চীন থেকে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের কিট চোরাইপথে এনে অবৈধভাবে বাজারজাত করছে একটি চক্র। অধিক লাভের আশায় এসব কিট মজুদের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা গোপনে এসব কিট দিয়ে করোনাভাইরাস টেস্ট করছেন। যা সর্বসাধারণের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে বেশি লাভের আশায় একাধিক চক্র চীন থেকে এসব কিট চোরাইপথে আমদানি করেছে। কেউ লাগেজে আবার কেউ ডিএইচএলসহ বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব কিট এনেছে। তবে সেগুলো আসলেই নির্ভুলভাবে করোনা শনাক্ত করা সম্ভব কি না সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে র্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারা কী উদ্দেশ্যে করোনা শনাক্তকরণ কিট অবৈধভাবে নিয়ে এসেছে সেটা নিয়ে আমাদের তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে আমরা ৮-৯ জনের একাধিক গ্রুপ শনাক্ত করেছি। তাদের কয়েকজনকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা মূলত অধিক মুনাফার আশায় চীন থেকে এসব কিট চোরাচালানোর মাধ্যমে এনেছে। তাদের ধারণা কিছুদিনের মধ্যে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করোনা পরীক্ষা করা শুরু হবে। তখন তারা এসব কিট অধিক দামে বিক্রি করবে। তারা এসব কিট নিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক মালিকদের কাছে ধরনা দিচ্ছে। কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক এসব কিট কিনে বাড়তি দাম দিয়ে কিনছে এবং গোপনে করোনাভাইরাস টেস্টের কাজ করছে।’
সারোয়ার আলম আরও বলেন, ‘এসব কিট যদি মানসম্মত হয় সেটা একটা কথা। আমরা না হয় আইনগত দিকটা দেখতাম; কিন্তু মানসম্মত না হলে এসব কিট দিয়ে করোনা টেস্ট করে ভয়ানক পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। তাই অবৈধভাবে আনা এসব কিট কোনোভাবেই বাজারজাত করতে দেওয়া উচিত নয়। আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। আশা করছি আমরা দুয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাব।’
করোনাভাইরাস নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। জ্বর, কাশি বা সর্দি ও গলাব্যথা হলেই সবাই ভয় পাচ্ছেন। চাইছেন করোনা পরীক্ষা করাতে। আবার আইইডিসিআর বা অন্য কোনো হাসপাতালে গিয়ে করোনা পরীক্ষার বিষয়ে অনেকের মধ্যে নানা ধরনের ভয় ও আতঙ্ক কাজ করে। আবার বাসাবাড়িতে বা সামাজিকভাবেই করোনা রোগীকে ভিন্ন চোখে দেখা হয়। অনেকে বাড়িতে থাকতে দিতে চায় না। আর এ সুযোগকে অসাধু চক্র বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চোরাইপথে আনা নিম্নমানের কিট দিয়ে করানো পরীক্ষা করাচ্ছে। যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিকে আরও মারাত্মক করে তুলবে।
চোরাইপথে করোনা শনাক্তকরণ কিট আনার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই ধরনের করোনা পরীক্ষার কিট আছে। একটি “পিকচার ল্যাব কিট” আরেকটি “র্যাপিড টেস্ট কিট”। সরকার পিকচার ল্যাব কিট ব্যবহার করছে। এটা দিয়ে করোনা পরীক্ষা করলে নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়। র্যাপিড টেস্ট কিট অনেক ক্ষেত্রেই ভুল তথ্য দেয়। যেটা বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি সরকারের কাছে বিক্রি করতে চেয়েছিল কিন্তু সেটা আমরা সংগ্রহ করিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের কিট ক্রয়-বিক্রয় আইনত দ-নীয় অপরাধ।’
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংক্রমণ রোগ (প্রতিরোধ ও নির্মূল) আইন অনুসারেও যে কেউ ইচ্ছে করলে সংক্রমণ রোগের পরীক্ষা করতে পারবে না। অনেকে নিজে পরীক্ষা করে আক্রান্ত হলে গোপন রাখে। তাই এ ধরনের পরীক্ষা সিভিল সার্জনের নির্দেশনা অনুযায়ী করতে হবে। আক্রান্তদের তথ্য সংরক্ষণ করে নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। যাতে আক্রান্ত কেউ অন্যদের সংক্রমিত করতে না পারে। আইনে আরও বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা ভুল তথ্য দেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কাজ হবে একটি অপরাধ। অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ২ (দুই) মাস কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ২৫ (পঁচিশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
এদিকে সম্প্রতি পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে করোনা শনাক্তের কিট উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ডিএইচএল ব্যবহার করে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধভাবে আনা হচ্ছে এসব কিট। গত ১৬ এপ্রিল রাজধানীর বাংলা মোটরে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু কিট জব্দ করে পুলিশ। পরে গত মঙ্গলবার রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার শহীদবাগ ও খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে করোনা শনাক্তের প্রায় ১ হাজার ২০০টি কিট উদ্ধার করে র্যাব। এসব কিট দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছিল বলে জানায় র্যাব।
শহীদবাগে অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই কয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কিট সংগ্রহ করেছিল। যা আইনত অবৈধ। আশঙ্কার সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এসব কিটের কোনো মান নেই। তারপরও তারা এসব কিট বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছিল। যা সাধারণ মানুষের জন্য জীবনহানিকর। এ অপরাধে জড়িত থাকায় পাঁচজনকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব কিট বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছিল। কীভাবে পরীক্ষা করবে তারা সেটাও জানত না। শুধু ব্যবসায়ী হিসেবে বেশি দামে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে জেলা-উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তারা সেগুলো পাঠাচ্ছিল। এ চক্রের একটি ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল আছে।’ তিনি আরও বলেন, দেশেই এসব কিট নকলভাবে তৈরি করা হয়েছে কি না আমরা সেটা খতিয়ে দেখছি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া করোনা পরীক্ষার কিটগুলো অনেকটা ডায়াবেটিসের টেস্টের কিটের মতো। টেস্টিং কিটে তিন ফোটা রক্ত দিলে বোঝা যায় করোনা পজিটিভ নাকি নেগেটিভ। কিন্তু এ কিট অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ফলাফল দেয় না। দেখা গেল, করোনা আক্রান্ত কারও ফলাফল নেগেটিভ এলে তিনি সাধারণভাবে ঘুরে বেড়িয়ে অনেকের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেবেন। ফলে নিম্নমানের এসব কিটে করোনা সংক্রমণ আরও বাড়বে।
চোরাইপথে কিট আনা বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সাংবাদিকদের বলেন, ‘খোলাবাজারে যেসব কিট বিক্রি হচ্ছে সেসব কিট মেশিনে পরীক্ষার সুযোগ নেই। আমরা খুবই নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পুরো কাজটি করছি। তাছাড়া আমাদের কিট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে সংগ্রহ করা যা খুবই উন্নতমানের। আর করোনা পরীক্ষার মেশিনগুলো সরকারের বিভিন্ন হাসপাতালেই আছে। যত্রতত্র ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করোনা পরীক্ষা করা হলে এর ফল হবে ভয়ানক।’
স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের (স্বাচিপ) সাধারণ সম্পাদক এমএ আজিজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘চোরাইপথে আনা কিট বাজারে বিক্রি করা নিষেধ। সরকারের টেকনিক্যাল কমিটি বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুমোদিত যেসব কিট সেগুলো ব্যবহারের মাধ্যমেই করোনা শনাক্ত সঠিক হবে। অন্য কিট দিয়ে এসব হবে না। কারা এগুলো দিয়ে পরীক্ষা করছে সরকারের অবশ্যই দেখা উচিত।’
