প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও ভাষা সৈনিক অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন রোববার বিকেলে। বেশ কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। মাঝে একাধিকবার লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয়।
এদিকে মমতাজউদ্দীনের শেষ সময়টুকু লেখনীর মাধ্যমে ফেসবুকে শেয়ার করলেন ছেলে তিতাস মাহমুদ।
রোববার দিবাগত রাতে তিনি লেখেন, “এয়ারপোর্ট থেকে নেমে আইসিইউ-তে ঢুকেই বাবার চোখে চোখ পড়তো আমার। মুহূর্তেই তার চোখের ভিতর একটা চকচকে আলোর ঝলকানি দেখতে পেতাম। পুরো ঠোঁট জুড়ে সরল, শিশুর মতো মিষ্টি হাসি এঁকে তিনি আমার ডান হাতে পরপর কয়েকটি চুমু দিতেন। আমি বাবার চওড়া কপাল ছুঁয়ে পাতলা চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলতাম, ‘আব্বা, আমি এসে গেছি। আমি এসে গেছি, আব্বা।’
এরপর থেকেই শুরু হয়ে যেতো আমার বাবার অহেতুক বাকবাকুম। হাসপাতালে শিফট বদলে ডিউটিতে নতুন ডাক্তার, নার্স, ব্রাদার, পিটি, ওটি, ওয়ার্ডবয়, নিউট্রিশনিস্ট সবাইকে ডেকে ডেকে বলতেন, ‘বুঝলে হে, আমার ডাক্তার ছেলে এসে গেছে। আমি শিগগিরই বাড়ি চলে যাবো। গত ক’দিন তোমাদের অনেক কষ্ট দিলাম ভাই।’
এবারই প্রথম তিনি আমাকে দেখে উল্লসিত হলেন না। আমি বললাম, ‘আব্বা, আমি তিতাস। আমি এসে গেছি। আর ভয় নাই।’ ঘন ঘুম ভাঙা ভীষণ তন্দ্রালু চোখে, শুষ্ক জড়ানো কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘বা বা! তুমি... এসেছো!’ আমি বললাম, ‘আপনি আবার সুস্থ হবেন, আব্বা। কত বছর আমরা একসাথে ঈদ করিনি। ঈদের আগেই আপনাকে বাড়ি নিয়ে যাবো।”
তিতাস মাহমুদ আরও লেখেন, “নাহ্, তার চোখের ভেতর আমি সেই চকচকে ঝলকানি আলো দেখতে পেলাম না। ঠোঁটের কোণে আত্মবিশ্বাসের মিষ্টি হাসিটা ফুটে উঠলো না। আমি মনে মনে খুব কষ্ট পেলাম। আব্বার চোখের দিকে চোখ রেখে খুব বলতে চাইলাম, ‘আব্বা, আপনি কি আর আমার ওপর ভরসা করতে পারছেন না।’
কিন্তু বলা হলো না। তিনি এরই মধ্যে আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার চেহারাটা কেমন ক্লান্ত, মলিন আর অন্ধকার দেখালো। মোটা ভ্রুর নিচে দু’চোখের কোনায় টপ্ টপ্ দু’ফোঁটা জল। আমি হাতের তালু দিয়ে সে জল মুছে দিলাম।
এবার দেশে এসে বাবার সাথে এই আমার প্রথম কিংবা শেষ কথা। আমি নিশ্চিত বুঝলাম, বিদেশ থেকে ছুটে আসা আমার ব্যাকুল ডাকে তিনি কোন আশার আলো পাননি। আমাদের চেনা-জানা জগতের ওপার থেকে তিনি হয়তো অন্য কারো ডাক পেয়েছেন, যা শুনে তার চোখে চকচকে অন্য এক ঝলকানি জেগেছে। তার ঠোঁট জুড়ে ফুটে উঠেছে অপার শান্তির মোহনীয় অন্যরকম হাসি। আমি হতভাগা এই পৃথিবীর নগণ্য এক ডাক্তার, অসীমের সেই ডাক প্রতিহত করার মতো জ্ঞান বা প্রজ্ঞা আমার কোথায়?”
শেষে লেখেন, “আমি জানি, এই পৃথিবীর চাইতেও আমার বাবার নতুন জীবনযাপনটি আরও অনেক বেশি বর্ণিল এবং বর্ণাঢ্য হবে।”
সোমবার দুপুরের পর মমতাজউদ্দীনের মরদেহ রওনা হবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে। সেখানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।
মমতাজউদদীন আহমদ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। এক অঙ্কের নাটক লেখায় বিশেষ পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি কলেজে ৩২ বছর বাংলা ভাষা সাহিত্য এবং বাংলা ও ইউরোপীয় নাট্য বিষয়ে শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৭৬-৭৮ সাল পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।
১৯৭৭-৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন।
