রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এবং এর আশপাশ এলাকায় নকশাবহির্ভূত ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ৩০০টি দোকান উচ্ছেদ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গতকাল মঙ্গলবার এই উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে পুলিশ-ব্যবসায়ীদের হামলা পাল্টা-হামলায় ফুলবাড়িয়া এলাকা অনেকটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত থেমে থেমে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলে। এ সময় পুলিশ লাঠিপেটার পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। ব্যবসায়ীরাও পুলিশ ও ডিএসসিসির উচ্ছেদকর্মীদের ওপর বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। তবে বাধার মুখেও ডিএসসিসি প্রায় ৩০০ অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে। অভিযানের পর থেকে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডিএসসিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ ও আশপাশ এলাকায় নকশাবহির্ভূত ও অবৈধভাবে ৯১১টির দোকান গড়ে ওঠে। করপোরেশন থেকে সেগুলো উচ্ছেদে গতকাল অভিযান শুরু করা হয়। দোকান উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়ে অভিযানকারীরা। তারা একজোট হয়ে পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশ-সাংবাদিকসহ তিনজন আহত হন।
সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল বেলা ১১টার দিকে ডিএসসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান, এএইচ ইরফান উদ্দিন আহমেদ ও তানজিলা কবির ত্রপার নেতৃত্বে ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেটের ব্লক-এ, ব্লক-বি ও ব্লক-সিতে অভিযানের শুরু হয়। অভিযান বন্ধ করতে ব্যবসায়ীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা বেশ কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর চালান। একই সঙ্গে অভিযান বন্ধ করতে সেøাগান দিতে দেখা যায়। তবে ব্যবসায়ীদের বাধা উপেক্ষা করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক্সকাভেটর দিয়ে মার্কেটের নগর প্লাজার সামনের ফুটপাতে থাকা একটি দোকান ভাঙা শুরু করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হন দোকানিরা। তারা চারপাশ থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। শুরুতে পুলিশ পিছু হটে। পরে কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় পুলিশ। পরে এক্সকাভেটর দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় দোকানগুলো।
ম্যাজিস্ট্রেট এএইচ ইরফান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করে কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছি। অবৈধ অন্য দোকানগুলোও উচ্ছেদ করা হবে।’
ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর এ বিপণিবিতানে ৯১১টি নকশাবহির্ভূত দোকান আছে। যার মধ্যে কিছু দোকান বিপণিবিতানের শৌচাগার, লিফটের জায়গা ও মানুষের হাঁটার পথে তৈরি করা হয়েছে। তবে দোকানদারদের দাবি, সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের সময় নকশাবহির্ভূত এসব দোকান বৈধ করতে তারা লাখ লাখ টাকা দিয়েছেন। দোকানগুলো থেকে ডিএসসিসি এতদিন ভাড়াও নিয়েছে। এখন কোনো ধরনের নোটিস ছাড়াই দোকান উচ্ছেদ করার জন্য এসেছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয় বা নগর ভবনের ঠিক উল্টোপাশে এ বিপণিবিতানটির অবস্থান। এতে তিনটি ভবন রয়েছে। এগুলো এ, বি ও সি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। তবে দোকানিরা এ-ব্লকের নাম দিয়েছেন সিটি প্লাজা, বি-ব্লকের নগর প্লাজা এবং সি-ব্লকের নাম দিয়েছেন জাকের সুপার মার্কেট।
দোকানিদের দাবি, সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও তার আগের আমলে নকশাবহির্ভূত এসব দোকান করা হয়। এসব দোকান বৈধ করার জন্য লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন।
তবে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের আগে দোকান মালিকদের নোটিস দেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিপণিবিতানটির নকশা অনুযায়ী এ-ব্লকে ১৭৬টি দোকান, বি-ব্লকে ১৭৬টি, সি-ব্লকে ১৭৯টিসহ মোট ৫৩১টি দোকান থাকার কথা। কিন্তু নকশাবহির্ভূতভাবে এ-ব্লকে ৩০৮টি, বি-ব্লকে ২৯২টি এবং সি-ব্লকে ৩১১টি দোকান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বিপণিবিতানের নকশাবহির্ভূত দোকান এবং এর সার্বিক পরিস্থিতি জানতে একটি কমিটি গঠন করে দেন। করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের এই কমিটি বিপণিবিতানে নকশাবহির্ভূত ৯১১টি দোকান চিহ্নিত করে এবং সেগুলো উচ্ছেদের সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশে মেয়র সম্মতি দিয়ে নকশাবহির্ভূত দোকান উচ্ছেদের নির্দেশনা দেন।
উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ সহযোগিতা করে।
