জনজীবনে নানাবিধ ব্যয়ের চাপ কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। এর মধ্যেই গ্যাসের মিটারের ভাড়া দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে তিতাস গ্যাস। গ্রাহকের পকেট কেটে মুনাফা আরও বাড়াতে চাইছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাস গ্যাস অনিয়মের চূড়ান্তে উঠেছে। তারা তুঘলকি কর্মকান্ডের স্মারক।
তিতাসের পক্ষ থেকে গ্রাহকদের ৬ লাখ ৫০ হাজার প্রিপেইড মিটার দেওয়ার জন্য ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি এফিসিয়েন্সি ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে প্রতি মাসে গ্রাহকের জন্য মিটার ভাড়া ধরা হয়েছে ২০০ টাকা। অথচ তিতাসেরই আরেক প্রকল্পে মিটার ভাড়া ধরা হয়েছে ১০০ টাকা। নতুন ভাড়ায় আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
যদি ১০০ টাকা ভাড়া ধরা হয়, তাহলে এ প্রকল্পে সাড়ে ছয় লাখ মিটারে প্রতি মাসে ভাড়া আসবে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০০ টাকা হলে ভাড়া আসবে ১৩ কোটি টাকা। বছরে ভাড়া আদায় হবে ১৫৬ কোটি টাকা। পুরোটাই যাবে গ্রাহকের পকেট থেকে।
মিটার ভাড়া দ্বিগুণ করার যুক্তি কী জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিটারের দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ১০ বছরের লাইফ। তাহলে কত ভাড়া ধরব? শুধু মিটারের চুক্তিমূল্যই হিসাব করা হয় না, এটার সার্ভারের চার্জ আছে, অন্য চার্জও আছে।’
প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জালালাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। এ প্রকল্পের প্রি-পেইড মিটারের চুক্তিমূল্য ছিল ১৫ হাজার ৮৭৩ টাকা। তিতাসের প্রস্তাবিত প্রকল্পে মিটারের চুক্তিমূল্য ১০ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে তুঘলকি কান্ড চলছে। এর আগে রাষ্ট্রপতি মিটারের ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন দিয়েছিলেন। এখন আবার পরিকল্পনা কমিশনের কাছে আবদার করা হয়েছে। রামরাজত্বেও এসব ঘটেনি।’
তিনি বলেন, ‘তিতাসের আর আয়ের দরকার নেই। তার আয় বেশি হয়ে গেছে। মন্ত্রণালয়, সচিবসহ সবাই তাদের মদদ দেয়। কারও কাছে তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। আইন থাকুক আর না থাকুক, ভাড়া বাড়িয়ে তার আরও বেশি আয় করতে হবে। মন্ত্রণালয়ও হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে।’
পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প শক্তি বিভাগের উপপ্রধান বলেছেন, প্রস্তাবিত প্রকল্পের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত চুক্তিমূল্য বাদ দিতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি মোট ২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকার। এর মধ্যে সরকার দেবে ৩২৩ কোটি, বৈদেশিক ঋণ ১ হাজার ৯৪৫ কোটি ও নিজস্ব অর্থায়ন ১৫ কোটি টাকা। এটি বাস্তবায়িত হবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে। গত ২ আগস্ট প্রকল্পটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) হয়েছে।
পিইসি সভায়, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) ব্যবস্থাপক প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘বিদ্যমান সিস্টেমে আবাসিক গ্রাহক পর্যায়ে বিভিন্নভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। কিছু অসৎ গ্রাহক অননুমোদিত সরঞ্জামের মাধ্যমে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গেও জড়িত। এটি গ্যাসের অপচয় ও সিস্টেম লসের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রিপেইড গ্যাস মিটার ব্যবহার করে দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবাসিক খাতে গ্যাসের অপচয় রোধ করে সিস্টেম লস কমানো সম্ভব হবে।’
সভায় জানতে চাওয়া হয়, তিতাস অধিভুক্ত এলাকায় সিস্টেম লস কত শতাংশ। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কী পরিমাণ সিস্টেম লস কমানো যাবে। এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি তিতাস।
তিতাসের উপমহাব্যবস্থাপক জানান, সিস্টেম লস-সংক্রান্ত কোনো জরিপ করা হয়নি। হালনাগাদ তথ্যও তিতাসের হাতে নেই। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতি গ্রাহকে মাসে ২৬ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে গ্রাহক পর্যায়ে মাসিক মিটার ভাড়া ধরা হয়েছে ২০০ টাকা। পিইসি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, চলমান অন্য প্রকল্পে ১০০ টাকা ভাড়া ধরা হয়েছিল, এ প্রকল্পেও তা-ই করতে হবে।
তিতাস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিতাসের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৬৩ হাজার। পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহককেই মিটারিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বর্তমানে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের জাইকার অর্থায়নে দুটি প্রকল্পে মিটারিং কাজ চলমান আছে। এডিবির অর্থায়নে ইতিমধ্যে ৮ হাজার ৬০০টি ও জাইকার অর্থায়নে বসানো হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার মিটার। জাইকার অর্থায়নে চলমান প্রকল্পের আওতায় আরও ১ লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপনের লক্ষ্যে প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে আরও ১১ লাখ মিটার স্থাপন প্রক্রিয়াধীন।
কর্মকর্তারা আরও জানান, নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে মিটার স্থাপনের মাধ্যমে আবাসিক এলাকার ৮১ দশমিক ৭৯ শতাংশ গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া ৬০ থেকে ৪০ টাকা বাড়িয়ে এক লাফে ১০০ টাকা করেছিল তিতাস। বাসাবাড়িতে গ্যাসের প্রিপেইড মিটার স্থাপন শুরু হয় ২০১৭ সালে। ২০১১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে তা শুরু হয়েছিল। শুরুতে সরকারের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর বেশ আগ্রহ ছিল মিটার স্থাপনে; আস্তে আস্তে মিটার স্থাপনে দীর্ঘসূত্রতা শুরু হয়। এখন আবেদন করেও মিটার পায় না গ্রাহক।
প্রিপেইড মিটারে গ্যাসের অপচয় রোধ, গ্রাহকের খরচ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা প্রায় প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই জাইকার সহায়তায় প্রিপেইড মিটার বসানো শুরু করে তিতাস গ্যাস।
