থাইরয়েড— বেশি আক্রান্ত নারী ও শিশু

আপডেট : ২৫ মে ২০২৩, ০৯:৪১ এএম

দেশে ঠিক কতসংখ্যক মানুষ থাইরয়েড রোগে আক্রান্ত, এ-সংক্রান্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। যেহেতু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপন ও রোগের ধরনের মিল আছে, তাই রোগটির পরিস্থিতি বুঝতে সে দেশের পরিসংখ্যান অনুসরণ করছেন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। সে হিসাবে বাংলাদেশে চার কোটির মতো থাইরয়েড রোগী আছে। সব বয়সী ও শ্রেণির মানুষের এই রোগ হয়। তবে নারীদের মধ্যে বেশি হয়।

এমন তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও থাইরয়েড টাস্কফোর্সের সমন্বয়ক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অধিকাংশ রোগী, অর্থাৎ মোট রোগীর চার ভাগের তিন ভাগ এখনো শনাক্তকরণের আওতার বাইরে। আর চিকিৎসা পাচ্ছে মাত্র ২৫ শতাংশ রোগী। চিকিৎসা দূরে থাক, বাকি ৭৫ শতাংশ শনাক্তকরণের বাইরেই রয়ে গেছে। সে হিসাবে কোনোভাবেই ১ কোটির বেশি রোগী চিকিৎসা পাচ্ছে না।

থাইরয়েড রোগের এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, রোগটি শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কারণ মানুষ সচেতন না। সচেতনতার অভাবের মূলে রয়েছে এই রোগের লক্ষণগুলো দ্রুত দেখা দেয় না। বাংলাদেশের মানুষ নিজ থেকেই আগ্রহী হয়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করাবে, সে মনোভাব তৈরি হয়নি। সরকারি কোনো তাগিদও নেই।

এ ব্যাপারে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘এখনো আমরা বাংলাদেশে কতজন থাইরয়েড রোগী আছে, সেটা জানি না। কারণ পরীক্ষা করা হয়নি। পরীক্ষা করলেই বোঝা যেত রোগীর সংখ্যা কত বা পরিস্থিতি কেমন। এমনকি থাইরয়েড রোগীর প্রধান অংশ হাইপোথাইরয়েডিজম, আমেরিকার মতো দেশেও এ ধরনের ৬০ শতাংশ রোগী শনাক্ত হচ্ছে না। অন্য কোনো রোগে চিকিৎসকের কাছে গেছে, তখন দেখা যাচ্ছে সে হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত। বাংলাদেশে এই সংখ্যা কম হবে না; বরং বেশি হবে। কারণ এর লক্ষণ দেরিতে প্রকাশ পায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ‘শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ এর সমাধান করতে পারবে বলে মনে করি না। সবাই মিলে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা অনেক কিছু জানি না। অনেক ক্ষেত্রে ধারণার ওপর কাজ করছি। জাতীয়ভাবে একটা জরিপ হওয়া উচিত। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে থাইরয়েড সমস্যা কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেটা ভাবতে হবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এই সমস্যার ক্ষেত্রে সফলতা আসবে।’

হরমোনের কারণেই থাইরয়েড

এ ব্যাপারে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘থাইরয়েড গলার সামনের দিকে হরমোন তৈরিকারী একটি গ্রন্থি। এই গ্রন্থিতে হরমোনের তারতম্যের কারণেই মূলত রোগটি দেখা দেয়। থাইরয়েড রোগ তিন ধরনের- হরমোনের তারতম্য, গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া, অথবা ক্যানসার হওয়া। অধিকাংশ রোগীর থাইরয়েডে হরমোন কম তৈরি হয়, হরমোনের ঘাটতি থাকে। আবার কারও কারও বেশি থাকে। এই বেশি হরমোনও মারাত্মক শারীরিক সমস্যা তৈরি করে। আরেকটা হলো অনেকের গ্রন্থিটা আস্তে আস্তে বড় হয়ে যায়, ঘ্যাগ হয়। আরেকটি হলো থাইরয়েডে ক্যানসার হয়। এটার সংখ্যা অবশ্য খুবই কম।

তিনি জানান, থাইরয়েড গ্রন্থিতে হরমোন কম তৈরি হলে হাইপোথাইরয়েডিজম রোগ দেখা দেয়। এ ধরনের রোগী বাংলাদেশে বেশি। এতে ওজন বেড়ে যাওয়া, শরীর ফুলে যাওয়া, কাজকর্মে অনীহা, দুর্বল লাগা এবং নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিক, বারবার অ্যাবরশন বা প্রসবের আগেই সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়া ও বন্ধ্যত্ব-এ ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যা এসব ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং করতে গিয়ে থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়ে। অন্যদিকে থাইরয়েড থেকে যদি অতিমাত্রায় হরমোন তৈরি হয়, তাহলে অনেক বেশি ক্ষুধা লাগে। তারপরও ওজন কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, পেটের সমস্যাসহ অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধি কম হলে, বুদ্ধি কম হলে, বিকলাঙ্গ হলে থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা করা উচিত।

বেশি আক্রান্ত নারী ও শিশু

ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘আমাদের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, বিএসএমএমইউতে সন্তান প্রসবে ভর্তি হওয়া গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ৮ দশমিক ৪ শতাংশের হাইপোথাইরয়েডিজম আছে- এটা খুবই উদ্বেগের ব্যাপার। ঢাকার বাইরে এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তারা জানত তাদের থাইরয়েডের সমস্যা নেই। কিন্তু ভর্তির পর জানা গেল তারা থাইরয়েডে আক্রান্ত।’

এ ছাড়া এমন কিছু পেশা আছে, যে পেশার লোকজনদের প্রচুর চাপ নিতে হয়, তাদেরও এই রোগের আশঙ্কা বেশি বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, এই শ্রেণির মানুষের আস্তে আস্তে কর্মক্ষমতা কমে আসে। চাকরি করতে পারেন না। চাকরি হারানোর পর দেখা গেল তার থাইরয়েডের সমস্যা। অথচ আগে থেকেই যদি তার থাইরয়েড শনাক্ত করা যেত এবং ঠিকমতো ওষুধ খেতেন, তাহলে তার কর্মক্ষমতা থাকত ও চাকরি হারাতেন না।

এই চিকিৎসক বলেন, বিশেষ করে যে সব নারী সন্তান নিতে চাইছেন, কিন্তু সন্তান হচ্ছে না, বন্ধ্যত্ব দেখা দিয়েছে। আবার অনেক নারীর বারবার তার সন্তান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাসিক অনিয়মিত হচ্ছে। সন্তান প্রসব করতে পারছেন না। থাইরয়েডের কারণেই এমনটা হচ্ছে। যারা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, তাদের পরীক্ষা করে দেখা গেল থাইরয়েডের সমস্যা। আরেক গ্রুপ আছে, যেসব বাচ্চা পড়ালেখায় স্কুলে ভালো করছে। কিন্তু আস্তে আস্তে খারাপ করতে শুরু করল। পরে দেখা গেল থাইরয়েডের কারণে সে পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারছে না।

ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, এমন কোনো শ্রেণি নেই, যেখানে থাইরয়েডের কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। যদি এই শ্রেণির মানুষের আগেই রোগটা শনাক্ত করা যেত ও চিকিৎসা দেওয়া যেত, তাহলে তাদের এই সমস্যায় পড়তে হতো না।

চিকিৎসা ও শনাক্ত সহজলভ্য এবং সাধারণ

বিএসএমএমইউর এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশে রোগটির পর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থা আছে এবং অন্যান্য দেশের তুলনায় চিকিৎসাপদ্ধতি ভালো। হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা খুবই সাধারণ। সকালে নাশতার এক ঘণ্টা আগে একটা ট্যাবলেট খেতে হয়। মাঝে মাঝে পরীক্ষা করে দেখবে হরমোন ঠিক আছে কি না। এই চিকিৎসায় আজীবন ভালো থাকবে। বাইরে থেকে যে হরমোন দেওয়া হয় এবং ট্যাবলেট খেয়ে ভেতরে যে হরমোন তৈরি হয়, দুটোই একই কাজ করে। ওষুধও খুব সস্তা। শুধু সচেতনতার ঘাটতির কারণে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

হাইপোথাইরয়েডিজম শনাক্তের পরীক্ষাও বাংলাদেশে ভালো বলে জানান চিকিৎসকরা। তারা বলেন, সরকারিভাবে পরমাণু শক্তি কমিশনের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকার ভর্তুকি দেয় ও খুব সস্তায় পরীক্ষা হয়। রেডিও আয়োডিন থেরাপিও খুব সস্তা। এই পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে যাদের থাইরয়েডে অতিরিক্ত হরমোন তৈরি হচ্ছে, সেই হরমোন তৈরির কোষগুলোকে মেরে ফেলে। স্বল্পমূল্যে করা যায়। দেশে এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড হাসপাতাল), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ডিসেম্বরে চালু হবে), ঢাকার বাইরে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রংপুর, বরিশাল, ‍খুলনাসহ সব মেডিকেল কলেজে আলাদা সেন্টার আছে।

নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগের পরামর্শ

ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, সরকারের উচিত জন্মসনদে থাইরয়েড লিপিবদ্ধ করা। স্কুলে ভর্তির আগে শিক্ষার্থীর থাইরয়েড পরীক্ষা করতে হবে। যেকোনো চাকরিতে ঢোকার আগে শারীরিক পরীক্ষার সনদে থাইরয়েড যুক্ত করতে হবে; বিশেষ করে সন্তান নেওয়ার আগে নারীদের অবশ্যই থাইরয়েড পরীক্ষা করতেই হবে। তা না হলে সন্তান নিতে গিয়ে ব্যর্থ হবেন। এই পদক্ষেপগুলো নিলে অধিকাংশ রোগী শনাক্তের আওতায় চলে আসবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত