পাঁচ ‘কুতুবের’ নিয়ন্ত্রণে উত্তরার অপরাধ জগৎ

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৫৩ এএম

রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি, দোকান লুটের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পাঁচজনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তারা। তারা জানান, ওই পাঁচজন আলাদা পাঁচটি দল করে নির্দিষ্ট অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মধ্যে তিনজন এর আগে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্ত হয়েছে। ওই তিনজনের মধ্যে দুজনকে সম্প্রতি আবার গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি তিনজনকে ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। ওই পাঁচজন হলো আনোয়ার হোসেন, মো. আবদুল্লাহ, মো. তৈয়ব, জুয়েল রানা ও সোহেল ওরফে আঙুল কাটা সোহেল। ডিবির ভাষ্য, তাদের কেউ কেউ পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচর, অন্যরা নারায়ণগঞ্জে রাত্রিযাপন করে। কেউ ২০ থেকে ২৫ সেকেন্ডের মধ্যেই যেকোনো তালাবদ্ধ দোকান লুট করতে পারে, কারও দল ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে থাকে। কেউ ছিনতাই, কেউ ডাকাতি করে। আবার কোনো দল ভুয়া ডিবি সেজে অভিযানের নামে ব্যবসায়ীদের টাকা ছিনিয়ে নেয়। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার একটি অপহরণ মামলার তদন্তে নেমে তাদের সন্ধান পায় ডিবি।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার মহররম আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত শীর্ষ এসব অপরাধীর অনেককেই গ্রেপ্তার করে আদালতের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে তাদের বেশির ভাগই জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ে।’

ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলার এজাহারে ওই এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নূরুল আমিন উল্লেখ করেন, গত বছরের ২৪ অক্টোবর সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ইসিবি চত্বর ও বি জে টাওয়ারের মাঝামাঝি পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ একটি হায়েস মাইক্রোবাস থামিয়ে ভেতর থেকে কেউ একজন মানিকদি রাস্তা কোন দিকে জানতে চান। হাতের ইশারায় রাস্তা দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে থাকা লোকজন জোর করে গাড়িতে তুলে স্কচটেপ লাগিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। দুই পাশে থাকা দুজন দুটি আগ্নেয়াস্ত্র কোমরে ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে বলতে থাকে, ‘কোনো কথা বলবি না।’ মাইক্রোবাসটি আবদুল্লাহপুর ব্রিজ পার হয়ে টঙ্গীর দিকে যেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আসামিরা তার মুখের স্কচটেপ খুলে দিয়ে বলে, তাদের টাকার দরকার। বিকাশে ১০ লাখ টাকা না পাঠালে লাশ পড়ে থাকবে রাস্তায়।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মাওনা ব্রিজ পার হয়ে ময়মনসিংহ হাইওয়ে রাস্তার পাশে একটি শালবাগানের মধ্যে নিয়ে মাইক্রোবাস থেকে নামতে বলে অপহরণকারীরা। সেখানে আরও দুটি প্রাইভেট কারে ছয়জন ছিল। তারা সবাই ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা এনে দিতে বলে। তাদের কথায় রাজি না হলে দুই-তিনজন রড দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে নূরুল তার শ্যালক জহিরকে ফোন দিয়ে অপহরণকারীদের সরবরাহ করা পাঁচটি বিকাশ নম্বরসহ আরও নম্বরে মোট ৩ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেন। পরে তারা তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন সেট, মানিব্যাগ ও ইউসিবি ব্যাংকের এটিএম কার্ড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আধা ঘণ্টা পর চলে যাওয়ার কথা বলে। এরপর তিনি একটি পিকআপে করে বাসায় ফেরেন। পরবর্তী সময়ে থানায় মামলা করেন।

ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটির তদন্তে কোনো কূলকিনারা না পাওয়ায় তদন্তভার ন্যস্ত হয় গোয়েন্দা পুলিশের কাছে।’

ডিবির বিমানবন্দর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মহররম আলী বলেন, ‘অপহরণচক্রের মূল হোতা হিসেবে আনোয়ার নামে একজনকে দীর্ঘদিন ধরেই খোঁজা হচ্ছিল। লুণ্ঠিত মোবাইলের তথ্য সংগ্রহ ও গুপ্তচরের মাধ্যমে দীর্ঘ চেষ্টার পর গত ১৬ এপ্রিল গাজীপুর জেলার টঙ্গী পূর্ব থানাধীন ইশান্দি সরকার রোডের দত্তপাড়া শাহাদতের বাড়ির গ্যারেজে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশীয় ধারালো অস্ত্র, একটি প্রাইভেট কার, কালো রঙের স্কচটেপ, সানগ্লাস, একটি স্ক্রু ড্রাইভার ও নগদ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধারসহ অপহরণচক্রের মূল হোতা আনোয়ার হোসেন ও তার সহযোগী বাবুল মিয়াকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছি। এখন উত্তরা এলাকার বেশিরভাগ অপরাধচক্রের শীর্ষ হোতা ও তাদের সহযোগীরা বাইরে রয়েছে, যাদের গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজছি।’

মহানগর গোয়েন্দা ও উত্তরা বিভাগের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, উত্তরা, বিমানবন্দর ও ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর হুন্ডির টাকা টার্গেট করেন জুয়েল রানা ও তার দলবল। জুয়েল রানার নেতৃত্বে এই চক্র ভুয়া ডিবি সেজে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের পর ব্যবসায়ীদের কাছে গিয়ে হুন্ডির টাকা বলে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। জুয়েলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকে মিলনসহ ছয়জন। উত্তরা পূর্ব ও উত্তরা পশ্চিম থানায় তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, একসময় তৈয়বের শিষ্য ছিলেন জুয়েল রানা। গত বছর এক ব্যবসায়ীর ৪০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের পর তৈয়ব ও জুয়েল ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। তৈয়বের আগে জুয়েল রানা কারাগার থেকে বের হয়ে আলাদা দল গঠন করে। এর কিছুদিন পর তৈয়বও জেল থেকে জামিনে বের হয়ে আলাদা দল নিয়ে উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি করতে থাকে।

গত সপ্তাহে তৈয়ব নরসিংদী এলাকায় ‘ডাকাতি করতে’ গিয়ে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়। ওই সময় তার কাছ থেকে একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়েছে। তবে তার দলের বাকি সাত-আট সদস্য ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, জুয়েল রানার নেতৃত্বে অন্তত ১২ সদস্য রয়েছে। উত্তরার বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা কখনো চালক ও যাত্রী সেজে বিভিন্ন লোকজনকে উঠিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে মুক্তিপণ আদায় করেছে। আবার কখনো ধনাঢ্য ব্যক্তিদের টার্গেট করে কৌশলে গাড়িতে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করেছে। একই অভিযোগে দলের অন্যতম আরেক সদস্য রাজু আহমেদ ওরফে চান মিয়াকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানান এডিসি মহররম। তিনি বলেন, উত্তরা এলাকায় যেসব দোকানে বেচাকেনা বেশি, সেসব দোকানকে টার্গেট করে ডাকাতি ও ছিনতাই করে থাকে আবদুল্লাহ গ্রুপের লোকজন।

ডিবির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, একই এলাকার সোহেল ওরফে আঙুল কাটা সোহেলের নেতৃত্বে ৫ থেকে ১২ জনের একটি দল রয়েছে। তারা বিভিন্ন তালাবদ্ধ দোকান খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খুলে ফেলে সবকিছু নিয়ে যায়। এই দলের বেশির ভাগ সদস্য গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। সোহেল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত