বিশ্বখ্যাত বিলাসবহুল লাক্সারি ক্রুজ জাহাজ টাইটানিকের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হারল্যান্ড অ্যান্ড ওলফ নিজেদের দেউলিয়া হওয়ার ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। ১৫৮ বছরের পুরনো এই শিপইয়ার্ডটি দেউলিয়া হতে গত মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের কোর্টে আবেদন করেছে। কোম্পানিটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দেখভালের জন্য যুক্তরাজ্য সরকার একজন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে।
১৯৩৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের এই শিপইয়ার্ডে ৩৫ হাজার কর্মী ছিল। এখন এতে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা ১২৩ জন। শিপইয়ার্ডটি ২০০৩ সালের পর থেকে কোনো জাহাজ নির্মাণ করেনি। গত ১৬ বছরে মাত্র দুটি ফেরি নির্মাণ করেছে কোম্পানিটি। ২০০৩ সাল থেকে কোম্পানিটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবসায় মনোযোগ বাড়িয়েছে। কর্মীরা গত সপ্তাহে শিপইয়ার্ডটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তা সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। শিপইয়ার্ড বন্ধের বিরুদ্ধে আদেশ পেতে শ্রমিক ইউনিয়ন গত মঙ্গলবার যুরাজ্যের আদালতে মামলা করেছে।
ইউনিয়নের অর্গানাইজার মিশেল মুহোল্যান্ড সিএনএন বিজনেসকে বলেন, ‘আমরা বিখ্যাত এই শিপইয়ার্ড বন্ধ হতে দিতে পারি না। আমাদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে।’ দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে শিপইয়ার্ডটি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দুটি ফ্রিগেট তৈরির কাজ পাওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া ৬ লাখ পাউন্ড ব্রিজ লোন পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আগামী মাসে নতুন একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ব্রিজ লোন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় কোম্পানিটির সামনে দেউলিয়া হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। শিপইয়ার্ডের মুখপাত্র বলেছেন, কোম্পানিটি ব্যবসা পরিচালনা করে যাবে, নাকি এর অবসায়ন করা হবে, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত পেতে প্রশাসক কাজ করছে।
বিখ্যাত এই শিপইয়ার্ড দেউলিয়া হওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে বিশ্ব শ্রমমূল্য। বিশ্বের কার্গো শিপ বিল্ডিংয়ের কাজ এখন সস্তা শ্রমের জন্য এশিয়ায় স্থানান্তর হয়েছে। আর বিলাসবহুল লাক্সারি ক্রুজ শিপ নির্মাণের কাজ চলে গেছে ইউরোপের এসটিএক্স ইউরোপ, মেয়ের ওয়েরফট ও ফিনচেনতেইরিতে। এক দশক আগেই ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে বাজার হারিয়েছে হারল্যান্ড অ্যান্ড ওলফসহ যুক্তরাজ্যের শিপইয়ার্ডগুলো।
১০০ বছরেরও বেশি আগে টাইটানিক জাহাজ নির্মাণের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পায় শিপইয়ার্ডটি। ১৯০৯ সালে হোয়াইট স্টার লাইন্সের জন্য টাইটানিক এবং তার দুই সহযোগী অলিম্পিক ও ব্রিটানিক জাহাজ নির্মাণ শুরু করে। প্রায় ৯০০ ফুট লম্বা টাইটানিক ছিল ওই সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ। ১৯১২ সালের এপ্রিলে টাইটানিক সাগরে ভাসার অল্প কিছুদিন আগে এর নির্মাণকাজ শেষ করে শিপইয়ার্ডটি। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে বরফখ-ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায় টাইটানিক। যাত্রী ও ক্রুসহ তখন টাইটানিকে থাকা ২২২৩ জনের মধ্যে ১৫১৭ জন প্রাণ হারান।
টাইটানিক দুর্ঘটনার পরও কোম্পানিটি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ট্রান্স-আটলান্টিক বিমান চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকে কোম্পানিটিও ডুবতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালে শিপইয়ার্ডটি জাতীয়করণ করে ব্রিটিশ সরকার। ১৯৮৯ সালে নরওয়ের কোম্পানি ফ্রেড ওলসেন এনার্জি কোম্পানিটি কিনে নেয়। কোম্পানিটি এখন ডলফিন ড্রিলিং নামে পরিচিত।
