ঢাবি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ

ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি শিক্ষকদেরও

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৩৪ এএম

কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তারের খবরে ক্যাম্পাসে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি আরও জোরালো হয়েছে। এজন্য গতকাল বুধবার তৃতীয় দিনও বিক্ষোভে উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস। দিনভর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিবাদে

শামিল ছিলেন শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। গত রবিবারের ওই ঘটনার প্রতিবাদে গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড চায় শিক্ষক সমিতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। নির্যাতিত শিক্ষার্থীর পাশে থেকে সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষক সমিতির এক মানববন্ধনে এসব কথা বলা হয়। মানববন্ধনে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন সাদেকা হালিম, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন সানজিদা আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উপাচার্য বলেন, দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে আইনি কাঠামোর মধ্যে কোথাও ঘাটতি থাকলে সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্যাতিত ছাত্রীর পাশে থেকে সব ধরনের সহায়তা করবে। অধ্যাপক মাকসুদ কামাল বলেন, দেশের একটি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী যে জায়গায় নিরাপদ নয় সে জায়গায় মফস্বল এলাকার মেয়েরা কোন অবস্থায় আছে সেটা প্রমাণিত হয়। ধর্ষক আর রাজাকারের কোনো পার্থক্য নেই। যদি রাজাকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে ফাঁসি হয় তাহলে ধর্ষকেরও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- হওয়া উচিত।

দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি নারী শিক্ষার্থীদের : ধর্ষণে জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে নারীদের নিরাপত্তায় আট দফা দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক নারী সমাবেশে এসব দাবি জানানো হয়। সমাবেশে পাঁচটি নারী হলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। সমাবেশে সংহতি জানিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজলী সেহরীন ইসলাম, প্রভাষক মার্জিয়া রহমান, শামসুন্নাহার হল সংসদের সহ-সভাপতি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। নারী সমাবেশে আট দাবি হলোÑ ধর্ষণের দ্রুত বিচারে ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন; সকল আদালতে নারী নিপীড়ন সেল গঠন করে এক বছরের মধ্যে ধর্ষণের মামলার বিচার; টিএসসি থেকে সুফিয়া কামাল হল, গণতন্ত্র তোরণ থেকে সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউট পর্যন্ত ল্যাম্পপোস্ট ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন; বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের নিজস্ব ইস্যু নিয়ে কনসাল্ট করার জন্য ৪-৫ জন নারী শিক্ষক দিয়ে ফিমেল উপদেষ্টা নিয়োগ; নারী শিক্ষার্থীদের আইনি সহায়তার খরচ বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন; ক্যাম্পাস থেকে ভবঘুরে, নেশাখোর ও পাগলদের অপসারণ; ক্যাম্পাসের বাস স্টপেজগুলোর নিরাপত্তা পুনর্বিবেচনা করা ও ইমার্জেন্সিতে অনাবাসিক ছাত্রীদের হলে অবস্থান করার অনুমতি।’

সাদেকা হালিম বলেন, ‘ধর্ষণের মতো এ ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য আমাদের দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মনোভাব ও চলমান সংস্কৃতি সমানভাবে দায়ী। অবিলম্বে এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ কাবেরী গায়েন বলেন, সন্তানতুল্য ওই শিক্ষার্থীর সাহসের প্রশংসা করতে হয়। তার সাহস, আত্মবিশ্বাস নারী সমাজের জন্য অনুপ্রেরণা। আমাদের বিভক্ত হলে চলবে না। সামিনা লুৎফা বলেন, ‘দেশে প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় ধর্ষণ হচ্ছে কিন্তু সেগুলো আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কখনো একটি ধর্ষণমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।’

গতকাল সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসু। ‘নিপীড়নবিরোধী ডাকসু মঞ্চ’ থেকে ধারাবাহিক এই প্রতিবাদ জানানো হয়। ধর্ষণের প্রতিবাদে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা ‘ধর্ষণবিরোধী ফ্ল্যাশ মব’-এর আয়োজন করে। এছাড়া ইতিহাস বিভাগের আয়োজনে অপরাজেয় বাংলায় মানববন্ধন, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে জনসম্মুখে ধর্ষকের ফাঁসির দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

ঢাবি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা। তারা জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে মানববন্ধন, ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় মোমবাতি প্রজলন, বরিশালে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পঞ্চগড়ে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত