মূল্যস্ফীতির চাপে কেবল দরিদ্ররাই নয় মধ্যবিত্তও

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৪০ পিএম

করোনার কারণে বদলে গেছে বিশ্ব। নিত্যনতুন শঙ্কায়, ভয়ে গুটিয়ে আসছে মানুষের যত সংগ্রাম ও সংকল্প। বাড়ছে ক্ষুধা-অপুষ্টি, দৈহিক ও মানসিক রোগ, সর্বব্যাপী হাহাকার। করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা কমলেও করোনার বিষক্রিয়া থেকে এখনো মানুষ পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। এখনো অনেকের ঘরে খাবার নেই। কাজ নেই। কাজ থাকলেও বেতন-ভাতা-মজুরি নেই। এই চিত্র গোটা পৃথিবীর! আর এই পরিস্থিতিতে দেশে দেশে অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে। উৎপাদন কমে যাওয়াসহ নানা উপসর্গে ভুগছে বিশ্ব অর্থনীতি। এশিয়া থেকে আমেরিকা এমনকি ইউরোপের দেশগুলো পর্যন্ত এখন ধুঁকছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিশ্ব জুড়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ক্রমবর্ধমান। জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের এক সূচক অনুযায়ী, গত বছর জুলাইয়ে খাদ্যপণ্যের যা দাম ছিল, তার তুলনায় এ বছরের জুলাই মাসে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যস্তরে বৃদ্ধি ঘটেছে ৩১ শতাংশ। আমাদের দেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। করোনার আবহে অর্থনীতির বেহাল দশাও এখনো কাটেনি। করোনার আঘাতে শুধু যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, তা নয়। নানা সময়ে ঘোষিত লকডাউনের প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির ওপরও। এই আবহে দেশে মূল্যস্ফীতির হারও ক্রমাগত বাড়ছে।

একদিকে মহামারীর ফলে বহু ক্ষেত্রেই উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে; অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেল, চিনি ও খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে হরেক দেশের নীতিবদলের মতো নানা কারণ এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। খাদ্যদ্রব্যের এই মূল্যবৃদ্ধি ২০০৮ এবং ২০১১ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যখন এই কারণে আফ্রিকা ও এশিয়ার ত্রিশটিরও বেশি দেশে ব্যাপক খাদ্য-সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। ‘আরব বসন্ত’-এর মতো রাজনৈতিক অভ্যুত্থানেরও অন্যতম প্রত্যক্ষ কারণ ছিল খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির একটি বিচিত্র বিপদ আছে। যেহেতু এই মূল্যস্ফীতি চরিত্রগতভাবেই দীর্ঘমেয়াদি হয় না এবং অল্প সময়ের মধ্যে এর প্রবল ওঠা-নামা ঘটে, ফলে স্বভাবতই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শুধু খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সচরাচর নিজেদের আর্থিক নীতি পাল্টায় না। এই না পাল্টানোর ন্যায্য কারণ আছে। কিন্তু তার ফলে যতক্ষণ পর্যন্ত এই মূল্যস্ফীতি চলতে থাকে, তার আঁচ সরাসরি পড়ে ক্রেতাদের ওপর। এই মূল্যস্ফীতির ধাক্কা লাগে মূলত দুই শ্রেণির গায়েদরিদ্র মানুষ ও অতি ধনী (বিশেষত বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী), যাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে লগ্নি করা আছে। এই দুটি শ্রেণির মধ্যে মিল তাদের আয় ইনফ্লেশন-ইনডেক্সড নয়, অর্থাৎ আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে না। গরিবদের সমস্যাটা যতখানি চেনা, ধনীদের ততটা নয়। দেশে মূল্যস্ফীতি হওয়া মানে ডলারের নিরিখে টাকার দাম কমা। মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে বাংলাদেশে উপার্জিত আয়ের মূল্য ডলারের অঙ্কে ক্রমে কমতে থাকে। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন প্রকৃত আয় কমা। মূল্যস্ফীতির ফলে গরিবেরও কিন্তু প্রকৃত আয় কমে। নির্দিষ্ট উপার্জনে আগে যতখানি খাবার কেনা যেত, জিনিসের দাম বাড়ায় কেনা যায় তার চেয়ে কম। অর্থাৎ, সবচেয়ে গরিব আর সবচেয়ে বড়লোক, উভয় শ্রেণিকে মূল্যস্ফীতি এক সমস্যার সামনে এনে ফেলে। তবে এই দুই শ্রেণির সমস্যার সমাধানের পথ এক নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে পথ গোটা দুনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো গ্রহণ করে থাকে, তার অন্তর্নিহিত নীতি এই রকম : ধরে নেওয়া হয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক আছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে তাই উৎপাদনের মাত্রা কমিয়ে আনা হয়। এই কাজটি করা হয় প্রধানত সুদের হার বাড়িয়ে। সুদের হার বাড়লে ধার করা আরও বেশি ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। ফলে একদিকে শিল্পক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে, অন্যদিকে ঋণ করে জিনিস কেনার চাহিদাও কমে। দুইয়ে মিলে উৎপাদন হ্রাস পায়। এর কোপ পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর।

মূল্যস্ফীতির একটা মস্ত বড় কারণ, খাদ্যপণ্যের মতো প্রাথমিক পণ্যের দাম বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে বটে, কিন্তু শিল্পজাত পণ্যের দাম নির্ভর করে তার উৎপাদনের খরচের ওপর। বাজারে গাড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ামাত্র গাড়ির দামও চড়চড়িয়ে বাড়ছে, এমনটা কি হয়? কিন্তু খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা আখছার ঘটে। সম্প্রতিও ঘটেছে। সেই মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনেকগুলো উৎপাদনের অনিশ্চয়তা, মজুদদারদের ফাটকাবাজির প্রবণতা ইত্যাদি। কিন্তু কোনোটাই শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত নয়। কাজেই, খাদ্যপণ্যের চাহিদা বেশি থাকার ফলে যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, তা সার্বিক মূল্যস্ফীতির হারকে ওপর দিকে ঠেললে শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন কমিয়ে তাকে সামাল দেওয়ার কোনো উপায় থাকে না।

আর একটা ব্যাপার বোঝা দরকার। আমাদের দেশে সরকারি পর্যায়ে বাহুল্য ব্যয় মূল্যস্ফীতিতে বড় রকমের ইন্ধন জুগিয়েছে। এই ব্যয়বৃদ্ধি কিন্তু গত কয়েক যুগ ধরেই চলছে। সুতরাং, দেশে মূল্যস্ফীতির পেছনে রাজকোষসংক্রান্ত নীতির একটা বড় ভূমিকা আছে। রাজকোষের হাল ফেরানোর সব উদ্যোগে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটা খাতে খরচ কমানোর তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সম্ভবত উপায়ও নেই। যেমন সুদ এবং ঋণ শোধ, বেতন, ভাতা ও পেনশন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়; কার্যত এগুলো পূর্বনির্ধারিত, চট করে কমানো সম্ভব নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে জোগানের তুলনায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণত মূল্যস্ফীতি হয়ে থাকে। বিশেষ করে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বেড়ে যাওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। এছাড়া বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে উদ্যোক্তারা চাপের মুখে কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে দেন। এজন্য উদ্যোক্তারা উৎপাদিত পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। আর সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়াই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কারণ।

ম্ল্যূস্ফীতি যে কারণেই ঘটুক, এর প্রভাব অনেক মারাত্মক ও সুদূরপ্রসারী। সাধারণত প্রোটিনযুক্ত খাবারের মূল্য সর্বাধিক হয়ে থাকে; কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাদ্য তুলনায় অনেক কম দামে পাওয়া যায়। এতে করে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে মানুষ স্বভাবতই কম দামি খাদ্যপণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। খাদ্যাভ্যাসে প্রোটিন, ভিটামিন ও বিবিধ পুষ্টিগুণসম্পন্ন অণুখাদ্যের মাত্রা কমতে থাকলে তার প্রভাব পড়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। সুষম খাবার না পেলে শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, তাদের মানসিক বিকাশ যথাযথ হতে পারে না। কর্মক্ষমতায় ঘাটতি দেখা দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও ঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারে না। এই ফলাফল লিঙ্গ-নিরপেক্ষ নয়। পুরুষের তুলনায় নারীর ওপর এই অপুষ্টির অধিকতর প্রভাব পড়ে। ছেলে এবং মেয়েশিশুর মধ্যে যে বৈষম্য পুরুষতান্ত্রিক পরিবারব্যবস্থায় ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা, তাতে ছেলেদের পাতে যদিও বা কিছু উচ্চ গুণমানের খাদ্য পড়ে, মেয়েরা সেইটুকু থেকেও বঞ্চিত থাকে। গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে এই বঞ্চনা ভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার না পেলে প্রসবের সময় তাদের জীবনসংশয় ঘটতে পারে, অপুষ্ট শিশু জন্মগ্রহণ করে, পরিণামে শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যায়। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে অর্থনীতির পরিসরে বা নীতিনির্ধারকদের দুনিয়ায় যত আলোচনা হয়ে থাকে, তার সিংহভাগ জুড়ে থাকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা। তা স্বাভাবিকও বটে, কারণ এই বিপত্তির আঁচ সর্বাধিক পড়ে তাদেরই ওপর। কিন্তু মধ্যবিত্তসহ সমাজের অন্য স্তরের মানুষের জীবনেও খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তার ফল গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। পরিবারের আর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিজনিত পুষ্টির ঘাটতির সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে মানুষের ক্যাপাবিলিটি বা ‘সক্ষমতা’কে প্রভাবিত করে। ফলে এই ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক অসাম্যকে গভীরতর করে তুলতে পারে। কাজেই, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের কী কর্তব্য, সেই বিষয়ে আলোচনাকে শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক না রাখাই ভালো। একদিকে অর্থব্যবস্থা পরিচালনায় অদক্ষতা, আর অন্যদিকে মানুষকে বোকা বানিয়ে সেই অদক্ষতা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা; এই দুটি যেমন পরস্পরের পরিপূরক, একই সঙ্গে একটি ভয়ংকর জুটিও বটে। আমাদের অর্থব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে কোনো সমস্যা বা সংকটকে স্বীকার না করা। ব্যর্থতা স্বীকার করবার সৎসাহসটুকু থাকলে তবুও ঘুরে দাঁড়াবার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ব্যর্থতাকে অভূতপূর্ব সাফল্য হিসেবে চালাবার ধূর্ত কৌশল সেই সম্ভাবনাকে মেরে ফেলে।

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত