খেলার বল তুলতে গিয়ে ডিএনডি খালের পানিতে তলিয়ে যাওয়া শিশু আশামণির (৬) লাশ উদ্ধার হয়েছে। পাঁচ দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে খালের পানির নিচে জমা আবর্জনার স্তূপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দল।
পাঁচ দিনের টানা তল্লাশির একপর্যায়ে গতকাল দুপুর ১টার দিকে মোহাম্মদবাগ আদর্শ কলেজের পাশে কদমতলীর রায়েরবাগ এলাকার খালে আশামণির লাশ পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। পরে মা-বাবার উপস্থিতিতে আশামণির মরদেহ কদমতলী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১ ফেব্রæয়ারি বিকেলে কয়েকজন শিশুর সঙ্গে কদমতলীর মেরাজনগরের রায়েরবাগ-কদমতলী সড়কের পাশে ডিএনডির পয়ঃনিষ্কাশন খালের কালভার্টের ওপর বল নিয়ে খেলছিল আশামণি। খেলার একপর্যায়ে বলটি খালের পানিতে ভেসে থাকা আবর্জনার ওপর পড়ে আটকে যায়। সেখান থেকে বলটি তুলতে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যায় আশামণি। এরপর থেকেই ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাকে উদ্ধারে টানা অভিযান চালাচ্ছিল। কিন্তু খালের পানিতে জমে থাকা বিপুল আবর্জনার কারণে বারবার বাধার মুখে পড়ছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। আশামণিকে খুঁজে বের করতে তল্লাশি অভিযান আরও জোরদারের দাবিতে গত মঙ্গলবার মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেনাসদস্যরাও তল্লাশিতে অংশ নেন। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকাশ কুমার ভৌমিক শ্রমিক দিয়ে খালের ময়লা সরানোর ব্যবস্থা করেন।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) নজমুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত শনিবার বিকেলে ময়লাযুক্ত ডিএনডি খালে শিশুটি পড়ে যায়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ সংবাদ পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারে কাজ শুরু করে। কিন্তু সেদিন উদ্ধার করতে না পেরে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা উদ্ধার অভিযান চালায় ডুবুরিরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন থেকেই আমাদের দুটি ইউনিট ওই খাল থেকে শিশুটিকে উদ্ধারে তল্লাশি চালিয়ে আসছিল। কিন্তু নোংরা পানিতে জমে থাকা আবর্জনার কারণে কাজ করা যাচ্ছিল না। পুরো খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরা। মাঝে মাঝে ময়লার স্তর এমন হয়ে রয়েছে যে দেখে মনে হবে নিচে পানি নেই। কিন্তু কেউ পা দিলেই তলিয়ে যায়। শিশুটিও ওভাবেই তলিয়ে যায়। ময়লার কারণেই তাকে খুঁজে পেতে এত সময় লাগে। শিশুটিকে খুঁজে বের করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’
উদ্ধারের পরপরই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে আশামণির মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলেও জানান ডিএডি নজমুজ্জামান।
কদমতলী থানার এসআই কবির হোসেন জানান, আশামণির পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
আশামণি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে ওই খালের পাড় থেকে এক মুহূর্তের জন্যও ঘরে ফিরে যাননি মা তানিয়া ও বাবা এরশাদ মাতব্বর । আশামণির লাশ উদ্ধারের খবর শোনামাত্র উদ্ধারস্থলে ছুটে যান তার মা-বাবা, প্রতিবেশী, উৎসুক জনতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তখন সেখানে শিশুটির মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদে উপস্থিত অনেকেরই চোখে জল চলে আসে।
প্রতিবেশীরা জানান, এরশাদ-তানিয়া দম্পতির বড় মেয়ে আশামণি। তাদের বাসা মিরাজনগরের পাশের মোহাম্মদনগর কালভার্ট এলাকায়। আশামণি যেখানে তলিয়ে গিয়েছিল তার পাশেই এরশাদ মাতব্বরের একটি কনফেকশনারির দোকান রয়েছে। এ বছর মিরাজনগর ফারহা মডেল স্কুলের শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়েছিল আশামণিকে। তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে।
লাশ উদ্ধারের পর বাবা এরশাদ মাতব্বর বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার দুই সন্তানের মধ্যে আশামণি বড়। ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আশা ছিল, পড়ালেখা করে মেয়ে সরকারি বড় কর্মকর্তা হবে। স্কুলে ভর্তি করানোর পর মেয়ে নিয়মিত স্কুলেও যেত। লেখাপড়ার প্রতি ছিল অনেক আগ্রহ, দেখে খুব ভালো লাগত। কিন্তু এখন আমার পুরো ঘরই খালি হয়ে গেল।’
