করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করলেও বিশে^র সব দেশের পুঁজিবাজার সচল রয়েছে। এর মধ্যে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। বড় ধরনের দরপতন ও ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে তারল্যের এই বাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। কৌশলগত বিনিয়োগকারীরাও বিদ্যমান পরিস্থিতির সুযোগে কম দরে শেয়ার কেনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, যার মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় বেড়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। এ সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন না করলেও জরুরি সেবা ছাড়া পুরো দেশের সব অফিস-আদালত, কল-কারখানাসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রাখা হয়েছে। জনসাধারণকে ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি ছুটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জও গত ২৬ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত লেনদেনসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। যদিও এ সময় সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য ক্লিয়ারিং হাউজ চালু রেখেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের নগদ অর্থের প্রয়োজন হলেও পুঁজিবাজার বন্ধ থাকায় তার কোনো সুযোগ থাকছে না।
২০১৮ সাল থেকে দেশের পুঁজিবাজারে টানা দরপতন হলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় চলতি বছরের মার্চ মাসের শুরু থেকেই বড় পতনের মুখে পড়ে। এতে ১৩ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক প্রায় ২০ শতাংশ হারায়। বাজার ফিরে যায় সাত বছর আগের অবস্থানে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সরকারের নির্দেশে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়, যার নিচে কোনো সিকিউরিটিজের মূল্য কমতে পারবে না। এর মাধ্যমে সূচকেরও নির্দিষ্ট পয়েন্টের নিচে পতন না হতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এমন সুরক্ষার পরও দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ রাখা হয়।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড পাবলিক পলিসি বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত গত ১৯ মার্চ এসইসি ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের নামে যেভাবে আর্টিফিশিয়ালি শেয়ার দর নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেদিন থেকেই পুঁজিবাজার অনানুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর উন্মুক্ত কেনাবেচা তেমন হয়নি। উন্নত কোনো দেশে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমি মনে করি বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে শেয়ার কেনাবেচার স্বাধীনতা পুঁজিবাজারে থাকা উচিত।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ইতালি। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণে ১৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে পুরো ইতালি লকডাউনে রাখা হয়েছে। তবে এর মধ্যেও পুঁজিবাজারের লেনদেন চালু রেখেছে দেশটি। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইতালিতে করোনাভাইরাসে তিনজন রোগী শনাক্তের খবর পাওয়া যায় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি করোনাতে প্রথম মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এরপর থেকে প্রতিদিনই ইতালিতে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর হারও বাড়তে দেখা গেছে।
১৯ ফেব্রুয়ারি ইতালি স্টক এক্সচেঞ্জের এফটিএসই এমআইবি সূচকটি ছিল ২৫০৩৮ পয়েন্টে। এরপর করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে সূচকটি ৪২ শতাংশ পয়েন্ট হারায়। অবশ্য মহামারীর মধ্যেই ১৭ মার্চ থেকে সূচক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা দেখা গেছে। গত দুই সপ্তাহে ইতালি স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকটি ১৬ শতাংশের বেশি বাড়তে দেখা গেছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে বিশে^র বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারগুলো বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে। এতে কিছু স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকে সার্কিট ব্রেকার থাকার কারণে সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ হয়ে গেলেও পরবর্তীতে তা আবারও চালু হয়েছে। কোনো কোনো স্টক এক্সচেঞ্জ বড় পতন ঠেকাতে সাময়িকভাবে সূচকে সার্কিট ব্রেকার সংশোধন, শর্টসেল বন্ধসহ কিছু সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু কোনো দেশই দীর্ঘ সময়ের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ করে দেয়নি। এমনকি করোনাভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীনও কোনো স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ করে দেয়নি। করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সাময়িকভাবে দরপতন হলেও পরবর্তীতে চীনের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতেও দেখা গেছে।
ইতালির পর প্রাণঘাতী করোনায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে স্পেনে। গতকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসের সংক্রমণে দেশটিতে ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। এর মধ্যেও পুঁজিবাজার চালু থাকায় বড় পতনের মধ্যে পড়ে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি স্পেন স্টক এক্সচেঞ্জের আইবিইএক্স ৩৫ সূচক ছিল ১০০৯৪ পয়েন্টে, যা ৫৯৩৯ পয়েন্টে নেমে আসে। এ সময়ে সূচকটি প্রায় ৪১ শতাংশ হারায়। তবে এরপর থেকে সূচক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ইউরোপের সব দেশের পুঁজিবাজার করোনার কারণে বড় ধরনের পতন হলেও পুঁজিবাজার চালু রেখেছে।
বিশে^র সবচেয়ে বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে ২ লাখ ১৫ হাজার করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছেন ৫ হাজার ১১৩ জন। আশঙ্কাজনক হারে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। রোগটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পরও দেশটির কর্তৃপক্ষ কোনো স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। যদিও গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান প্রধান সূচক ১৯ শতাংশ পর্যন্ত পয়েন্ট হারিয়েছে। করোনা সংকটে জাপান, ভারতসহ বিশে^র সব দেশের পুঁজিবাজারে দরপতন হলেও তা বন্ধ করা হয়নি। বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আবার কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা কম দরে শেয়ার কিনতে পেরেছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ডিএসইর লেনদেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে। এছাড়া ইন্টারনেটভিত্তিক লেনদেনের সুবিধাও রয়েছে। তবে ডিএসইতে ফোনে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি লেনদেনের আদেশ দেন। এছাড়া বিদেশিরা শেয়ার কেনাবেচার আদেশ ই-মেইলে দিয়ে থাকেন। আর কিছু সাধারণ বিনিয়োগকারী রয়েছেন, যারা ব্রোকারেজ হাউজে সশরীরে উপস্থিত থেকে শেয়ার কেনাবেচা করে থাকেন। তবে লেনদেন ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় ব্রোকারেজ হাউজে সশরীরে উপস্থিতির সংখ্যা নিয়মিত কমছে। তাই করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে ব্রোকারেজ হাউজে না এসেও লেনদেন করতে পারছেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু এসব সুবিধা থাকার পরও দরপতনের শঙ্কায় স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও এসইসির নির্দেশনায় তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজগুলোর ফ্লোর প্রাইসের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দর নির্ধারণ করায় সূচক পতনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
অবশ্য গত ১৯ মার্চ ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের পর থেকে ডিএসইতে লেনদেন তলানিতে নেমে আসে। এর আগে ডিএসইতে গড়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়, যা ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের পর ১০০ কোটি টাকার ঘরে (ব্লক ট্রেড বাদে) নেমে আসে। ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণে প্রায় সব সিকিউরিটিজের দর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। করোনা সংকট ও সর্বনিম্ন দর নির্ধারণ করায় ব্যাপক আকারের বিক্রিচাপে পড়ে দেশের পুঁজিবাজার। বিপরীতে উল্লেখযোগ্য ক্রেতা না থাকায় পুঁজিবাজার বন্ধের আগ পর্যন্ত অধিকাংশ সিকিউরিটিজের দর আগের মূল্যে অপরিবর্তিত থাকে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সানাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংকিং সেবার সময় কমিয়ে আনা ও করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে অধিক জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুঁজিবাজার বন্ধ রাখা হয়েছে। এ সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির অফিস বন্ধ থাকাসহ অন্য আরও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বাজার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় পরিচালনা পর্ষদ।
