রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। তবে বিদায়টা হলো অনেকটা আকস্মিক ও নীরবে। ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনা, জাতির উদ্দেশে কোনো ভাষণ কিংবা রাষ্ট্রীয় আয়োজন। জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পদত্যাগপত্র পাঠানোর মধ্য দিয়ে বঙ্গভবনের অধ্যায়ের ইতি টানলেন তিনি।
বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সাহাবুদ্দিনের বিদায় নেওয়ার বিষয়টি কয়েক দিন আগেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। এরপরও গত সপ্তাহে তিনি নিয়মিত অফিস করেছেন। পদত্যাগের আগের দিন বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১০০-এর বেশি নথির সামারিতে সই করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথি ছিল ৬০টির বেশি।
বঙ্গভবনের আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মো. সাহাবুদ্দিন অন্যান্য দিনের মতো গতকাল শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করেন। এরপর তিনি দুপুরে জুমার নামাজ আদায় করেন। বিকেল ৪টার দিকে তিনি পদত্যাগপত্রে সই করে সেটি স্পিকারকে পাঠাতে তার সামরিক সচিব ও ব্যক্তিগত সচিবের (পিএস) কাছে হস্তান্তর করেন। পদত্যাগপত্র স্পিকারকে পাঠিয়ে দেওয়ার পর তিনি বিশ্রাম নিতে যান।’
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে গুরুতর অসুস্থতাজনিত শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কথা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে গতকাল একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘এটা তো সর্বজনবিদিত, আমার মুখ থেকে শুনে কী লাভ? আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান।’ বঙ্গভবনের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, মো. সাহাবুদ্দিন আজ শনিবার বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এরপর আগামীকাল বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানের নিজ বাসায় উঠবেন।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল মো. সাহাবুদ্দিন পাঁচ বছরের জন্য দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সে হিসাবে তার মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় পৌনে দুই বছর আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে নানান ঝড়ঝাপটা ও বিতর্কের মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময় তিনি দায়িত্বে থাকতে সক্ষম হন। অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, বিচার বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, নির্বাচনপরবর্তী বিএনপি সরকারের শপথ এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক নিয়োগ সবই তার দায়িত্বপালনকালে ঘটেছে। এসব কারণে তার মেয়াদকালকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত সাংবিধানিক হলেও দেশের বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এ পদটির প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। সে কারণে তার পদত্যাগও রাজনৈতিকভাবে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
বিচারকের আসন থেকে বঙ্গভবন : মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পাবনার শিবরামপুরের জুবলি ট্যাংক এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হয়ে আইন পেশায় কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিচার) ক্যাডারে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। পরে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবসরের পর তিনি সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী হিসেবে আইন পেশায় কাজ শুরু করেন। ২০১৬ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার নিযুক্ত হন। সবশেষ তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।