মার্কিন-তালেবান চুক্তি : শান্তির সম্ভাব্যতা কতটুকু

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২০, ০৬:০৮ এএম

দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ইতিহাসে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আফগান যুদ্ধ দ্বিতীয় দীর্ঘতম। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ২০০১ সালে টুইনটাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর ওই বছরই আল-কায়েদার বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে অভিযান চালায়। প্রায় দুই দশকের যুদ্ধে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থ ও আড়াই হাজার সৈন্য হারিয়েও আফগান যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকে। আফগান যুদ্ধের চোরাবালি থেকে বের হতে ২০১১ সালে ওবামা প্রশাসনের উদ্যোগে তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু তা বেশি দূর এগোতে পারেনি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ বন্ধ করতে তৎপরতা শুরু করেন। সে লক্ষ্যেই মধ্যপ্রাচ্য তথা সিরিয়া ও আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশ দুটিতে সংঘাত বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বৈঠকে  বসার তৎপরতাও শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সাল থেকে তালেবানদের সঙ্গে কাতারের দোহায় অনেকবার আলোচনা হয়। সব শেষে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি তালেবানদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন এক সমঝোতায় পৌঁছায়। এই চুক্তির ভিত্তিতে আগামী ১৪ মাস আফগানিস্তানে তালেবানরা চুক্তির শর্ত মেনে চলবে। যদি ওই সময়ের মধ্যে তালেবানরা চুক্তি মেনে চলে, তাহলে আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি করবে এবং তাদের সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। মার্কিন-তালেবান চুক্তি হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা হচ্ছে, মার্কিন-তালেবানদের এই চুক্তি কি সফল হবে? কারণ চুক্তির পর থেকে আফগানিস্তানে বেশ কয়েকবার সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং মার্কিন বিমান হামলার ঘটনাও ঘটেছে। গত ৬ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতা আবদুল্লাহ আবদুল্লাহর এক জনসভায় বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনা ঘটে। যায় দ্বায় স্বীকার করেছে আইএস। এহেন পরিস্থিতিতে মার্কিন-তালেবান চুক্তি ভবিষ্যৎ ফল নিয়ে সংশয় দেখা দিচ্ছে। 

আফগানিস্তানে দুই দশক ধরে চলমান সংঘাত হঠাৎ করে শুরু হয়নি। দেশটিতে সংঘাতের ইতিহাস অনেক পুরনো। 
আফগানিস্তানে গোত্র ও সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা নেতৃত্ব রয়েছে। যারা এই গোত্র বা সম্প্রদায়গুলোর নেতৃত্ব দেন, তারা ওই গোত্র বা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে প্রভাবশালী ও সম্পদশালী ব্যক্তি। আফগানিস্তানে কেবল বৈদেশিক শক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংঘাত হয়, বিষয়টা এমন নয়। গোত্র স্বার্থের দ্বন্দ্বের জন্যও আফগানিরা সংঘাতে জড়ায়। ফলে আফগানিস্তানে সংঘাত বন্ধের জন্য কেবল তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতাই কাজে আসবে বলে মনে করা কঠিন। অন্যদিকে গোত্রভিত্তিক সংঘাত বন্ধ করে আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আফগানিস্তানে আজও সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। ফলে গোত্রভিত্তিক সংঘাতের সুযোগ নিতে পারে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সম্প্রদায়গুলো। অন্যদিকে তালেবানদের মধ্যেও নেতৃত্বের আনুগত্য নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব বড় কোনো বিষয় নয়। আর এসব অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ যেকোনো বহির্শক্তি নিতে চেষ্টা করবে তা স্বাভাবিক। ফলে আমেরিকা বা ন্যাটো জোট আফগানিস্তান থেকে চলে গেলেও আফগানিস্তানে নতুন কোনো আগ্রাসী শক্তি আসবে নাÑ এমনটা মনে করাও কঠিন। অন্যদিকে ভূ-রাজনীতির আধিপত্য বিস্তারের খেলায় আমেরিকা বা পশ্চিমা বিশ্ব কখনোই অন্য কারও কাছে এ অঞ্চলের ভার ছেড়ে দেবে না। এসব বিবেচনায় আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিন প্রশাসনের তোড়জোড় কতটা হালে পানি পাবে, সেটাও বিবেচ্য।

আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতির অন্যতম কারণ ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন-ভীতি। বর্তমানে সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। কিন্তু চীনÑআমেরিকা ও পশ্চিমা আধিপত্যকামী বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো নতুন আধিপত্যকামী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের আওতায় ভারতকে ঠেকাতে এই অঞ্চলে ‘মুক্তার মালা’নীতি নিয়েছে। যার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এশিয়ার আরেক উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ভারতকে মোকাবিলা করে ওই অঞ্চলের বাজার (অস্ত্র ও প্রযুক্তিপণ্য) দখল করে নেওয়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেও আঘাত হানবে। বর্তমানে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক শুভ সময় পার করছে। অন্যদিকে সাবেক মার্কিন মিত্র পাকিস্তান-চীন সম্পর্কও শুভ সময় পার করছে। আর এই চারটি রাষ্ট্রই একে অন্যের আধিপত্য ও স্বার্থবিরোধী। আফগান সংকটের পেছনে পাকিস্তানের বড় ভূমিকা রয়েছে। তালেবানসহ অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জন্মকালে মার্কিন-পাকিস্তানের সহায়তার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। এখন পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানদের আগের মতো সুসম্পর্ক না থাকলেও, মন্দ যাচ্ছে না। তাই মার্কিন-তালেবান চুক্তির মাধ্যমে আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার বিদায় মানে এই অঞ্চলে পাকিস্তানের সহায়তায় চীনের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বিষয়টা বুঝছে না এমন নয়। তারা চাচ্ছে একটি চুক্তি করতে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ইমেজ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তাই বর্তমান মার্কিন প্রশাসন তাদের স্বার্থের জন্য তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতায় এলেও পরবর্তী প্রশাসন কী করবে, সেটা ধোঁয়াটে। কারণ এ বছরের শেষেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর তালেবানদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করতে সময় নেওয়া হয়েছে ১৪ মাস।

তালেবানরা গণতন্ত্রের প্রতি দরদ দেখাচ্ছে এবং চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার। কিন্তু তালেবানদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা। অন্যদিকে বর্তমান আফগান সরকার এবং প্রধান বিরোধী দলের লক্ষ্য তালেবানদের সঙ্গে মেলে না। ফলে তালেবানদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির যে কথা বলা হচ্ছে, সেটা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটা নিয়েও সংশয় জাগে। কারণ, তালেবানদের পক্ষে তাদের লক্ষ্য থেকে সরে আসা সম্ভব নয়। যদি কখনো শান্তির স্বার্থে তারা সরে আসতেও চায়, তাহলে তাদের অভ্যন্তরেই সংঘাত সৃষ্টি হবে। যার আঁচড় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও এড়াতে পারবে না। অন্যদিকে নারী নেতৃত্ব ও নারী অধিকার নিয়েও তালেবানদের সঙ্গে আমেরিকার নীতির বিরোধ স্পষ্ট। এমনকি বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সঙ্গেও ওই নীতি নিয়ে তালেবানদের মতাদর্শগত বিরোধ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে দেশ চালাতে গেলে ওই বিষয়গুলোও সামনে আসবে।

অন্যদিকে ২০১৮ সাল থেকে মার্কিন-তালেবান শান্তি আলোচনায় বরাবরই আফগানিস্তানের সরকারকে বাইরে রাখা হয়েছে। কারণ তালেবানরা বর্তমান আফগান সরকারকে ‘মার্কিন পুতুল সরকার’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ভবিষ্যতে চুক্তি চূড়ান্ত হলে তালেবানরা তাদের আখ্যায়িত ‘পুতুল সরকারের’ সঙ্গে আলোচনায় বসবে কি না বা তাদের সঙ্গে দেশ চালানোর ভার নেবে কি না সেটাও ধোঁয়াটে। আর নিলেও তা কত দূর এগোবে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আর এভাবে চলতে পারে না, এটা আমেরিকা ও তালেবান উভয়েই বুঝেছে এবং তারা শান্তির পথে এগোতে চাচ্ছে। এখন তাদের শান্তির অভিপ্রায় ওই বিপত্তিগুলোর সমাধান করে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত