেকেই ডেঙ্গু নিধনে নানাবিধ আলোচনা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন বাজেট নিয়েছে। কীটতত্ত্ববিদরা নানা ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু কাকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে? মশা নিধনে মূল দায়িত্ব যাদের তাদের এগিয়ে আসার কথা, সমাধানের পথ বলে দেওয়ার কথা। আমাদের এখানে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। যাদের ডেঙ্গু নিধনের পথ দেখানো হচ্ছে তারা নাকে  তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। তারা জানছেন মৃত্যু বাড়ছে, সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু মশা নিধনের কার্যকর গঠনতান্ত্রিক সমাধানে যাচ্ছেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, সিটি করপোরেশন ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে মশা নিধনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কথা সত্য। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে এটা একার কাজ না। জনগণকে সচেতন হতে হবে। এ কথাও সত্য। কিন্তু আপনার কাজটা যদি আপনি করে ফেলতেন আর তারপরও যদি মশার উপদ্রব বাড়তে থাকত তাহলে মেনে নিতাম, জনসচেতনতার অভাবেই ডেঙ্গু বাড়ছে। সিটি করপোরেশন মশক নিধন অভিযানের নামে যা করছে তা রীতিমতো মশকরা। ঢাকা নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে যদি প্রতিদিন ফগিং করা হতো তাও মশা অনেকাংশে কমে যেত। এ কথা সত্য, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিধন সম্ভব নয়। এ জন্য লার্ভা ধ্বংস করা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের কাছে লার্ভা নিধনের ব্যবস্থা না থাকলে তারা সরকারের কাছে সাহায্য চাইতে পারত। তাও বুঝতাম তারা কিছু করছে।

ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতার উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে সেই মে মাস থেকে। যখন আমাদের দেশে ডেঙ্গু বাড়তে শুরু করে। গণমাধ্যমে পরিষ্কারভাবেই তুলে ধরা হয়েছে , কলকাতা শহর কীভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আমাদের সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীলরা বোধকরি সে জ্ঞানটা নিতে চান না। যে কারণে গবেষণা, কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ বা মশা নিধন ও জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। সিটি করপোরেশনের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, এটা কোনো ব্যাপার না। মশা কামড়ে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে তাতে কী হয়েছে। তা আপনাআপনি কমে যাবে। মেয়র বা ওয়ার্ড কমিশনারদের তো কারও কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না।

চলতি অর্থবছরে (২০২৩-২৪) মশা নিয়ন্ত্রণে ১৬৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর মধ্যে বাজেটে মশা নিধনে ১২১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে ডিএনসিসি। মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা, যন্ত্রপাতি কেনা, ডেঙ্গু মোকাবিলা, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও প্রচার কাজে এই টাকা ব্যয় করবে ডিএসসিসি। অন্যদিকে মশা মারতে চলতি অর্থবছরে ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশক কেনা হবে। বাকি ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা যন্ত্রপাতি কেনা ও পরিবহন খাতে টাকা ব্যয় করা হবে।

মশা ‍নিধন বা নিয়ন্ত্রণে বাজেট তো হলো। কিন্তু করপোরেশনের দায়িত্ব কী পালন হচ্ছে। দুই সিটি মিলে আমাদের ১৭৫ জন ওয়ার্ড কমিশনার রয়েছেন (সংরক্ষিত নারীসহ)। তারা এ সময় কী দায়িত্ব পালন করছেন? বেশির ভাগ ওয়ার্ডের কমিশনার মশা নিধন অভিযানে সম্পৃক্ত হননি। হলে হয়তো ১৫ দিনেই কমে আসত ডেঙ্গুর সংক্রমণ। কলকাতায় তো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তারাই মূল দায়িত্ব পালন করছে। তাহলে আমাদের ওয়ার্ড কমিশনাররা কি ভিনগ্রহ থেকে এসেছেন?

কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন মোট ১৬টি বরো (প্রশাসনিক অঞ্চল) এবং ১৪৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতিটি বরোতে আছে ৭ থেকে ১২টি করে ওয়ার্ড। প্রতিটি ওয়ার্ডে রয়েছে মশা নিয়ন্ত্রণ কমিটি। এতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, চিকিৎসক ও স্থানীয় ব্যক্তিরা রয়েছেন। আছেন ৬ থেকে ১৫ জন মশককর্মী। প্রত্যেক কর্মীর মশা নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ আছে। এসব ওয়ার্ড কমিটির কাছে এলাকার সম্ভাব্য ডেঙ্গুর উৎসস্থলের তালিকা আছে। কলকাতায় প্রতি বছর ১০০ দিনের কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচিতে যুক্ত ব্যক্তিরা ওয়ার্ড পর্যায়ে মশককর্মী হিসেবে কাজ করেন। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি করেন। জুলাইয়ে মশার প্রাদুর্ভাবের মৌসুমে নজরদারি আরও বেড়ে যায়।

এই হলো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কলকাতার প্রস্তুতি। যেটা আমাদের দেশে এখনো ভাবতে পারছি না। জনসচেতনতা বাড়াতে তারাও কাজ করে। একপাড়ার ডেঙ্গু মশা যাতে আরেক পাড়ায় না যেতে পারে তার আগেই তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আর আমরা ঢাকা সিটিতে থাকা ডেঙ্গু মশা পাঠিয়েছি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। বাজেট, উদ্বোধন, ফটোসেশন, দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর বাইরে আমরা কী করতে পারছি?

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত