বাংলাদেশের বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশটি নতুন মলাটে আইন হিসেবে সম্প্রতি সংসদে পাসের মাধ্যমে আইনে পরিবর্তিত হয়েছে। রাজস্ব আইনের সংস্কারের এ আয়োজন উদ্যোগ সহসা সচকিত নয়, দীর্ঘদিন ধরে চলছিল পরিকল্পনা আর প্রাজ্ঞ পরামর্শকদের প্রয়াস পারঙ্গমতা। রাজস্ব আইন সংস্কারের সব উদ্যোগের আগ্রহ অভিপ্রায়ে কোনো কমতি ছিল না, কিন্তু বিদ্যমান আইনে ‘শতেক শতাব্দী ধরে নামা শিরে অসম্মানভারের’ লাঘব প্রকৃত প্রস্তাবে ঘটছে কি না, সংস্কারকৃত আইন কতটা বাস্তবায়নসম্মত, আয়কর আহরণকারী এবং দাতার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে স্বীকৃত হয়েছে বা হয়েছে কি না সে পর্যালোচনার অবকাশ শেষ হয়নি। কেননা আবনিটি প্রয়োগ ও প্রবর্তনযোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা জানি, যে চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, আইনের প্রয়োগ তেমনি আইনের দৃষ্টিভঙ্গিভেদে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সঙ্গে যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা আছে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে। এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে, তাদের মনোভাব, মনোভঙ্গি সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়ন যোগ্যতার ক্ষেত্রে। কেননা আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আইনপ্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের। আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর সব সময় বা সমভাবে বর্তাবে না, এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে এ আইন নিজের ওপর ততটা নয় যতটা অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়েন প্রতিপক্ষ আইনপ্রণেতা ও প্রয়োগকারী। এই প্রতিপক্ষতার পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধাত্মক। এই প্রেক্ষাপটে আইন উপেক্ষার, অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়; মানুষের কল্যাণেই আইনের প্রয়োজন। মানুষ আগে, আইন পরে। আইন মানুষকে মুক্তির জন্য, তাকে বন্দি বা বিব্রত করার জন্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার আইনের আওতায় স্বীকৃত, নিশ্চিত, নির্ধারিত, নিবন্ধিত হয়ে থাকে। মানুষ তার চিন্তার, বিশ্বাসের, শরীরের, দেহের, চলাচলের, সম্মানের ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও নিরাপত্তা দাবি করতে পারে আইনের কাছে। আইন দৃষ্টিভঙ্গিতে সর্বজনীন এবং প্রয়োগে নিরপেক্ষ হওয়ার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। যে আইন যত সর্বজনগ্রাহ্য, সর্বজনমান্য, সর্বজনবোধ্য, সর্বজন অনুসৃতব্য সে আইন তত কল্যাণকর সে আইন তত কার্যকর।
বাংলাদেশে আগের অধ্যাদেশটির সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে দেখা গিয়েছিল এ আইন ছিল জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রায়োগিক দিক থেকে জটিল, নিবর্তন ও প্রতিরোধাত্মক। এ দেশে ভূমি কর বা রাজস্ব আদায়ের প্রথা প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে চলে এলেও এ দেশে আধুনিক আয়কর প্রবর্তিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে। আমরা জানি, এ দেশ ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। পরবর্তী ১০০ বছরে এ দেশীয় অর্থনীতির স্বনির্ভর সত্তাকে পরনির্ভরকরণ কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এ দেশের শাসনভার কোম্পানির থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয়। ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতে প্রথম ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন (১৮০৫-১৮৬০) তার বাজেট বক্তৃতায় এ দেশে প্রথম আধুনিক আয়কর প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। আয়কর আইন প্রবর্তনের দুই মাসের মাথায় ডিসেন্ট্রিতে কলকাতাতেই মারা যান উইলসন।
প্রথম থেকেই আদায়ের ক্ষেত্রে করদাতাদের প্রতি বশংবদ অদায়িত্বশীল আচরণ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ফাঁকিজুকি, প্রতিরোধাত্মক ঔপনিবেশিক মনোভাব প্রাধান্য পায়। করযোগ্য আয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধিবিধানের ভাষা জটিল ও দ্ব্যর্থবোধক হয়ে ওঠে। ‘তোমার আয় হোক আর না হোক অর্থাৎ বাঁচ-মর রাজস্ব আমার চাই’ এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যম রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতিরও সূত্রপাত ঘটে। দুর্নীতিগ্রস্ততার পরিবেশ সৃষ্টিতে আইনের মধ্যেই যেন রয়ে যায় পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে, যা বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর আয়কর আইনে যেখানে ‘ভারত’ লেখা সেখানে ‘পাকিস্তান’ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ‘বাংলাদেশ’ প্রতিস্থাপন করতঃ প্রবর্তিত হয়। শাসকের ও শাসিতের মধ্যকার হরিজেন্টাল ও ভার্টিক্যাল সম্পর্কের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আয়কর আহরণ-সংক্রান্ত ধ্যানধারণা একই থেকে যায়। ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৬১ সালে সে দেশের রাজস্ব আইনকে নিজস্ব সমাজ ও সময়ের দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পুনর্গঠিত আইন প্রবর্তন করে। আর আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ৩৬ নম্বর অধ্যাদেশ) জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজস্ব আয়কর আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৮৪ সালে। তখন দেশে আইন পরিষদ বিদ্যমান না থাকায় রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ও গণগুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইনটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি হওয়ায় এটির প্রণয়ন ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
দাবি উঠেছে আয়কর অধ্যাদেশের স্থলে আয়কর আইনপ্রণয়নের। ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতিপ্রকৃতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে গেলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় প্রয়োগযোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে তা ধারণ করা ছাড়া সবই মূল ঔপনিবেশিক আইনের ভাব-ভাষা দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার দৃশ্যগোচর হয় না। বরং প্রতি বছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচার কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলির ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃৃতিও সুবিধা-সংক্রান্ত মৌল দর্শন অনেক ক্ষেত্রেই হয়েছে বিস্মৃত। যুগধর্মের সঙ্গে সংগতি রেখে কর নির্ধারণ ও আদায়-সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ সরলীকরণ তথা করদাতাবান্ধবকরণ করা না হলে আইন আরও জটিল হতে পারে।
আর এই নিরিখেই আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি সংস্কারের আওতায় আনা আবশ্যক। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এমন নিরুৎসাহিতবোধের কারণগুলো শনাক্ত করে উপযুক্ত বা প্রযোজ্য পরিবর্তন আনা এবং সংস্কারকৃত সেই আইন প্রয়োগেও রাজস্ব আহরণ বিভাগের মানসিকতার (mindset) সমন্বয় প্রত্যাশিত থেকে যাবে। সহজ ও সর্বজন বোধগম্যতার জন্য এ আইন হতে হবে বাংলা ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় প্রণীত আয়কর আইনের খসড়ার ওপর জন মতামত চাওয়া হচ্ছে। অথচ ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রয়োগ আইন পাসের পর দেশের সব আইন বাংলা ভাষায় প্রণয়নের বিধান রয়েছে।
বিদ্যমান আয়কর আইন স্রেফ পুনর্লিখন এবং কী কী নতুন খাতে কর আরোপ করা হতে পারে (যা প্রতিবছর অর্থ আইনের মাধ্যমে পরিবর্তনযোগ্য) এমন বিষয়কে মতামতের বিষয়ভুক্ত না করে আইনের মৌল দৃষ্টিভঙ্গি তথা দার্শনিকতাকে, দুর্বোধ্য ও দ্ব্যর্থবোধকতাকে, করদাতার দায়িত্ব-কর্তব্য তথা তার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধিবিধানকে, আইন প্রয়োগের প্রাকরণিক ও পদ্ধতি প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত ধারা-উপধারাগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আবহাওয়া ও সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্যতার নিরিখে নির্মাণে মনোযোগী হওয়ার সময় শেষ হয়ে যায়নি।
বাইরের থেকে কোনো আইনের কাঠামো ও ভাষ্য চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস নিকট অতীতেও ছিল। তড়িঘড়ি করে আইন পাস করা হয়ে থাকলে, বাংলা ভাষায় এটি প্রণীত ও পাস হয়েছে ঠিকই, এর ইংরেজি সংস্করণ ও এর আওতায় নীতিমালা পরিপত্রের কাজ বাকি থাকায় এর কার্যকারিতা থমকে যাবে।
এ দেশের আয়কর আইন হবে আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যানধারণার প্রতিফলক, হবে সহজবোধ্য, জটিলতা পরিহারী এবং এর প্রয়োগ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে সর্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। তবেই বাড়বে এর গ্রহণ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা। করদাতা যেন নিজেই নিজের কর ফরম পূরণ, কর নির্ধারণ এবং সরাসরি তা দাখিলে সক্ষম হন। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত করদাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর আদায় নয় কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত অধিকমাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এরূপ পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার মতো স্পর্শকাতরতার অবসান ঘটবে।
লেখক:সাবেক সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান
