কাবুলের হঠাৎ পতন ও আফগানিস্তানের ক্ষমতা তালেবানের হাতে চলে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার দীর্ঘদিনের মিত্ররা বেকায়দায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ক্ষমতাবৃত্তের যে চর্চা করেছে, আফগানিস্তানে পরাজয়ের কারণে সেই ক্ষমতায় টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে যা মেনে নিতে পারছে না মিত্ররা। ফলে মিত্রদের তরফ থেকে যাবতীয় চাপ পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওপর। তাকে গতকাল বলতে শোনা যায়, যত দ্রুত আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেওয়া যায় ততই ভালো। প্রেসিডেন্টের এমন বক্তব্যই বলে দিচ্ছে আফগানিস্তান ইস্যুতে ব্যাপক বেকায়দায় বাইডেন। ৩১ আগস্টের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য ও নিজেদের সহায়তাকারী আফগানদের যুক্তরাষ্ট্র সরাতে পারবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। জি-৭-এর বৈঠকে জোটের নেতারা তালেবান নেতাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন যে, তারা যেন ৩১ আগস্টের পরও আফগানদের দেশ ছাড়তে অনুমতি দেয়। অবশ্য তালেবানরা জি-৭ নেতাদের এমন আহ্বানের বিপরীতে কোনো বক্তব্যই দেয়নি। এ বক্তব্য না দেওয়ার কারণ তাদের কাছে জি-৭-এর গ্রহণযোগ্যতা না থাকা। আফগানিস্তানকেন্দ্রিক বর্তমান রাজনীতিতে সবচেয়ে ক্রিয়াশীল শক্তি চীন ও রাশিয়া। অথচ এ দুটি রাষ্ট্রই নেই জি-৭-এ। ফলে আফগানিস্তানকেন্দ্রিক কোনো সিদ্ধান্ত ওই দুই দেশকে ছাড়া এখন নেওয়া সম্ভব হবে না। আর এতেই বিপত্তি বাইডেন ও তার মিত্রদের।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইউরোপ এখন তাদের পরাজিত শক্তি হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিলে আফগানিস্তানে যে সংকট দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছে, আজ যুক্তরাষ্ট্র নিজের সুবিধামতো সেই সংকট থেকে বের হয়ে এলেও, বিপদে পড়েছে মিত্ররা। কারণ তাদের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আফগান মাটিতে রেখে হুট করে বের হয়ে যাওয়া এককথায় কঠিন। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়, তখন সমস্যার সৃষ্টি হয় ইউরোপে, যুক্তরাষ্ট্রে নয়।’
যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই ইউরোপকে পাশে রেখেছে জাতিসংঘ ও ন্যাটোর মাধ্যমে। ইউরোপ তার সীমান্ত সমস্যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আটকা। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেখানেই যুক্তরাষ্ট্র দখলদারিত্ব চালিয়েছে, সেখান থেকেই আসা শরণার্থী ঢল প্রথম সামাল দিতে হয় ইউরোপকেই। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রও ইউরোপকে বাণিজ্য করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু ইউরোপের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন শরণার্থীবিরোধী, তারা আর নতুন করে শরণার্থী নিতে চায় না।
সমালোচকদের মতে, বাইডেন ক্ষমতায় বসার পর থেকে যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন তাতে মিত্রদের মতামত গুরুত্ব পায়নি। বাইডেন বলেছেন তার দেশ এক দশক আগেই আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদবিরোধী মিশনে সফলতা পেয়েছে। তাহলে ওই সফলতা পাওয়ার পরও কেন এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সেনারা আফগানিস্তানে ছিলেন, এমন প্রশ্নের উত্তর ধোঁয়াশায় পূর্ণ। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক দপ্তরের প্রধান মার্ক লিওনার্দ বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে একটি যুগের শেষ হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক ক্ষমতা কাঠামোর সূচনা হতে যাচ্ছে। আর এই কাঠামোতে প্রতিযোগী দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।’ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা গত পাঁচ বছর ধরেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করছে বিভিন্ন ফোরামের মাধ্যমে। চীনও এ সুযোগ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষমতার দৌড়ে পেছনে ফেলতে। অনেক জায়গায় ইতিমধ্যে সফলতাও পেয়েছে চীন, যার জলজ্যান্ত উদাহরণ আফগানিস্তান।
