লিবিয়ায় ২৬ নিহতের বেশিরভাগই মাদারীপুরের

স্বজনরা দিয়েছিলেন মুক্তিপণের টাকাও

আপডেট : ৩০ মে ২০২০, ০৬:০৮ এএম

লিবিয়ায় জিম্মি দশায় গুলিতে হতাহত বাংলাদেশিদের তালিকা প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শুক্রবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি আহতদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে তাদের পরিচয়। বাকিদের পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। আহত ১১ জন এবং আত্মগোপনে থাকা একজনের পরিচয়ও জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিহতদের মধ্যে আছেন মাদারীপুরের ১১ জন। তারা হলেন রাজৈর উপজেলার বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালী ইউনিয়নের শামীম এবং মাদারীপুর সদরের জাকির হোসেন, জুয়েল ও ফিরোজ। এদের মধ্যে জুয়েল ও মানিকের পরিবার মুক্তিপণ হিসেবে রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের জুলহাস শেখকে ১০ লাখ করে টাকাও দিয়েছে। গতকাল ওই হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে জুলহাস শেখের বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটে। পরে নিজেকে করোনা রোগী দাবি করলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। 

জুয়েল হাওলাদারের পিতা রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, আমার ছেলেসহ রাজৈরের বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজনকে দালাল চক্র লিবিয়া নেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪-৫ লাখ টাকা চুক্তি করে নিয়ে যায় ৩-৪ মাস আগে। তারপর লিবিয়ার ত্রিপলি না নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। ভয়েজ রেকর্ডে নির্যাতনের শব্দ পাঠিয়ে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে। জুলহাস শেখের বাড়িতে গিয়ে ১০ লাখ টাকা দিয়ে আসি।

একই গ্রামের নিখোঁজ মানিক হাওলাদারের পিতা শাহ আলম হাওলাদার বলেন, আমার ছেলে মানিককে লিবিয়া নেওয়ার কথা বলে দালাল জুলহাস আমার কাছ থেকে প্রথমে ৪ লাখ টাকা নিয়েছে। পরে ছেলেকে আটকে রেখে ভয়েজ রেকর্ডের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। আমি আমার ছেলেকে আনতে জুলহাসের বাড়ি গিয়ে টাকা দিয়ে আসি।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশির হত্যার কথা শুনেছি। যাদের মধ্যে মাদারীপুরের লোকজনই বেশি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুসারে নিহতদের মধ্যে সাতজনের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। ওই জেলার ভৈরব উপজেলার রাজন, শাকিল, সাকিব মিয়া, সোহাগ, আকাশ ও মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে প্রাণ গেছে হোসেনপুর উপজেলার রহিমের। এছাড়া গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল, মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার নারায়ণপুরের লাল চান্দ, ঢাকার আরফান এবং যশোরের রাকিবুল রয়েছেন নিহতদের মধ্যে।

আহত ১১ জনের মধ্যে গুলিবিদ্ধ ছয়জন হলেন মাদারীপুর সদরের তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারি (হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ), ফরিদপুরের ভাঙ্গার দুলকান্দি গ্রামের মো. সাজিদ (পেটে গুলিবিদ্ধ), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শম্ভপুর গ্রামের মো. জানু মিয়া (পেটে গুলিবিদ্ধ), গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা বাড়ির ওমর শেখ (হাতে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ), চুয়াডাঙ্গার বাপ্পী (মাথায় গুলিবিদ্ধ) এবং ভৈরবের জগন্নাথপুর গ্রামের মো. সজল মিয়া (হাতে গুলিবিদ্ধ ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন)।

আহতদের মধ্যে মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার নারায়ণপুরের মো. তরিকুল ইসলাম (২২), চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বেলগাছির খেজুরতলার মো. বকুল হোসাইন (৩০), মাদারীপুরের রাজৈরের নারায়ণপুরের মো. আলী (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সখিপুরের মওটুলীর সোহাগ আহমেদ (২০) এবং মাদারীপুরের রাজৈরের ইশবপুরের মো. সম্রাট খালাসী (২৯) স্থিতিশীল অবস্থায় সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আত্মগোপনে থেকে হামলার বিষয়ে দূতাবাসকে তথ্যদাতা সায়েদুল ইসলামের বাড়িও মাদারীপুরে।

এর আগে আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিজদাহে অন্তত ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার নেপথ্যে মুক্তিপণ বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৫ দিন আগে লিবিয়ার বেনগাজী থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ত্রিপলিতে নেওয়া হচ্ছিল ৩৮ বাংলাদেশিকে। পথেই তাদের জিম্মি করে লিবিয়ার মিলিশিয়া বাহিনী। জিম্মি অবস্থায় নির্যাতনের শিকার অপহৃতদের হাতে গত বুধবার মিলিশিয়া বাহিনীর এক সদস্য নিহত হওয়ার পর ‘প্রতিশোধ’ নিতে হত্যা করা হয় জিম্মিদের। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই মিলিশিয়া বাহিনী অপহরণকৃত বাংলাদেশিদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন নিহত হন। সে সময় আক্রান্তদের মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশি টেলিফোনে দূবাবাসকে জানান, তিনি একজন লিবিয়ানের আশ্রয়ে আত্মগোপনে আছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত