আবারও কয়লা মজুদ ঝুঁকিতে পায়রা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩, ০৪:৪৩ এএম

পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আগে ৪৫ থেকে ৫০ দিনের কয়লা মজুদ থাকলেও তা এখন নেমে এসেছে পাঁচ-ছয় দিনে। একটা জাহাজের কয়লা খালাস করে তা মজুদের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে ‘অনেকটা দিন আনা দিন খাওয়ার’ মতো করে আমদানিকৃত কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য এই কেন্দ্রটিতে।

সময়মতো সরকারের অর্থ ছাড় না হওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা বলছেন, মজুদ সংকটের কারণে কেন্দ্রটি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। কোনো কারণে আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লার জাহাজ আসতে দেরি হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কয়লা সংকটের কারণে এর আগে কেন্দ্রটি একবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এড়াতে কেন্দ্রটির বকেয়া দ্রুত পরিশোধ করে কয়লার মজুদ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চললে প্রতিদিন ১৩-১৪ হাজার টন কয়লা লাগে। ইন্দোনেশিয়া থেকে জাহাজে করে কয়লা আমদানি করে চট্টগ্রামে আনা হয়। প্রতি জাহাজের ধারণক্ষমতা ৪০ থেকে ৫৫ হাজার টন। নাব্য সংকটের কারণে ছোট জাহাজের মাধ্যমে ৩৫-৪০ হাজার টন কয়লা আনা হয় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ কয়লা কেন্দ্রে পৌঁছতে ও খালাস করতে আরও বেশি সময় লেগে যায়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে কেন্দ্রটিতে অন্তত ৪৫ থেকে ৫০ দিনের জন্য প্রায় ৬ লাখ টন কয়লা মজুদ রাখা হতো আগে। যাতে কোনো কারণে কয়লা আসতে দেরি হলেও মজুদ কয়লা দিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়লা মজুদের জন্য কেন্দ্রটিতে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন সক্ষমতার চারটি কোল ডোম রয়েছে। কিন্তু সব মিলে কয়লার মজুদ ৯০ হাজার টনের নিচে নেমেছে। তিন দিন পরপর ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে খালাস করা হচ্ছে। এ কয়লা দিয়ে বড়জোর তিন দিন বিদ্যুৎকেন্দ্র চলে। এর মধ্যে আবার কয়লার জাহাজ আসে। কোনো কারণে একটা জাহাজ সময়মতো না এলে পূর্ণ ক্ষমতায় কেন্দ্রটি চালানো সম্ভব হবে না।

দুই ইউনিটের ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটির মালিক বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে গঠিত বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। ২০২০ সালে কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর থেকে কয়লা সংকটের কারণ ছাড়া এক দিনের জন্যও এটি বন্ধ হয়নি। কেন্দ্রটিকে দেশের মডেল বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহ আবদুল হাসিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে একটা সংকট ছিল। কিন্তু তা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। বর্তমানে কয়লার মজুদ আছে ৮৪ হাজার টন। শিগগির মজুদ ১ লাখ টনের ওপরে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি। তবে আগের অবস্থায় যেতে সময় লাগবে।’

তিনি বলেন, ‘রুটিন অনুযায়ী ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রের (মেজর মেইনটেনেন্স) বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শুরু হবে। তখন পর্যায়ক্রমে একটি ইউনিট বন্ধ রেখে অন্যটি চালু রাখা হবে। দুটি ইউনিটের মেইনটেনেন্স করতে চার মাস সময় লাগবে। সময়মতো অর্থ পাওয়া গেলে এবং কোনো ধরনের সংকট না থাকলে ওই সময় ৫ থেকে ৬ লাখ টন কয়লা মজুদ করা সম্ভব হবে। তার আগে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে কাক্সিক্ষত কয়লার মজুদ করা দুরূহ।’

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচ কম। পিডিবির কাছে কেন্দ্রটির বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে পায়রার কয়লা আমদানি ব্যাহত হলেও বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকদের বকেয়া ঠিকই পরিশোধ করা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অন্তত দুই মাসের কয়লা মজুদ রাখতে হয়। যাতে কোনো কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘœ হলে ওই মজুদ থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা যায়। কিন্তু পায়রাতে অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় কয়লা মজুদ করা সম্ভব হচ্ছে না। একটা কয়লার জাহাজ আসছে। আবার সেটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা জাহাজ এসে পৌঁছাচ্ছে। এভাবেই চলছে। এতে করে রিস্ক (ঝুঁকি) আছে। কোনো কারণে যদি এ সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে কেন্দ্রের উৎপাদন কমাতে হবে অথবা বন্ধ করতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিডিবির কাছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের যে বকেয়া আছে, তা দিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ এ টাকাটা যদি তারা না পায়, তাহলে তো তারা কয়লাও কিনতে পারবে না।

ডলার সংকটে কয়লা আমদানির বিশাল বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় পায়রায় কয়লা সরবরাহ বন্ধ করে দেয় ইন্দোনেশিয়ার কোলমাইনিং কোম্পানি। কয়লা আমদানির বকেয়া দীর্ঘদিন পরিশোধ করতে না পারায় গত ১৩ এপ্রিল কয়লার এলসি প্রদান বন্ধ করে চিঠি দিয়ে বিষয়টি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে জানায় সিএমসি।

এদিকে বকেয়া না পেয়ে গত ২৭ এপ্রিল সিএমসি ইমেইলের মাধ্যমে বিসিপিসিএল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তাগাদা দেয়। ওইদিনই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমানকে চিঠি পাঠান বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সংকট সমাধানে বিদ্যুৎ সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠিতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।

পায়রা কর্তৃপক্ষ বকেয়া পরিশোধের জন্য দফায় দফায় সোনালী ব্যাংক (বিসিপিসিএলের অ্যাকাউন্ট ব্যাংক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতার জন্য যোগাযোগ করে। তবে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান যথাসময়ে নিশ্চিত করতে পারেনি।

তবে ডলারের সংস্থান না হওয়ায় কয়লা আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। পায়রা চলতে থাকে মজুদ কয়লার ওপর। এরপর গত ২৫ মে জ¦ালানি সংকটে পায়রার ৬৬০ মেগাওয়াটের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট কয়লা দিয়ে একই সক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটটি কিছুদিন চলার পর উৎপাদন বন্ধ হয় ৫ জুন দুপুরে।

কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। জনদুর্ভোগের পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়।

কেন্দ্রটি বন্ধের পর প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার বকেয়ার মধ্যে সরকার জুন মাসের শুরুতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা করে দিলে আবার কয়লা আমদানি করে ২৫ জুন কেন্দ্রটির একটি ইউনিট পুনরায় উৎপাদনে ফেরে। কয়লার চালান আসা বাড়তে থাকলে কিছুদিন পর চালু হয় দ্বিতীয় ইউনিট। পরে ডলারের ব্যবস্থা করে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধ করা শুরু হলে আবার কয়লা সরবরাহ শুরু করে মাইনিং কোম্পানি। কিন্তু কয়লার মজুদ আগের জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত