এক বছরে ঋণ অবলোপন বেড়েছে ৫৫৪ কোটি টাকা

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:৩২ এএম

আদায়ের সম্ভাবনা না থাকায় ২০২০ সালে ৫৫৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের অবলোপন করা খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ২০২০ সালে ঋণ অবলোপনের হার বেড়েছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অবলোপন বাড়লেও প্রকৃত পক্ষে খেলাপি ঋণ কমবে না।

মন্দমানের খেলাপি ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্স সিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেওয়াকে ব্যাংকিং পরিভাষায় ঋণ অবলোপন বলে। আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের  তথ্য মতে, ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের স্থিতি ছিল ১৯ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ২০১২ সালের একই সময়ে তা কমে ১৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। ওই এক বছরে স্থিতি কমেছিল ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। যা ওই সময়ে মোট অবলোপনের ১৫ শতাংশ ছিল। এরপর থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিবছর অবলোপনের স্থিতি বেড়েছে। ২০১৩ সালে স্থিতি ছিল ২৫ হাজার ৩২০ কোটি, ২০১৪ সালে ৩২ হাজার ১১০ কোটি, ২০১৫ সালে ৩৭ কোটি ৬৫০ কোটি, ২০১৬ সালে ৪২ হাজার ২৬০ কোটি, ২০১৭ সালে ৪৫ হাজার ৫৩০ কোটি ও ২০১৮ সালে অবলোপনের স্থিতি ছিল ৪৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৮ সালে অবলোপন করা ঋণের তুলনায় ২০১৯ সালে বেসরকারি খাতের ঋণ অবলোপন কমলেও ২০২০ সালে বেড়েছে। খেলাপি ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে ব্যাংকের খাতা থেকে বাদ দেওয়া এসব ঋণ যোগ করলে দেশের মোট খেলাপি ঋণ এক লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।  বাংলাদেশ ব্যাংক গত বুধবার খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। যা এ খাতের বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, করোনা মহামারীর মধ্যে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে ব্যাংকঋণের আদায়ের ওপর শিথিলতার কারণে খেলাপি ঋণ এক বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা কমেছে। তবে ঋণ অবলোপন করা হয়েছে পুরনো খেলাপি ঋণগুলোকে।

আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। এ ধরনের ঋণগ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। তবে একটি সময় যে কোনো অঙ্কের খেলাপি ঋণ অবলোপনের আগে মামলা করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে অনেক সময় মামলার খরচের চেয়ে বকেয়া ঋণ কম হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এ নীতিমালা শিথিল করে মামলা না করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনের সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইসঙ্গে মন্দমানে পরিণত হওয়ার তিন বছর পর ঋণগুলো অবলোপন করা যাবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগে এই সময় ছিল পাঁচ বছর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণ ৬ মাস অনাদায়ী থাকলে প্রথম ধাপে নিম্নমানে খেলাপি করা হয়। ওই ঋণটি ৯ মাস পর্যন্ত অনাদায়ী থাকলে সন্দেহজনক মানে খেলাপি এবং ১২ মাস অনাদায়ী থাকলে তা মন্দ বা ক্ষতিজনক মানে খেলাপি করা হয়।

আন্তর্জাতিক চর্চা অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ পর্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা ধরা হয়। এ কারণে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পরিষ্কার দেখাতে খেলাপি ঋণ কমানোর সহজ পথ হিসেবে অবলোপনকে বেছে নিচ্ছে অনেক ব্যাংক।

তবে ঋণ অবলোপন বাড়লে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে গিয়ে লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ কমে যায় ব্যাংকগুলোর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোতে করোনা মহামারীতে বিশেষ সুবিধা এবং নানা ছাড়ের ফলে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমলেও প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১১টি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। যার সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংকের।

জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যাংকের স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিলেও তা আর্থিক প্রতিবেদনের একটি জায়গায় আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। তাছাড়া খেলাপি গ্রাহকও যে এর ফলে পার পেয়ে যাবে তা নয়। ফলে অবলোপন বাড়লে প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণ কমবে না। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলাদাভাবে যখন কেবল খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে তার মধ্যে অবলোপন করা ঋণ না ধরায় প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র স্পষ্ট হয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত