বিশ্ব অর্থনীতির এক-চতুর্থাংশের নিয়ন্ত্রণকারী পাঁচ দেশের জোট ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে আরও ছয় দেশ। বিকাশমান পাঁচ অর্থনীতির জোটের ১৫তম সম্মেলনের শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার আর্জেন্টিনা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ব্রিকসের বর্তমান চেয়ার এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার জানিয়েছেন, দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তারা ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকেই ব্রিকসের সদস্য হতে পারবে।
জোটটি সম্প্রসারণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা গতকাল এলেও সম্মেলনের শুরু থেকেই ব্রিকস সম্প্রসারণের সম্মতি আসতে শুরু করে সদস্য দেশগুলোর নেতাদের থেকে। সম্মেলন শুরুর আগে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে গঠিত অর্থনৈতিক জোটটির সম্প্রসারণ ও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না তা নিয়ে ভারত ও ব্রাজিল সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় থাকলেও বুধবার তা কেটে যায়। দুই দেশের নেতাই জোট সম্প্রসারণের পক্ষে মতামত দেন।
এর আগে গত জুনে অনুষ্ঠিত জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমের আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চায় ব্রিকস। সেজন্য তারা তেল উৎপাদনকারী দেশসহ নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী। অন্যদিকে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোতে এখনো বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ এখনো জোটের পাঁচ দেশের। সে কারণে একদিকে শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে থাকা, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়েছিল ৪০টি দেশ।
এদিকে সম্মেলন শুরুর দিনই জোটের সদস্য দেশগুলো অগ্রিম ঋণের ক্ষেত্রে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলনে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে পরিচিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ।
সম্মেলনে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাও ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য নিজস্ব মুদ্রা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। তার যুক্তি, ডলারের বিনিময় হার সব সময়ই ওঠানামা করে, তাই ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো একটি নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন করতে পারে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বাস করেন না যে ডলার ব্যবহার করে না, এমন দেশগুলোকে বাণিজ্যে ডলার ব্যবহারে বাধ্য করা উচিত। এ ছাড়া তিনি দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর ব্লকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও অভিন্ন মুদ্রা ব্যবহারের কথা বলেন।
ব্রিকস সম্মেলনের প্লেনারি অধিবেশনে তিনি বলেন, ব্রিকসের মুদ্রা থাকলে আমাদের যেমন অর্থ পরিশোধের নানা পথ তৈরি হবে, তেমনি আমাদের অনিশ্চয়তাও কমবে।
যদিও জোটের এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, ব্রিকসভুক্ত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পার্থক্যের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি চ্যালেঞ্জের হবে।
এদিকে জোটের আরেক সদস্য দক্ষিণ আফ্রিকার নেতারাই বিষয়টি নিয়ে খোলাসা করে কিছু বলেননি। ভারতের ভাষ্য, এ বিষয়ে আরও আলাপ-আলোচনার দরকার। আর রাশিয়ার চাওয়া ডলারের বিপরীতে জাতীয় মুদ্রায় ব্যবসা-বাণিজ্য করা যায় কি না তার সম্ভাব্য দেখা। অবশ্য লুলার প্রস্তাবের পক্ষে প্রচ্ছন্ন মত দিয়েছে চীন। ব্রিকসের সব দেশের মূল বাণিজ্য অংশীদার দেশটির সিদ্ধান্তই বাকি দেশগুলোর মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গত বছর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে যায়। রাশ টানতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভসহ অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকনীতি সুদহার বৃদ্ধি করে যার পরিপ্রেক্ষিতে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যায়। সে কারণে অনেক দেশ এখন ডলার পাশ কাটিয়ে ভিন্ন মুদ্রায় বাণিজ্যের চেষ্টা করছে। সে কারণেই লুলার প্রস্তাবে ব্রিকস ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নতুন মুদ্রাব্যবস্থা চালুর সুযোগ নিতে পারে বলেই অনেকে মনে করছেন।
