নীল নদের তীরে সুপ্রাচীনকালে গড়ে উঠেছে মিসরীয় সভ্যতা। এর মধ্যে পিরামিড সবচেয়ে বিস্ময়কর ও রহস্যময় নিদর্শন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত মিসরে ১৩৮টি পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব পিরামিডের অন্যতম নীল নদের পশ্চিমের শহর গিজার নির্জন মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যযুগের সপ্তাশ্চর্য ‘গিজার মহা স্ফিংস’। লিখেছেন নাসরিন শওকত
গিজার মহা পিরামিড
গিজার মহা স্ফিংস হলো মিসরের প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যা গিজার মহা পিরামিড বা খুফুর পিরামিড নামেও পরিচিত। মিসরের নীল নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত এল গিজা মালভূমিতে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে সরাসরি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। উপত্যকার মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে হেলান দেওয়া স্ফিংস চুনাপাথরের তৈরি একটি মূর্তি। স্ফিংস হলো একটি পৌরাণিক প্রাণী। যার শরীরের নিচের অংশ সিংহের আকৃতির। আর উপরের অংশ দেখতে মানুষের মাথার মতো। মিসরীয় প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, স্ফিংসের মুখ চতুর্থ রাজবংশের (২৫৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের) ফারাও সম্রাট খুফুর মুখের আদলে তৈরি। মহা পিরমিড স্ফিংস মূলত এই রাজবংশের বিশিষ্ট শাসকদের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় ভাষায় গ্রেট স্ফিংসকে ‘খুফুর দিগন্ত’ বলা হয়।
পৃথিবীর প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে গিজার মহা পিরামিড একটি, যা আজও প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে। বিশাল বিশাল পাথর খ- কেটে মহা পিরামিড স্ফিংসের আসল আকৃতি তৈরি করা হয়েছিল। তারপর থেকে চুনাপাথর ব্লকের স্তর দিয়ে পিরামিডগুলো পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। গিজার মহা পিরামিড তার থাবা থেকে লেজ পর্যন্ত ৭৩ মিটার (২৪০ ফুট) লম্বা। মাটির ওপর থেকে মাথার উপরের অংশ পর্যন্ত ২০ মিটার (৬৬ ফুট) উঁচু। পেছনের নিতম্ব ১৯ মিটার (৬২ ফুট) চওড়া। এর নাকটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে অজানা কারণে ভেঙে যায়। নীল নদের প্রায় ৯ কিলোমিটার পশ্চিমে পুরনো গিজা শহরের অবস্থান। রাজধানী কায়রোর উপকণ্ঠ থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মৃত নগরী আল গিজা। সেখানে মরুভূমির বুকে পিরামিড চত্বর রয়েছে। এই চত্বরেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মিসরের চতুর্থ রাজবংশের তিনটি রাজকীয় পিরামিড। এগুলো হলো যথাক্রমে ফারাও খুফু, তার ছেলে ফারাও খাফ্রে ও খাফ্রের ছেলে মেনকুওরের পিরামিড। এই তিনটি পিরামিডের সমন্বয়েই গিজার মহা পিরামিড গঠিত। চত্বরের কয়েকশ মিটার দক্ষিণ পশ্চিমে ছোট আকৃতির খাফ্রের পিরামিড, এর আরও কয়েক শ মিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে মাঝারি আকারের মেনকুওর পিরামিডের অবস্থান। চত্বরের পূর্বপাশে গ্রেট স্ফিংস বা খুফুর পিরামিড দিয়ে ঘেরা। এই স্থাপনাগুলো ওই সময়ের মিসরের ক্ষমতাসীন এই তিন সম্রাটের সমাধি হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এই তিন পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম হলো গিজার মহা পিরামিড। পিরামিডটির সামনে একটি অসম্পূর্ণ মন্দিরে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
গিজার পিরামিড চত্বরে মোট ৯টি পিরামিড অবস্থিত। এগুলো মিসরের প্রাচীন রাজত্বের (ওল্ড কিংডম) চতুর্থ রাজবংশের সম্রাট ফারাও খুফু, তার ছেলে খাফ্ররে, খাফ্ররের ছেলে মেনকুওর ও তাদের রানীদের সমাধিসৌধ। সম্রাটদের প্রতিটি পিরামিডের পাশে রয়েছে তাদের রানীদের পিরামিড। তবে সম্রাটদের তুলনায় রানীদের পিরামিডগুলো আকারে ছোট। এই পিরামিডগুলো এমন করে বানানো যে, ঢোকার ও বের হওয়ার সময় মাথা নিচু করে বের হতে হবে। এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে, জীবিত থাকা অবস্থায় ফারাওরা চাইতেন তাদের সামনে সবাই মাথা নিচু করে থাকুক। তেমনি তাদের মৃত্যুর পরও যেন সমাধিতে কেউ এলে মাথা নিচু করেই থাকেনএমন চিন্তা থেকেই পিরামিডগুলোকে এভাবে তৈরি করা হয়েছে।
খুফুর পিরামিড
নিরেট গ্রানাইট পাথরের তৈরি খুফুর পিরামিডের ভেতরের অংশে তিনটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ বেজমেন্টে অবস্থিত কক্ষটির কাজ অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে। গবেষকদের ধারণা, এই কক্ষটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই রাজা খুফুর মৃত্যু হয়। যার জন্য এটি অসম্পূর্ণ রাখা হয়েছিল। বাকি দুটো কক্ষের নাম রাখা হয়েছে রাজার কক্ষ (কিংস চেম্বার) ও রানীর কক্ষ (কুইনস চেম্বার)। সমাধিস্থলের কুইন্স নামের চেম্বারটি উত্তর-দক্ষিণে ৫ দশমিক ৭৫ মিটার (১৯ ফুট) লম্বা। আর পূর্ব-পশ্চিমে ৫ দশমিক ২৩ মিটার (১৭ ফুটের একটু বেশি)। এই কক্ষটির ছাদ সুচালো হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। ছাদের সবচেয়ে উঁচু বিন্দুটি মেঝে থেকে প্রায় সোয়া ৬ মিটার (সাড়ে ২০ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। এই কক্ষ থেকে উত্তর ও দক্ষিণে দুটো বারান্দা (প্যাসেজ) পেরিয়ে গেছে। প্যাসেজ দুটো একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর ভারী পাথরের দরজা দিয়ে আটকে রাখা। ২১ শতকের বিজ্ঞানীরা সেই দরজায় ছিদ্র করে ফাইবার অপটিক্সের ক্যামেরা ঢুকিয়েছিলেন। সেই ক্যামেরায় উঠে আসা চিত্র অনুযায়ী, দরজার ওপারে আরেকটি হল ঘর আছে। যার দেয়ালে লাল রঙের হায়রো গ্লিফিক্স ব্যবহার করে কোনো বার্তা লেখা রয়েছে। কুইন্স চেম্বারের তুলনায় কিংস চেম্বারের কক্ষটি আকারে বড়। উত্তর-দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ১০ মিটার (৩৪ ফুটের বেশি) আর পূর্ব-পশ্চিমে কক্ষটি প্রায় সোয়া ৫ মিটার (১৭ ফুটের বেশি) লম্বা। এই কক্ষের সমতল ছাদটি মেঝে থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ মিটার (১৯ ফুটের বেশি) উঁচুতে অবস্থিত। কিংস চেম্বারটিতে কেবল গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। কক্ষটির এক প্রান্তে ভারী পাথরের কফিনে রাজা খুফুর মমিকৃত মরদেহটি রাখা হয়েছিল। এই প্রস্তর নির্মিত কফিনটি সাদামাটা। অন্য পিরামিডগুলোয় সম্রাটের মরদেহ সংরক্ষিত কফিনের দেয়ালে জাঁকজমকপূর্ণ নকশা খোদাই করা থাকে। গবেষকদের ধারণা, একই ধরনের জমকালো একটি কফিন খুফুর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু আসওয়ান থেকে পিরামিড পর্যন্ত নিয়ে আসার সময় কফিনসহ বহনকারী নৌকাটি নীল নদে ডুবে গিয়েছিল। ফলে দ্রুত আরেকটি কফিন তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিলেন কর্মীরা। মিসরের অধিকাংশ পিরামিডের মতো একসময় সম্রাট খুফুর পিরামিডেও অনেক ধন-সম্পদ লুকিয়ে রাখা ছিল। পরবর্তী সময়ে এই পিরামিডগুলোয় রক্ষিত ধন-সম্পদের বেশির ভাগই চুরি হয়ে যায়। গবেষকরা দাবি করেন, মিসরে নতুন রাজত্বের শাসনামলেই ক্ষমতাসীন সম্রাটরাও প্রাচীন রাজত্বের আমলে নির্মিত এই পিরামিডগুলো থেকে অবাধে লুটতরাজ চালিয়েছে। নতুন রাজত্বের আমলের শুরু হয়েছিল খুফুর পিরামিড নির্মাণ। সম্পূর্ণ হওয়ার পরের প্রায় ১ হাজার বছর পর্যন্তও এই লুটতরাজ চলে। মিসরে ২৬তম রাজবংশ সম্রাট ক্ষমতায় থাকাকালে পিরামিডে প্রবেশের সব রাস্তা ভারী পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
অবিস্মরণীয় স্থাপত্য
মিসরের প্রাচীনতম পিরামিডগুলো মেমফিসের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সাক্কারায় প্রথম আবিষ্কৃত হয়। অবিস্মরণীয় স্থাপত্য হিসেবে পিরামিডগুলো হেলেনীয় যুগে জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রাচীন মিসরীয়রা ধর্মীয়ভাবে পরকালে বিশ্বাস করতেন। প্রাচীন মিসরীয়দের ধর্মীয় বিশ^াস মতে, মৃত্যুর পর স্বর্গ পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য বিদেহী আত্মাদের পথের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পরিমাণের অর্থ খরচ করতে হতো। জায়গা মতো প্রয়োজনীয় অর্থ খরচ করার সামর্থ্য না থাকলে সেই আত্মার শেষ ঠিকানা হতো নরক। তাই রাজা ও রানীদের মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহের সঙ্গে সোনা, রুপা ও মূল্যবান রত্নাদি দিয়ে দেওয়া হতো। আর তাদের দেহকে মমি বানিয়ে সংরক্ষণ করা হতো। পরকালে যাতে সেবা পেতে সমস্যা না হয় সেজন্য তাদের দাস-দাসীদেরও মৃত রাজা রানীর সঙ্গেই হত্যা করা হতো। কিন্তু এই মমি ও মূল্যবান সামগ্রী কীভাবে নিরাপদে রাখা যায় তা তাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ধারণা করা হয়ে থাকে, মমি ও মূল্যবান সম্পদ নিরাপদে গচ্ছিত রাখার চিন্তা থেকেই তারা পিরামড নির্মাণ শুরু করে। তবে পিরামিড নির্মাণেরও আগে ট্রপিজয়েড আকৃতির মাস্তাবা নামক সমাধি নির্মাণ করা হতো।
ইতিহাস
পৃথিবীতে পাথর কেটে তৈরি করা ভাস্কর্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় গিজার স্ফিংস। ধারণা করা হয়, মূর্তিটি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বছরের পুরনো। তবে কে এই বিশাল মূর্তিটির নির্মাণ করেছেন তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি। কিছু গবেষক দাবি করেন, সম্রাট খাফ্রে এটি নির্মাণ করেছিলেন।
১৯২৫ সাল পর্যন্ত স্ফিংসের মুখম-ল ছাড়া সবটাই বালুতে ডুবে ছিল। ১৯২৫ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত এমিল বারেজ নামে এক ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ চালিয়ে স্ফিংসকে বালু থেকে মুক্ত করেন। তবে প্রাচীন গ্রিক পুরাণে স্ফিংসকে বিশ্বাসঘাতক ও নির্দয় পাখাওয়ালা দানব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যার পশ্চাদ্দেশ সিংহের মতো। এদের প্রায়ই পাখির ডানার মতো বড় ডানা থাকে। আর মুখম-ল মানুষের মুখের মতো দেখায়। মিসরীয় পুরাণের স্ফিংস ছিল উপকারী চরিত্র, কিন্তু তাদের কোনো ডানা নেই। এদিকে আরব পুরাণে স্ফিংসকে আবু আল-হোল (অনিষ্টের পিতা হিসেবে) তুলে ধরা হয়েছে।
তবে মিসরের স্ফিংস মূলত স্মারক স্থাপত্য। এটি প্রাচীনতম রাজকীয় সৌধ বা ধর্মীয় মন্দিরের অংশ হিসেবে বিবেচিত। সাড়ে চার হাজারেরও বেশি বছর আগে নির্মিত এই স্থাপনাগুলো ওই সময়ের মিসরের ক্ষমতাসীন তিন রাজার সমাধি হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। গিজার মহা পিরামিড তিনটির মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হলো গিজা মহা স্ফিংস। সারির উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এই পিরামিডটির ভেতর রাজা খুফুকে সমাহিত করা হয়। ফারাও সম্রাট খুফু প্রায় ৪ হাজার ৬শ বছর আগে তিন দশকের জন্য শাসন করেছিলেন। ইতিহাসে মহা পিরামিড নামে পরিচিত এই সমাধিটি পরবর্তী প্রায় ৪ হাজার বছরের জন্য মানুষের তৈরি সর্বোচ্চ স্থাপনার খেতাব দখল করে রেখেছিল।
মিসরের সম্রাট খুফুর সমাধিস্থলটি প্রাচীন আমলের গ্রিক ইতিহাসবিদরাও প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় স্থান দিতে বাধ্য হন। তখন সিদনের এন্তিপেতার একে প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য তালিকাভুক্ত করেন। এটা প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যসমূহের মধ্যে সব থেকে প্রাচীন ও একমাত্র টিকে থাকা নিদর্শন। এর বিস্ময়কর বিষয় হলো, গ্রিক ইতিহাসবিদদের তালিকায় থাকা বাকি ছয়টি স্থাপনা কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও খুফুর এই সমাধিটি গিজার সমাধিস্থলে স্বগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
নির্মাণ কৌশল
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা মতে, খ্রিস্টপূর্ব ২৫৫৮ থেকে ২৫৩২ অব্দের মধ্যে মিসরের চতুর্থ ফারাও রাজবংশের রাজা খুফুর রাজত্বকালে এই পিরামিডটি নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রায় ১২ একর জায়গার ওপর চুনাপাথরের খ-ে নির্মিত বিশালাকারের এই পিরামিডটি নির্মিত হয়েছিল। এর পরের ৩ হাজার ৮শ’ বছর পর্যন্ত হাতের তৈরি বিশে^র সর্ববৃহৎ স্থাপনার স্থান দখল করে ছিল। শক্ত গ্রানাইট পাথরে তৈরি পিরামিডটির নির্মাণকাজ শেষে মূল্যবান চুনা পাথরের বাইরের আবরণসহ প্রাথমিক অবস্থায় এর উচ্চতা ছিল ১৪৬ দশমিক ৫ মিটার (৪৮১ ফুট)। কিন্তু বর্তমানে এর উচ্চতা ১৩৮ দশমিক ৮ মিটার। তবে এরপর কয়েক হাজার বছর ধরে ধবধবে সাদা সেই পাথরের বাইরের আবরণ চুরি যাওয়ায় বর্তমানে পিরামিডটির উচ্চতা প্রায় ১০ মিটার কমে ১৩৭ মিটার (৪৫০ ফুটে) নেমে এসেছে। পিরামিডটির প্রতিটি পাশ ২৩০ দশমিক ৪ মিটার লম্বা। গিজার মহা পিরামিডের ওজন আনুমানিক ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন। মোট ২৫ লাখ বর্গ মিটার আয়তনের পিরামিডটিতে তিনটি প্রধান কক্ষ রয়েছে। এর গ্র্যান্ড গ্যালারির দৈর্ঘ্য ৪৭ মিটার ও উচ্চতায় ৮ মিটার। বিজ্ঞানীরা গিজার মহা পিরামিডের ভেতরে একটি ‘বড় শূন্যস্থানের’ সন্ধান পেয়েছেন। এটি নির্মাণে ১ লাখ শ্রমিকের প্রায় ২০ বছর সময় লেগে ছিল।
সাড়ে চার হাজার বছরেরও বেশি আগে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই কেবল হাতে এমন বিশাল স্থাপনা কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিলতা নিয়ে রয়েছে নানা রোমাঞ্চকর কাহিনী। গবেষকদের গবেষণা অনুযায়ী, সে সময় একধরনের ঢালু র্যাম্প ব্যবহার করে এই পিরামিডগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এই নির্মাণ প্রকল্পে ক্রীতদাস ব্যবহারেও কোনো প্রমাণ পাননি গবেষকরা। ওই সময় বিশে^র অধিকাংশ এলাকার মতো মিসরের অভিজাত পরিবারেও ক্রীতদাস ব্যবহারের প্রচলন ছিল। তবে মিসরের ইতিহাসে কোনো সময়ই এই পিরামিড নির্মাণে ক্রীতদাস ব্যবহারের অস্তিত্ব ছিল না। বরং প্রতিবছর মিসরের কৃষক পরিবারের সক্ষম সদস্যরা চাষাবাদের মৌসুম ছাড়া বাকি সময় এই পিরামিড নির্মাণে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতেন। এই কাজের বিনিময়ে অর্থ পাওয়া না গেলেও এই প্রকল্পে কর্মরত প্রত্যেক কর্মীর থাকা ও খাওয়ার খরচ রাজ কোষাগার থেকে মেটানো হতো। এই তথ্য অনুযায়ী, এই পিরামিড নির্মাণের সময়েই মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রায় দেড়শ মিটার উঁচু গিজার মহা পিরামিডের দ্বিমাত্রিক ত্রিভুজ সদৃশ দেয়ালগুলোর ভূমির দৈর্ঘ্য ছিল ২৩০ মিটার (প্রায় ৭৫০ ফুটের বেশি)। অর্থাৎ পুরো পিরামিডটি ৫ হাজার বর্গ মিটারের বেশি এলাকাজুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুবিশাল এই স্থাপনাটি নির্মাণে ২৩ লাখ পাথরের চাঁই ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ভূমির দিকে অবস্থিত পাথর খ-গুলোর আকার রীতিমতো দশাশই। এই নির্মাণকাজে ব্যবহৃত সবচেয়ে ভারী পাথর খ-টির ওজন ৮০ টনের বেশি ছিল। মিসরের দক্ষিণাঞ্চলের শহর আসওয়ানের পাথর খনি থেকে এই খ-গুলো নির্মাণস্থলে নিয়ে আসা হতো। প্রায় ৮শ’ কিলোমিটার (৫শ’ মাইল) দূরের সেই খনি থেকে পাথরগুলো নীল নদের চলাচলকারী বিশাল বজরা নৌকায় করে নির্মাণস্থল পর্যন্ত নিয়ে আসা হতো। এভাবে প্রায় ৮ হাজার টন পাথর আসওয়ান থেকে বর্তমান কায়রোর উপকণ্ঠে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে সৌভাগ্যবশত পিরামিডটি নির্মাণে ৫৫ লাখ চুনা পাথর সংগ্রহে প্রয়োজনীয় খনিগুলোর অবস্থান কায়রোর কাছাকাছি ছিল। পিরামিডের গায়ে এই পাথর খ-গুলো জুড়ে দিতে নির্মাণকারীরা প্রায় ৫ লাখ টন সিমেন্ট ব্যবহার করেছিলেন।
নীল নদের তীরে সুপ্রাচীনকালে গড়ে উঠেছে মিসরীয় সভ্যতা। এ সভ্যতায় অনেক অনন্য নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে পিরামিড সবচেয়ে বিস্ময়কর ও রহস্যময় নিদর্শন। ত্রিভুজ আকৃতির পাথরনির্মিত স্থাপনা হলো পিরামিড। ২০০৮ সাল পর্যন্ত মিসরে ১৩৮টি পিরামিড আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই প্রাচীন ও মধ্যকালীন ফারাও সম্রাটদের রাজত্বকালের রাজা ও তাদের রানীদের সমাধিসৌধ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। প্রায় ৫০০০ বছর আগে তৈরি এই স্থাপনার অনেক রহস্য আজও উন্মোচন করা সম্ভব হয়নি।
পৃথিবীর প্রাচীনতম মানবনির্মিত এই স্থাপনাটি কয়েক হাজার বছর ধরে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসেছে। এখন থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি বছর আগে সুদূর গ্রিস থেকেও পর্যটকরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে এই পিরামিড দেখতে আসতেন। এই পর্যটকদের মধ্যে ছিলেন ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাত হেরোডোটাসও। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তিনি এই পিরামিড পরিদর্শন করেন। এর প্রায় আড়াই হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও এই পিরামিড সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। এই পিরামিডের টানে মিসর দখলের চেষ্টা করেছিলেন ফরাসী সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই তিনটি পিরামিড দেখতে মিসরে আসেন।