প্রথম বেসরকারি ব্যাংক

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ০১:০৫ এএম

সরকারি ব্যাংকের হয়রানি থেকে গ্রাহকদের সুরক্ষা দিয়ে দ্রুততম সময়ে সেবা নিশ্চিত করতে গড়ে ওঠে আরব-বাংলাদেশ (এবি) ব্যাংক লিমিটেড, দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক। ব্যাংকটির জন্মকথা ও যাত্রাপথের বিবরণ তুলে ধরেছেন আলতাফ মাসুদ

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী মোর্শেদ খান। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ১৯৮০ সালে ব্যাংকিং সেবা পেতে একটি সরকারি ব্যাংকে যান তিনি। কিন্তু দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়েও কাক্সিক্ষত সেবা পাননি। এমন পরিস্থিতিতে সেদিনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন বেসরকারি খাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার, যাতে গ্রাহক খুব সহজেই কোনো ঝামেলা ছাড়াই কাক্সিক্ষত সেবা পেতে পারেন। এরপর ১৯৮১ সালের ৩১ ডিসেম্বর এবি ব্যাংক (তৎকালীন আরব-বাংলাদেশ ব্যাংক) গঠন করেন মোর্শেদ খান। গ্রাহকদের কাক্সিক্ষত সেবা ও আর্থিক খাতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালের ১২ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে শাখা উদ্বোধনের মাধ্যমে এবি ব্যাংকের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়।

এভাবেই মোর্শেদ খানের হাত ধরে দেশে প্রথম বেসরকারি ব্যাংক গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে বেক্সিমকো গ্রুপের চেয়ারম্যান সোহেল এফ রহমানকে সঙ্গে নেন মোর্শেদ খান। ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন জোগানে আরও দুই ব্যবসায়ীকে অংশীদার হিসেবে নেন। তারা হলেন- এলিট পেইন্টের সিরাজউদ্দিন আহমেদ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আবুল খায়ের লিটু। মধ্যপ্রাচ্যের একটি ব্যবসায়িক গ্রুপকেও সঙ্গে নেওয়া হয়। এ কারণেই ব্যাংকটির নামকরণ করা হয় আরব বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার পঁচিশ বছর পর ২০০৭ সালে আরব বাংলাদেশ ব্যাংকটির পুনরায় নামকরণ হয় এবি ব্যাংক লিমিটেড। দেশের ব্যাংকিং খাতে আধুনিক সেবার অনেক ধারণা এবি ব্যাংকের হাত ধরে এসেছে। দক্ষ ব্যাংকার  তৈরিতেও ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার সোহেল এফ রহমান ও আবুল খায়ের লিটু পরবর্তীতে তাদের মালিকানা ছেড়ে দেন। আরেকজন উদ্যোক্তা সিরাজউদ্দিন আহমেদ মারা যাওয়ার পর তার ছেলেরা ব্যাংকের মালিকানায় যোগ দেন। বর্তমানে মোর্শেদ খান ও সিরাজউদ্দিন আহমেদের পরিবার এবি ব্যাংকের উদ্যোক্তা শেয়ারের অধিকাংশের মালিকানায় রয়েছেন। পরিচালনা পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যই এই দুই পরিবারের মনোনীত।

দেশে বেসরকারি ব্যাংকের যাত্রা মোর্শেদ খানের হাত ধরে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে আরও অনেক উদ্যোক্তা এ উদ্যোগে শামিল হয়েছেন। বর্তমানে দেশে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১টিতে। গত বছর বেসরকারি খাতে আরও তিনটি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকের বিকাশ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে দেশের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে ব্যাংক খাত। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বাংকিং খাতের আওতা ক্রমশ বাড়ছে। ১৯৮০ সালে মোট দেশজ উৎপাদনে (ডিজিপি) ব্যাংকিং খাতের অবদান ছিল দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৮ সালে এর অবদান ১৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যে জিডিপিতে ২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতের অবদান ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

মোর্শেদ খানের হাতে জন্ম নেওয়া বেসরকারি ব্যাংক এখন দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের বিকাশে প্রধান ভূমিকা রাখছে এসব ব্যাংক। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী এখন এসব প্রতিষ্ঠান। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্প-কারখানায় বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে দেশের উন্নতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে দেশের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতেও ব্যাংক নেপথ্যে কাজ করছে।

সামাজিক দায়বদ্ধতায়ও ব্যাংকগুলোর ভূমিকা প্রশংসনীয়। মেধাবৃত্তি প্রদান, হাসপাতাল ক্লিনিক নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম ব্যাংকগুলো পরিচালনা করছে। এছাড়াও ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় স্পন্সর করছে বিভিন্ন ব্যাংক। দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহায়তায়ও ব্যাংকগুলো অবদান রাখছে। প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে অর্থ প্রদানসহ শীতার্ত মানুষের জন্য কম্বল বিতরণ করেও সামাজিক দায়বদ্ধতায় চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকগুলো।

সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা এগিয়ে নিতেও ব্যাংকগুলো বর্তমানে অবদান রেখে চলেছে। সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকে ব্যাংকিং সেবার কর্মসূচির আওতায় আনার জন্য কৃষকদের জন্য ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উন্নয়নের প্রধান লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ। আর দারিদ্র্য দূরীকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এসএমই খাত। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়ে দেশের দারিদ্র্য মোচনে বেকার সমস্যার সমাধানে অবদান রেখে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। জামানতবিহীন এসএমই ঋণের কারণে সারা দেশে এসএমই শিল্পোদ্যোক্তাদের মাঝে গতির সঞ্চার হয়েছে। এসএমই এর কারণে দেশে বিপুল সংখ্যক নারীর জীবনে পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থসামাজিক উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশ দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষিবান্ধব এবং গ্রিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যাংকিং চ্যানেলে স্বল্প সময়ে রেমিট্যান্স প্রদান ও ২৪ ঘণ্টা ব্যাংকিং সেবা (এটিএম) ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রচলন অর্থপ্রবাহে গতি এনেছে। দেশে বেসরকারি ব্যাংক খাতের পথচলা প্রায় ৪০ বছর হতে চলেছে। এক সময়ে দেশের ব্যাংকিং সেবা সরকারি ব্যাংক নির্ভর থাকলেও সময়ের ব্যবধানে তাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ব্যাংকিং সেবার নেতৃত্বে চলে এসেছে বেসরকারি ব্যাংক। এখন দেশে মোট বিতরণ করা ঋণের ৭৫ শতাংশের বেশি দেয় বেসরকারি ব্যাংক। ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ হচ্ছে ১২ লাখ ১৬ হাজার ২০২ কোটি টাকা। এরমধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১০ লাখ ৩৫ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশে বেসরকারি ব্যাংকের বেশিরভাগের অনুমোদনই হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এরশাদের সময়ে মোট ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। আর ১৯৯১ থেকে ৯৬ সালে বিএনপি আমলে মোট ৮টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। আর ১৯৯৬ সাল থেকে মোট চার মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৪টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি পাইপলাইনে রয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪টিতে। এরমধ্যে ৫টি নন-সিডিউলড ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১টিতে, যার মধ্যে ৯টি ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এর বাইরে বৈদেশিক বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এইচএসবিসি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানসহ আরও ১০টি ব্যাংক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এবি ব্যাংকের যাত্রা শুরুর পরবর্তি এক দশকে দেশে বেসরকারি ব্যাংকের সংখ্যা সাতটিতে উন্নীত হয়। এরমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত পূবালী ও উত্তরা ব্যাংক বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর নতুন করে গঠন হয় ইসলামি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, দি সিটি ও ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (আইএফআইসি) লিমিটেড। এরপর ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডাচবাংলা, ইস্টার্ন, এক্সিম, সিটি, আল আরাফা, সাউথইস্ট, প্রাইম, প্রিমিয়ারসহ মেট ২১টি ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এসে ২০১২ সাল থেকে মিডল্যান্ড, ফারমার্স (বর্তমানে পদ্মা), ইউনিয়ন, মধুমতি, সাউথবাংলা, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়ালসহ আরও ১১টি ব্যাংক অনুমোদন পেয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে রয়েছে।

দেশের আর্থিক খাত মূলত ব্যাংকনির্ভর। বেসরকারি ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে খাতটি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যে পর্যায়ে আছে, তা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুদের হার, আমানতের সংকটসহ পুরো ব্যাংকিং খাতই অস্থিতিশীল সময় পার করছে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার একটি বড় কারণ হচ্ছে দেশের অর্থনীতির তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়া। এর ফলে আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণে এক ধরনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা চলছে ব্যাংক খাতে, যা খেলাপি ঋণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।  

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি বলে মনে করেন মোর্শেদ খান। প্রথম বেসরকারি ব্যাংক গড়ে তোলার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রাহকরা যাতে বিনা হয়রানি ও স্বল্প সময়ে সেবা পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। সেক্ষেত্রে হয়তো আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। তবে পরবর্তীকালে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে পড়ায় খাতটি বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক চাপের কারণে অযোগ্য ব্যক্তিকেও ঋণ দিতে হয়েছে। যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এখনো খেলাপি সমস্যায় ব্যাংকটিকে পরিচালন কার্যক্রমে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত