চিঠি দিয়েই নয় বছর পার

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫৫ এএম

দেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে গত ১০ বছরে প্রকল্প গ্রহণের পাশাপাশি বরাদ্দও বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে এসব প্রকল্প মানসম্মতভাবে বাস্তবায়ন ও দুর্নীতিরোধে তদারকি সেভাবে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মনে করছেন, প্রকল্পগুলোর সব টাকা যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে না, তারপরও প্রকল্পের তদারকির একমাত্র সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগকে (আইএমইডি) শক্তিশালী করা হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও বিভাগীয় পর্যায়ে সংস্থাটির বিকেন্দ্রীকরণ চিঠি চালাচালিতেই ৯ বছর থেকে ঝুলে আছে। শুধু তাই নয়, আইএমইডির বর্তমান জনবল কাঠামোতে অনেক পদ খালি রয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়মের লাগাম টানবে কে?

টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রকল্পের গুণগতমান ও দুর্নীতি রোধ করা জরুরি। এজন্য ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প তদারকি সংস্থা আইএমইডিকে বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের নির্দেশ দেন। ওই বছরের ১৩ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় দেশের ঢাকার বাইরে সাত বিভাগেও আইএমইডি অফিস স্থাপন করে তদারকির কার্যক্রম শক্তিশালী ও গতিশীল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু অদ্যাবধি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় গত মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে আবারও অনুশাসন দেন। এরপরও জনপ্রশাসন বিভাগের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিষয়টি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

আইএমইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাস্তবতার নিরিখেই আইএমইডিকে শক্তিশালী করা উচিত। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক

জটিলতায় সেটা হচ্ছে। এতে মানসম্মত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে জনপ্রশাসন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিভাগীয় শহরে বিকেন্দ্রীকরণ চায় না আইএমইডির কর্মকর্তারা। এজন্য নানাভাবে বিষয়টিকে বিলম্বিত করছে। যথাযথ পন্থায় জনপ্রশাসনে আবেদন করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও তারা দিচ্ছেন না। এজন্য এটি ঝুলে আছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অর্থনীতির যে আকার, তাতে আইএমইডির পক্ষে সরাসরি প্রকল্পের তদারকি করা সম্ভব নয়। এজন্য বিভাগীয় পর্যায়ে আইএমইডির অফিস স্থাপন, জনবল ও প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব স্থাপন জরুরি। এ বিষয়ে একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা করা গেলে মানসম্মত প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সরকারি কর্মকাণ্ড সম্পাদনে বিলম্ব হয়, হচ্ছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে যে যাই বলুক, আইএমইডিকে শক্তিশালী করতেই হবে। এটা সময়ের দাবি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই প্রকল্প সমাপ্ত প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিদ্যমান জনবল দিয়ে সেটা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য জনবল বাড়ানো ও বিকেন্দ্রীকরণে জোর দিয়েছি। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটা হচ্ছে না।’

জনবল স্থায়ীকরণে জটিলতা : ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে আইএমইডি শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন পদে ৬৯টি পদ অস্থায়ীভাবে সৃষ্টি করা হয়। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম সচিবের একটি, উপসচিবের দুটি ও জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিবের তিনটি পদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় স্থায়ী করে। বাকি ৬৩টি পদ অস্থায়ী রয়ে গেছে। পদগুলো সৃষ্টির পর নিয়মিত সংরক্ষণ করা হয়েছে। অস্থায়ীভাবে সৃজিত ৬৩টি পদ স্থায়ী করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইএমইডিকে নির্দেশ দেন পরিকল্পনামন্ত্রী। এসব পদ রাজস্ব খাতে স্থায়ী করার ব্যাপারে আইএমইডি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার চিঠি দেয়। সর্বশেষ গত মাসেও এ চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

 

বিদ্যমান কাঠামোতে পদ খালি : আইএমইডির বর্তমান কাঠামোতে জনবল থাকার কথা ৩৩৮ জন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে ১২৯টি পদ। সর্বশেষ তথ্যমতে, প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদার ১২৯ জনের মধ্যে কর্মরত ৯৩ জন। খালি রয়েছে ৩৬টি পদ। এছাড়া অন্যান্য পদের মধ্যে সহকারী সচিবের (এডি) পদ খালি রয়েছে ২৪টি, ডেপুটি পরিচালকের (ডিডি) খালি ৩টি পদ।

এ বিষয়ে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যমান জনবল কাঠামো দিয়ে সব প্রকল্পের পুরোপুরি তদারকি করা কঠিন। কারণ প্রকল্প যে হারে বেড়েছে, সেই হারে আইএমইডির সক্ষমতা বাড়েনি। এইএমইডি শক্তিশালী করার বিষয়টি নিয়ে অনেক আগে থেকেই কাজ চলছে। এর আগে সৃজিত পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো এখনো স্থায়ী হয়নি। পরিকল্পনামন্ত্রীর নির্দেশক্রমে আমরা যথাযথভাবে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কবে হবে সেটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে।’ তিনি বলেন, ‘বিকেন্দ্রীকরণের জন্য একটি জনবল কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। বিধি অনুসারে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অনুমোদন পাচ্ছে না।’

আলো দেখছে না বিভাগীয় বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব : আইএমইডি বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে একটি জনবল কাঠামো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে সেটা চিঠি চালাচালিতেই পার হয়ে গেছে ৯ বছর। আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগেও আইএমইডির শাখা খুলতে হলে জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিতেই হবে। নইলে তদারকি ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ করা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রতিটি বিভাগে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক, উপসচিব পর্যায়ের একজন জনপ্রশাসন ও মূল্যায়ন পরিচালক, একজন পরিবীক্ষণ পরিচালক, সহকারী সিনিয়র সচিব বা সহকারী সচিব মর্যাদার চারজন সহকারী বা উপপরিচালক, একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন করে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা থাকবেন। এছাড়া লজিস্টিক সহায়তার জন্য কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি কন্ট্রোলার, অফিস সহকারী হিসেবে সাতজন, ফটোকপি অপারেটর একজন, ড্রাইভার তিনজন, অফিস সহায়ক হিসেবে সাতজনকে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এছাড়া অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুজন নৈশপ্রহরীর কথাও বলা হয়েছে।

সরিষায় ভূত : জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইএমইডির কর্মকর্তারা ঢাকার বাইরে যেতে চান না। এজন্য তারাই চান না আইএমইডির বিকেন্দ্রীকরণ হোক। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর তারা একটু নড়াচড়া দেন, চিঠি চালাচালি করেন। কিন্তু পরে আবার থেমে যান।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি পাঠানো প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২৭-২৮ বিষয়ে তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এগুলো পাঠাচ্ছে না। সবই একটা নিয়ম ও আইন মেনে হয়। তারা এসব তথ্য না দিলে কাজ হবে কী করে?’

এ বিষয়ে আইএমইডির প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মাহমুদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইএমইডি একবারে গঠিত হয়নি। নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে গঠিত হয়ে এ পর্যায়ে এসেছে। ফলে জনপ্রসাশন বিভাগের ২৭-২৮ কোয়ারির অনেক উত্তরই আইএমইডির কাছে নেই। এটাই বাস্তবতা। এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জনপ্রশাসন বিষয়টি ছাড় দিলে বিকেন্দ্রীকরণ সহজেই হতে পারে। নইলে কঠিন হয়ে পড়বে।’

টেকসই উন্নয়নে শক্তিশালী আইএমইডি চান অর্থনীতিবিদরা : বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, উন্নয়নে যে অর্থ তছরুপ হচ্ছে, এটা সবাই জানে। এছাড়া যেভাবে মানহীনভাবে উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হচ্ছে, তাতে টেকসই উন্নয়ন কাগজে কলমেই থাকবে। এজন্য তদারকির জোরদারের বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে আইএমইডি শক্তিশালী করা জরুরি। নইলে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির লাগাম টানবে কে? এজন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যত দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যাবে, তত দেশের লাভ।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত