বাংলা ভাষায় প্রবাদ বাক্যগুলো যেন অভিজ্ঞতার নির্যাস। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতাগুলো তিক্ত, ঘটনাগুলো প্রতারণার এবং ফলাফল বঞ্চনা। তাই প্রবাদ বাক্যগুলো ব্যবহৃত হয় সাধারণত সতর্ক থাকার জন্য। যেমন মুজতবা আলি তার প্রবাসবন্ধু গল্পে আব্দুর রহমান কর্র্তৃক বিপুল খাবারের আয়োজন দেখে যে প্রবাদ বাক্যটি ব্যবহার করেছিলেন তা হলো, কার গোয়াল আর কে দেয় ধোঁয়া। টাকা তার আর খরচ করেছে আব্দুর রহমান। দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের নকশার ভুল দেখে আমাদেরও বলতে হয়, কার ভুল আর কে দেয় মাশুল। দু-একটা প্রয়োজনীয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল আর সরকারি ব্যয় বাহুল্যের বিষয়টা দেখলে এ কথার সত্যতা বুঝতে কারও কষ্টই হবে না।
খাবারের শুরুতে ভর্তা ভাজির মতো খবরের শুরুতেও ছোট ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টা দেখা যাক! সরকারি বৈঠকের খবর থেকেই জানা গেল নকশায় ত্রুটির কারণে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নবগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিতব্য সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৬৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬ কোটি টাকা। সেতুটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। কাজ ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয়নি এবং খরচ বৃদ্ধিও থেমে থাকেনি। পাঁচবার সময় বাড়ানোর পর ষষ্ঠবারের মতো ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে সময় এবং খরচ বেড়ে গেছে ১০০ শতাংশ অর্থাৎ দ্বিগুণ।
রেলপথ উন্নত, আধুনিক করার দাবি জনগণের দীর্ঘদিনের। কুমিল্লার লাকসাম-চিনকি আস্তানা সেকশনে ব্রিটিশ আমলের রেললাইনের সমান্তরালে নির্মাণ করা ৬১ কিলোমিটার মিটারগেজ পথটি ডাবল লাইনে উন্নীত করে ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল চালু হয়। এর জন্য খরচ হয়েছিল ১ হাজার ৮১৯ কোটি টাকা। কিন্তু এর আয়ুষ্কাল না ফুরালেও রেললাইনটি তুলে ফেলতে হবে। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডোরের উন্নয়নে এই সেকশনসহ লাকসাম-পাহাড়তলী রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরে ১৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। মাত্র আট বছরেই পরিকল্পনা পরিবর্তন। শুধু লাকসাম-চিনকি আস্তানা নয়, ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় নির্মিত ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীপুরের টঙ্গী-কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজার মিটারগেজ লাইনটিও এখন তুলে ফেলতে হবে। একশ বছরের পুরনো রেলপথের সমান্তরালে নতুন এই লাইনটি চালু হয়েছিল ২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। এখন টঙ্গী-আখাউড়া রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা খরচ ধরে আরেকটি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে। ডুয়েলগেজে রূপান্তরের দুই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকায় নির্মিত ১২৫ কিলোমিটার মিটারগেজ লাইন বাতিল হবে। আট বছরেই বাতিল হবে সদ্য নির্মিত রেললাইন অথচ রেললাইনের আয়ুষ্কাল কমপক্ষে ৩০ বছর।
খুব বেশি নয়, মাত্র চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এক অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চার হাজার কোটি টাকা কিছুই নয়, তেমনি এক প্রকল্প। গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনে তেল খালাসের জন্য নেওয়া এই প্রকল্পের নাম ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ (এসপিএম)। প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে গত ৩ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে জাহাজ থেকে তেল খালাস শুরু হয়। কিন্তু ৫ ঘণ্টার মধ্যেই দেখা দিল ত্রুটি, বন্ধ হয়ে গেল তেল খালাস। তারপর অন্যান্য প্রকল্পের মতোই এখানে আরও কিছু সংশোধনী যুক্ত করে মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। ত্রুটি সংশোধনের জন্য আরও ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে পরিকল্পনা কমিশনে চতুর্থ সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তাহলে প্রকল্পের মোট বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার ২২২ কোটি টাকা।
সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও কার্গো স্টেশন স্থাপনের জন্য এক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু কাজ শুরুর পর দেখা গেল নকশায় ত্রুটি। কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো সেই ভুল নকশায় কাজ হলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বাড়ার পরিবর্তে কমবে। তাই আবার নতুন করে নকশা পরিকল্পনা করছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক)। ফলে অন্তত দুই বছর পিছিয়ে যাবে বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পটি। এই প্রকল্প অনুযায়ী ৩৪ হাজার ৯১৯ বর্গমিটার আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন, বোর্ডিং ব্রিজ স্থাপন, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, ৬ হাজার ৮৯২ বর্গমিটারের কার্গো ভবন, জেট ফুয়েল ডিপো, কন্ট্রোল টাওয়ারসহ অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে।
২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে কেবল ২২ শতাংশ। বলা হচ্ছে, বিমানবন্দরের পুরো টার্মিনাল ভবনটিই ভুল নকশায় তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলতে গেলে টার্মিনাল ভবন ভেঙে ফেলতে হবে।
জানা যায়, ওসমানী বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পের নকশা তৈরিরকাজ পাওয়া কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান ইয়োশিন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনকে একবার বিশ্বব্যাংক নিষিদ্ধ করেছিল। অস্ট্রেলিয়ার ভানুয়াতুর একটি এভিয়েশন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি ১৩ মাস নিষিদ্ধ ছিল। সে বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়ায় কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানটির ভুলে এবার ভুগতে হচ্ছে বেবিচককে। নতুন নকশা, নতুন বরাদ্দ সেই পুরনো সমাধান। ওসমানী বিমানবন্দরের জন্য নতুন করে নকশা পরিকল্পনা করতে হবে এবং বাড়বে প্রকল্প ব্যয়। ভারতের ট্রান্সশিপমেন্টের পণ্য পরিবহনের জন্য আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের মধ্যে সংযুক্তি বৃদ্ধির জন্য আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে সরাইল, ধরখার হয়ে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫০ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। তিনটি প্যাকেজে মহাসড়কের কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন হাজার ৫৬৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পটির নকশা সংশোধনের ফলে বিভিন্ন প্যাকেজের নির্মাণব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৮৭৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে দুই হাজার ৩০৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
বহুল প্রচারিত বিদ্যুৎ সাফল্যের অন্তরালে ভয়াবহ অপচয় আর গোপন বিষয় নয়, তা প্রকাশ্য হয়েছে সংসদেই। বর্তমান সরকারের তিন মেয়াদে (৩০ জুন পর্যন্ত) প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্র ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ/রেন্টাল পেমেন্ট) পেয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ৮২টি আইপিপি (স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী) এবং ৩২টি রেন্টাল (ভাড়ায় চালিত) বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এই টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তালিকা থেকে দেখা যায়, ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) টাকা বেশি পেয়েছে। সেগুলো হলো বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড সাত হাজার ৪৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা, মেঘনা পাওয়ার লিমিটেড পাঁচ হাজার ৪৭৫ কোটি ১২ লাখ টাকা, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড চার হাজার চার কোটি আট লাখ টাকা, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার লিমিটেড তিন হাজার ৬৪৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, সেমক্রপ এনডব্লিউপিসি লিমিটেড ২ হাজার ৮২৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, এপিআর এনার্জি দুই হাজার ৭৮৮ কোটি চার লাখ টাকা, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড দুই হাজার ৬৮৩ কোটি তিন লাখ টাকা, হরিপুর পাওয়ার লিমিটেড দুই হাজার ৫৫৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, ইউনাইটেড আশুগঞ্জ এনার্জি লিমিটেড দুই হাজার ৩৭৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা এবং বাংলা ট্র্যাক পাওয়ার ইউনিট-১ লিমিটেড এক হাজার ৮৫৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিগত তিন মেয়াদে ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে (রেন্টাল পাওয়ার প্যান্ট) ভাড়া বাবদ দেওয়া হয়েছে ২৮ হাজার ৬৮৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেশি টাকা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো অ্যাগ্রেকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস (৫টি ইউনিট) ছয় হাজার ৪১১ কোটি ২২ লাখ টাকা, অ্যাগ্রেকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস দুই হাজার ৩৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, কেপিসিএল (ইউনিট-২) এক হাজার ৯২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার লিমিটেড এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, অ্যাগ্রেকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস (৮৫ মেগাওয়াট) এক হাজার ৫৫৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা, ডাচ্-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড এক হাজার ৫৩০ কোটি ৯ লাখ টাকা, অ্যাক্রন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেস লিমিটেড এক হাজার ৪৮৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, অ্যাগ্রেকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস (৯৫ মেগাওয়াট) এক হাজার ৪৩৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা, দেশ অ্যানার্জি সিদ্ধিরগঞ্জ এক হাজার ৩৯১ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং ম্যাক্স পাওয়ার এক হাজার ৩০৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। হিসাব কিন্তু সব হাজার কোটিতে! বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে ভাড়া পরিশোধ করার চুক্তির শর্তের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, চুক্তি অনুসারে কেন্দ্র ভাড়া পায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, যাকে ক্যাপাসিটি চার্জ বলা হয়। আর ক্যাপাসিটি থাকুক না থাকুক বোঝা বহন করতে হয় সেই জনগণকেই।
সড়ক, সেতু, রেললাইন, বিমানবন্দর, তেলের পাইপলাইন আর বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ বিষয় আলাদা কিন্তু বিষয়বস্তু এক। দুর্নীতি কথাটা শুনতে খারাপ লাগে সে তুলনায় ভুল পরিকল্পনা, ভুল নকশা, ভুল নীতি বললে অতটা খারাপ শোনায় না, কিন্তু জনগণের যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে যায়। কারণ দিন শেষে দায় জনগণের। প্রথম দায় বাড়তি খরচের জন্য বাড়তি ট্যাক্স দেওয়া, দ্বিতীয় দায় এসব কারণে ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে ভাড়া বৃদ্ধি, মূল্য বৃদ্ধির বোঝা কাঁধে নেওয়া। ভুল নীতি, দুর্নীতি, লুটপাটের ফলাফল মূল্যবৃদ্ধি, বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাংক আইএমএফের চাপ বৃদ্ধি। আমলা প্রশাসনসহ শাসকদের এসব ভুলের মাশুল জনগণ আর কত দিন দিতে থাকবে? জবাবদিহির ব্যবস্থা কি চালু হবে না?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক