বছরের দুই ঈদে লাখ লাখ নগরবাসী ঢাকা ছাড়েন। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে নানা ভোগান্তি উপেক্ষা করে বাড়িতে যান তারা। তবে এবার ঈদের আনন্দের চেয়ে বিষাদের খবরই বেশি। রাজধানীসহ সারা দেশে এবার চুরি-ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মারামারির ঘটনা বেশ অস্বস্তিতে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ঈদের সাত দিনের ছুটিতে পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ সহায়তা চেয়ে ফোন এসেছে ১০ হাজার ৭৮টি। এর মধ্যে শুধু মারামারির ঘটনায় সহায়তা চেয়ে সর্বাধিক এক হাজার ৯৭৪টি ফোন আসে।
তথ্যানুযায়ী, ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এই সাত দিনে ৯৯৯-এ সহায়তা চেয়ে ১০ হাজার ৭৮টি ফোন আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফোন আসে মারামারির ঘটনায়। এরপর জিম্মি রাখার (টাকা-পয়সা, জমি ও পারিবারিক কলহের জেরে আটক রাখা) ঘটনায় ৮৭১টি, অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে ৮০২, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৬৬৩, সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮৩, পারিবারিক সমস্যায় ৫৩০, আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চেয়ে ৫১২, শব্দদূষণের ঘটনায় ৩৬৬, বাসের টিকিটের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগে ৩০৫টি এবং ঈদের হাটে চাঁদাবাজি, এক বাজারের গরু অন্য বাজারে নিয়ে যাওয়ার ৩০২টি অভিযোগে সহায়তা চেয়ে ফোন এসেছে। এ ছাড়া অন্যান্য অভিযোগে আরও তিন হাজার ১৭০টি ফোন এসেছে। এসব ফোনে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে জরুরি সেবা দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বারোঘরিয়া লক্ষ্মীপুর খোনাপাড়ার বাসিন্দা শামীমা আক্তার প্রতিবেশীর হামলা থেকে বাঁচতে ৯৯৯-এ ফোন করেন। এরপর ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। শামীমা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবেশীর কাছ থেকে আসবাবপত্র কেনে আমার মেয়ে। পরে তারা সেগুলো ফেরত নেওয়ার জন্য ঝামেলা শুরু করে। বুধবার একদল লোক পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ এলেও কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। জামাই-মেয়ে বাড়িতে এসেও ঈদ না করেই চলে যায়।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো অভিযোগে থানা পুলিশকে ফোন করলে তারা সেবা দিতে গড়িমসি করে। কিন্তু জাতীয় সেবায় ফোন করলে তাৎক্ষণিক সেবা পাওয়া যায়। তখন থানা পুলিশও তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে আসে। এ ছাড়া ছোটখাটো বিষয়েও এখানে ফোন করলে প্রতিকার মিলছে, যা থানা পুলিশ থেকে সাধারণত পাওয়া যায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক তরুণী বলেন, ঈদের পর দিন পারিবারিক বিরোধের জেরে চাচারা তার ভাইয়ের ওপর হামলা করে। কূলকিনারা না পেয়ে ৯৯৯-এ ফোন করেন। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ এসে সমাধান করে দেয়। এর আগে বিভিন্ন সময় শুনেছেন জাতীয় জরুরি নম্বরে ফোন করলেই সেবা পাওয়া যায়। সেদিন প্রমাণ পেয়েছি।
এ বিষয়ে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর মারামারির কিছু ফোন আসে। তবে এবার রেকর্ডসংখ্যক ফোন এসেছে। এর মধ্যে দুই পক্ষের বিরোধ, গ্রুপভিত্তিক মারামারি, জমি নিয়ে বিরোধ থেকে পারিবারিক মারামারির ঘটনাই বেশি। এর পাশাপাশি শব্দদূষণের ঘটনায়ও কলের সংখ্যা বাড়ছে।
ঈদের লম্বা ছুটিতে চুরি ও ছিনতাই রোধে রাজধানীসহ দেশজুড়ে ছিল পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফলে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার ঈদযাত্রা থেকে শুরু করে ঈদের পরও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল সন্তোষজনক। পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সূত্র জানায়, ছুটিতে ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তায় গত ২৪ মে থেকে চেকপোস্ট ও টহল জোরদার করা হয়। ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ নিরাপত্তা বহাল ছিল। এ ছাড়া রাতে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি প্রতিরোধে পুলিশের স্পেশাল টিম সক্রিয় ছিল।
ঈদের ছুটিতে শহরে যা ঘটে : ফাঁকা রাজধানীতে বেপরোয়া গাড়ির কয়েকটি দুর্ঘটনার পর সড়কে নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে কাজ শুরু করে ট্রাফিক পুলিশ। গত শুক্রবার পূর্বাচল ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে একটি প্রাইভেট জিপকে চেকপোস্টে থামার জন্য সিগন্যাল দিলেও চালক তা অমান্য করলে তাকে আটক করা হয়। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে না পারায় চালককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
গত বুধবার সন্ধ্যায় এক নারী শপিং শেষে বাসায় ফেরার পথে মৌচাক ক্রসিং এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। মোবাইল নিয়ে পালানোর সময় জনতা তাকে গণপিটুনি দেয়। এ সময় সার্জেন্ট নেওয়াজ ছিনতাইকারীকে উদ্ধার করে শাহজাহানপুর থানায় হস্তান্তর করেন। একই দিন দুপুরে ট্রাফিক সার্জেন্ট রানা ইসলাম ডিউটিরত অবস্থায় খবর পান একটি গরুভর্তি পিকআপ ছিনতাই হয়ে গেছে। পরে তিনি ছিনতাইকারীসহ গাড়িটি আটক করে গাবতলী পুলিশ ফাঁড়িতে হস্তান্তর করেন। গত ২৫ মে সন্ধ্যায় রাজধানীর কালশী বস্তিতে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের ছুটিতে ঢাকাসহ সারা দেশে ৭৮টি অগ্নিকা-ের ঘটনায় সেবা দেওয়া হয়েছে। এর চেয়েও বেশি কল আসে কন্ট্রোলরুমে। তবে সেসব আগুন ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
৯৯৯-এর পরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ কর্মকর্তা) আনোয়ার সাত্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঈদের ছুটিতেও ২৪ ঘণ্টা ভুক্তভোগীদের ফোন নেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে জরুরি সেবা দেওয়া হয়েছে। এবার মারামারির ফোন বেশি এসেছে। থানা পুলিশ এসব ঘটনায় ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চেয়ে কলের সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ছে।
