চলমান সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছর। কিন্তু এ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। এভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চলের চলমান ৭টি প্রকল্প ঘুরে বাস্তবায়নে গড়িমসির প্রমাণ পেয়েছেন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী। গত ২৯-৩১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন ও মতবিনিময় শেষে এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন তৈরি করেছেন তিনি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নির্মাণকাজে চরম অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। আড়াই বছরে প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু কার্যাদেশ দেরিতে পাওয়ায় এমন ধীরগতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ৬ তলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণকাজ, মেয়াদ সম্পন্ন হলেও এই ভবনটির নির্মাণকাজের অগ্রগতি মাত্র ২২ শতাংশ। একই প্রকল্পের আওতাধীন ৬ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণকাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশ। এছাড়া ৪ তলা ছাত্রী হোস্টেল ভবন নির্মাণকাজে অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ, ৬ তলা ওয়ার্কশপ ভবন নির্মাণকাজে ২০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। আর মেয়াদ শেষ হলেও ৫ তলাবিশিষ্ট ডরমিটরি ভবন ও ৩ তলা স্টাফ কোয়ার্টার ভবন নির্মাণকাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০১৮ সালের জুন থেকে শুরু হয়ে ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। অথচ এর কার্যাদেশ প্রদান করা হয় ২০২০ সালের মার্চ মাসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির বাস্তবায়নে ধীরগতির সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আরও নিবিড় তদারকি প্রয়োজন। প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে ঠিকাদারের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করার জন্য বলা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ১টি পরিত্যক্ত ভবন আছে। ভবনটি অপসারণ করা হচ্ছে। তবে কাজের গতি কম। বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজের বর্তমান অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয় বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার দ্রুত বাড়াতে বিভাগীয় উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিকে অবহিত করার কথা জানিয়েছে আইএমইডি।
এ প্রসঙ্গে আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির আলোকে এসব প্রকল্প পরিদর্শনে যাই। এ সময় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে। বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে এগুলোর সমাধানের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ারও চেষ্টা করা হবে। কিন্তু বাস্তবায়নে গড়িমসি গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, চলমান প্রকল্পগুলোর যথাসময়ে সমাপ্তকরণ ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে মাঠ পযর্য়ায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ বাড়ানো উচিত। নইলে এই গড়িমসি কাটানো যাবে না।
আইএমইডি প্রতিবেদন অনুসারে, ‘বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতাল আধুনিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ হাসপাতালের নির্মাণ’ প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কাজের মান ভালো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, ফিটিংসগুলোও ভালো। তবে ভবনটি ৪ তলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট বিধায় এটির একতলার বেশি ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ সম্ভব হবে না। হাসপাতালটিতে ৫০টি বেডের সংস্থান রয়েছে। বিভাগীয় শহরের হাসপাতাল হিসেবে এই সংখ্যা অপ্রতুল। পুলিশ অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পের কাজ করছে।
৫টি র্যাব কমপ্লেক্স এবং একটি র্যাব ফোর্সেস ট্রেনিং স্কুল কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় র্যাব-১৪ কমপ্লেক্স ময়মনসিংহ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পুলিশ অধিদপ্তর (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। উক্ত প্রকল্পের আওতায় ৫টি র্যাব কমপ্লেক্স ও একটি র্যাব ফোর্সেস ট্রেনিং স্কুল স্থাপনের সংস্থান রয়েছে, যার একটি র্যাব-১৪ কমপ্লেক্স ময়মনসিংহ স্থাপন। জিওবি অর্থায়নে কার্যাদেশ অনুযায়ী এই অংশের কাজ শেষ হওয়ার কথা গত বছরের জুলাইয়ে, কিন্তু এখনো কাজটি সমাপ্ত হয়নি। নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত ৬ মাস পার হলেও এখনো কাজ শেষ হয়নি।
সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় পানির উৎস স্থাপন প্রকল্পে ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ৩ হাজার ৭৭০টি নলকূপ বসানো হবে । কাজের অগ্রগতির হার ৫৭ শতাংশ। ৩২টি পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ৪টি পরীক্ষামূলক নলকূপ, ২টি উৎপাদক নলকূপ ও ২টি পাম্প হাউজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (ময়মনসিহং জোন) এর উন্নয়ন কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। চলতি বছরের জুন মেয়াদে এটির কাজ শেষ করার কথা। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৬৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৩৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫০ শতাংশ।
ত্রিশাল-বালিপাড়া-নান্দাইল (কানুরামপুর) জেলা সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ১০৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ জেলার ১৩ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং কিশোরগঞ্জ জেলার ৯ কিলোমিটার মোট ২২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার সড়ক ৫ দশমিক ৫০ মিটার থেকে ৭ দশমিক ৩০ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করা হচ্ছে। প্রকল্পের এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৮৫ দশমিক ৬১ শতাংশ, তন্মধ্যে ভৌত অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ।
ভালুকা-গফরগাঁও-হোসেনপুর সড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২১৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ জেলায় ভালুকা ও গফরগাঁও উপজেলার ৩২-৮৫ কিলোমিটার সড়ক ৩ দশমিক ৭ মিটার ও ৫ দশমিক ৫ মিটার থেকে ১০ দশমিক ৩ মিটার প্রশস্ততায় উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পের ৩টি প্যাকেজের সবকটিরই কাজ চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৪৯ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্ধারিত সময়ে কাজ সমাপ্ত করা যাবে না আরও অন্তত ৬ মাস প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হবে।
